বুধবার, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৫ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

’৭১-এর বিজয়গাথা

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০২২, ১৩:২৯

অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আমরা স্বাধীনতার ৫১ বছর অতিক্রম করতে চলেছি। এই অর্ধশতাব্দীতে আমরা অনেক কিছু পেয়েছি, আবার অনেক কিছু পাইনি। এর বিচারের ভার পাঠকের ওপরই ছেড়ে দেওয়া হলো। বাঙালি জাতির ওপর বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ, বৈষম্য, মাতৃভূমির ইতিহাস এখনো আমাদের কাছে উজ্জ্বল হয়ে আছে। পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যের মাত্রা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। বৈষম্যের মাত্রা অবসানের নিমিত্তে ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত আরটিসি সম্মেলনে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তির সনদ হিসেবে ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন। পাকিস্তানের তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান এতে ক্ষুব্ধ হন এবং ফলে শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। গণগ্রেফতারের প্রতিবাদে এবং ছয় দফা দাবির সমর্থনে সমগ্র দেশ আন্দোলনে উত্তাল হয়ে ওঠে। পক্ষান্তরে পাকিস্তানের শাসকেরা এই ছয় দফাকে মনে করতেন ‘বিচ্ছিন্নতাবাদের ছদ্ম দলিল’। ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের ফলে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি প্রবল গণ-আন্দোলনের চাপে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করা হয়। জননেতা শেখ মুজিবুর রহমান, লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন, আহমেদ ফজলুর রহমান সিএসপি, রুহুল কুদ্দুস সিএপি, স্টুয়ার্ড মুজিবর রহমান, ক্যাপ্টেন শওকত আলী, ক্যাপ্টেন নুরুজ্জামানসহ ৩৪ জন রাজবন্দিকে সম্মানের সঙ্গে মুক্তি দেওয়া হয়। ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান পদত্যাগে বাধ্য হন। জেনারেল ইয়াহিয়া খান সামরিক আইন জারি করেন এবং পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

পাকিস্তানের ইতিহাসে ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রথম ও শেষ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমেদের বক্তব্য অনুযায়ী জাতীয় সংসদের ১৬২ আসনের জন্য মোট আবেদনপত্র পাওয়া যায় ৩৫৯টি (সূত্র:বিবিসি বাংলা নিউজ)। উক্ত জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে পাকিস্তান আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে ১৬২টি আসনের মধ্যে ১৬০টি+সাতটি মহিলা আসন = ১৬৭টি আসন লাভ করে। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর মধ্যে প্রায় ৪৮ শতাংশ আইনজীবী, ১৯ শতাংশ ব্যবসায়ী এবং কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ অন্যান্য ৩৩ শতাংশ ছিল। পক্ষান্তরে পশ্চিম পাকিস্তানে (উল্লেখ্য, পশ্চিম পাকিস্তানকে মোট চারটি প্রদেশে বিভক্ত করা হয়) ১৩৮ আসনের মধ্যে পাকিস্তান পিপলস পার্টি মহিলা আসনসহ মোট ৮৮টি আসন পায়। ১৭ ডিসেম্বর, পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসন লাভ করে। পাকিস্তান আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারি পার্টির সভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানের পার্লামেন্টারি পার্টির লিডার এবং প্রাদেশিক পার্লামেন্টারি বোর্ডের সভায় এম মনসুর আলীকে পূর্ব পাকিস্তানের পার্লামেন্টারি পার্টির লিডার নির্বাচিত করা হয়। ’৭০-এর নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী শেখ মুজিবর রহমান পাকিস্তানের ভাবী প্রধান মন্ত্রী এবং এম মনসুর আলী পূর্ব পাকিস্তানের ভাবী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বিবেচিত হতে থাকেন।

