রোববার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

বাংলাদেশের ইত্তেফাক, ইত্তেফাকের বাংলাদেশ

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০২৩, ১৪:৪২

দৈনিক ইত্তেফাকের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল, যার নাম ‘দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পাতা ১৯৫৩-১৯৭২’। কয়েক দিন আগে বইটি দেখে আগ্রহী হয়ে পাতা ওলটাচ্ছিলাম। বইটি শুধু একটি বই নয়, ঘটমান ইতিহাসের দিনপঞ্জি এটি। ইত্তেফাকের যাত্রা শুরু ১৯৪৯-এর ১৫ আগস্ট ভারত ভাগের অব্যবহিত পরপরই সাপ্তাহিক হিসেবে, শুরুতে মওলানা ভাসানীকে সভাপতি আর ইয়ার মোহাম্মদ খানকে প্রকাশক করে। তবে শুরু থেকেই পর্দার আড়ালে মূল দায়িত্বে ছিলেন তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। মানিক মিয়া পরবর্তী সময়ে ১৯৫১ সালের আগস্টে সাপ্তাহিকটির দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে বুঝে নেন এবং তারপর হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতায় ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর দৈনিক পত্রিকা হিসেবে ইত্তেফাকের আনুষ্ঠানিক যাত্রার শুরু। পত্রিকাটির ৪ পৃষ্ঠার প্রথম সংখ্যার শিরোনামটাই ছিল কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো, ‘গণবিক্ষোভের মুখে মুসলিম লীগের নাভিশ্বাস’। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনকে মাথায় রেখেই এমন উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছিল। নির্বাচনটিতে বিজয়ী যুক্তফ্রন্টের ২১ দফাকে গণমানুষের দাবিতে পরিণত করায় ইত্তেফাকের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য।

বাংলাদেশের পথচলায় মানিক মিয়ার প্রতিষ্ঠিত দৈনিক ইত্তেফাকের নাম আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। ১৯৬৬-এর ৬ দফা আন্দোলন থেকে শুরু করে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান আর ১৯৭০-এর জাতীয় নির্বাচন, বাংলাদেশের ইতিহাস নির্ধারণী এই প্রতিটি পর্বে দৈনিক ইত্তেফাক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণটি বেতারে প্রচারের দাবিটিও জোরালোভাবে উপস্থাপন করেছিল পত্রিকাটি। ভাষণটি বেতারের মাধ্যমে ইথারে-ইথারে ছড়িয়ে পড়েছিল শাহবাগের রেসকোর্সের গণ্ডি ছাড়িয়ে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে, আর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে গোটা জাতি প্রস্তুত হয়েছিল চূড়ান্তভাবে মোকাবিলার জন্য। ১৯৭১-এ অবরুদ্ধ পাকিস্তানে ইত্তেফাকের বেশ কিছু শিরোনাম সে সময় বন্দি বাঙালি জাতির জন্য ছিল আশা জাগানিয়া। বঙ্গবন্ধুকে ২৬ মার্চ রাতে গ্রেফতার করার পর ইত্তেফাকের শিরোনাম ছিল, ‘বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি না দিলে পাকিস্তান আক্রমণ করা হইবে’ আর অপারেশন সার্চ লাইটের পর পত্রিকাটি ছেপেছিল ‘সোনার বাংলায় মানব ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাযজ্ঞ’।

এরও ঢের আগে, ১৯৬২ সালের বড়দিনের কথা। ঘটনাটির বর্ণনা পাওয়া যায় সে সময় ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসের রাজনৈতিক কর্মকর্তা শশাঙ্ক শেখর ব্যানার্