ষড়যন্ত্র চলতে থাকার একপর্যায়ে ১৯৭১ সালের ১ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান দুপুর ১.১৫ মিনিটে রেডিও পাকিস্তানে ৩ মার্চ আহূত জাতীয় সংসদ অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। ঢাকা স্টেডিয়ামে চলমানরত পাকিস্তান ও এমসিসি ক্রিকেট খেলা অকস্মাত্ বন্ধ হয়ে যায়। হাজার হাজার দর্শক, ছাত্র, জনতা রাস্তায় নেমে আসে এবং বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ৩ মার্চ পল্টনের মহাসমাবেশে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করা হয়। উক্ত সভায় আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিব অহিংস ও অসহযোগ আন্দোলনের আহ্বান জানান এবং জনগণের প্রতি খাজনা, ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেন।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ পড়ন্ত বিকালে তদানীন্তন রেসকোর্স ময়দান জনতার মহাসমুদ্রে স্বাধীনতার আন্দোলনের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব দৃপ্ত পায়ে মঞ্চে উঠলেন এবং হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ কবিতাখানা পাঠ করলেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ১ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের শাসনব্যবস্থা মূলত বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই পরিচালিত হয়। ঐতিহাসিক ভাষণের পর, ঢাকা তথা সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরিতে রূপান্তরিত হয়। এ সময় পাকিস্তান এয়ারফোর্সের হেলিকপ্টার আকাশে টহল দিচ্ছিল। খ্যাতিমান আন্তর্জাতিক নিউজ ম্যাগাজিন নিউজইউক ১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল সংখ্যার প্রচ্ছদ স্টোরিতে বঙ্গবন্ধুকে ‘রাজনীতির কবি’ বলে অভিহিত করে।

ঢাকায় পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির লিডার ও আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনার নাটক ব্যর্থ হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে ঢাকা ত্যাগ করেন। জেনারেল রাওফরমান আলীর নেতৃত্বে ঢাকায় এবং জেনারেল খাদিমের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনাসহ মোট ১০টি শহরে ২৫ মার্চ রাত ১১.৩০ মিনিটে অপারেশন সার্চলাইট শুরু করা হয়। ঢাকায় রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ইপিআর হেডকোয়ার্টার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, তদানীন্তন ইকবাল হল মূল টার্গেটে পরিণত হয়। হাজার হাজার নিরস্ত্র বাঙালি ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, যা ছিল বিশ্বের ইতিহাসে এক বর্বরোচিত গণহত্যা। ২৬ মার্চ ০০:২০ মিনিটে পাকিস্তান পার্লামেন্টের মেজরিটি পার্টির লিডার আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ওয়্যারলেসের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন—‘ইহাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ হইতে বাংলাদেশ স্বাধীন...।’ পাকিস্তান আইএসপিআরের পিআরও মেজর সালিক সিদ্দিকের ওয়্যারলেসে ঘোষণাটি শুনতে পাওয়া যায়। রাত ১:৩০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডের নিজ বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়। এর কয়েক মিনিটের মধ্যে ওয়্যারলেসে ৫৭ ব্রিগেডের মেজর জাফর জানায়, ‘বিগ বার্ড ইন দ্য কেজ, অন্য পাখিরা নীড়ে নেই, ওভার’ (সূত্র :উইটনেস টু স্যারেন্ডার; লেখক : সালিক সিদ্দিক)। অতঃপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকা থেকে রাওয়ালপিন্ডির লয়ালপুর জেলে স্থানান্তর করা হয়। প্রখ্যাত সাংবাদিক সায়মন ড্রিংকসই প্রথম ২৫ মার্চের পরিকল্পিত গণহত্যার খবরটি ‘ওয়াশিংটন পোস্টের’ মাধ্যমে সমগ্র বিশ্ববাসীকে অবহিত করেন। প্রখ্যাত সাংবাদিক ম্যাসকারেনহাস ১৯৭১ সালের ১৫ জুন ঢাকাসহ সমগ্র দেশের বর্বরোচিত গণহত্যার ভয়াবহ চিত্র ‘সানডে টাইমস’-এ তুলে ধরেন। উক্ত হূদয়বিদারক রিপোর্টটি পাশ্চাত্য তথা সমগ্র বিশ্ববিবেককে নাড়া দেয় এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিশ্ববাসীকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। উল্লিখিত রিপোর্টটি ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর হূদয়কে গভীরভাবে নাড়া দেয়, তার ফলে ভারত সরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সশস্ত্র হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি টার্নিং পয়েন্ট বলে বিবেচিত হয়। ১০ এপ্রিল এক বিশেষ অধিবেশনে ১৯৭০ সালের নির্বাচিত জাতীয় পরিষদের ১৬৭ সদস্য এবং প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত ২৯৮ সদস্যের সমন্বয়ে গণপরিষদ গঠন করা হয়। উক্ত অধিবেশনে ২৬ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত ‘প্রক্লেমেশন অব ইনডিপেনডেন্স’ (স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র) অনুমোদন করা হয়,  যা অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান হিসেবে গণ্য  করা হলো। উক্ত সংবিধান ৪০৪ জন গণপরিষদ সদস্য কর্তৃক স্বাক্ষরিত হয়, যার মূলভিত্তি হচ্ছে সাম্য, সামাজিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার।

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গণপরিষদের বিশেষ অধিবেশনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি ও সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করা হয়। এম মনসুর আলী অর্থমন্ত্রী, খন্দকার মোশতাক আহমেদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব অপর্ণ করা হয়। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ তলার আম্রকাননে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকের উপস্থিতিতে উল্লিখিত সরকারের মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত ‘মুজিবনগর সরকার’ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে প্রথম গণতান্ত্রিক ও আইনানুগ সরকার। এমএজি ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক এবং এম এ রবকে চিফ অব আর্মি স্টাফ নিয়োগ দেওয়া হয়। সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করা হয় এবং ১১ জন সেক্টর কমান্ডার নিয়োগ দেওয়া হয়। মুজিবনগর সরকারের মেয়াদকাল ছিল ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল থেকে ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি।

‘৭১-এ মুক্তিযুদ্ধকালীন সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার গোপনে চীন সফর করেন। চীন-মার্কিন সম্পর্ক উন্নয়নে পাকিস্তান মধ্যস্থতা করে। ফলে ১৯৭১ সালের ৯ আগস্ট ২০ বছরমেয়াদি ভারত-সোভিয়েত ইউনিয়ন মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যাহা সহায়ক শক্তি হিসেবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অবস্থান সুসংহত করে। হিমালয়ের তুষার ও সোভিয়েতের বন্ধুত্ব—এই দুটি ছিল চীনের বিরুদ্ধে ভারতের রক্ষাকবচ। পর্বত প্রমাণ কফিনের নিচে অখণ্ড পাকিস্তানের কবর রচিত হয়। ৩০ লাখ শহিদের তাজা তপ্ত রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা উপাখ্যানের পশ্চােত রয়েছে মুজিবনগর সরকারের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং বলিষ্ঠ নেতৃত্ব।

দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লাখ শহিদের তাজা তপ্ত রক্ত এবং দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে স্বাধীনতার সূর্য উদিত হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর জেনারেল আমির আব্দুল্লাহ নিয়াজির নেতৃত্বে পাকিস্তানের ৯৩ হাজার সেনা অস্ত্রশস্ত্রসহ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ বাহিনীর কমান্ডার জেনারেল জগজিত্ সিং অরোরা ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপপ্রধান এ কে খন্দকারের উপস্থিতিতে বিকাল ৪:৩১ মিনিটে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন। উক্ত দলিলে জেনারেল অরোরা প্রতিস্বাক্ষর করেন। বিশ্বের মানচিত্রে ‘বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।  

লেখক: প্রাক্তন সাংগঠনিক সম্পাদক
জাতীয় চার নেতা পরিষদ।

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন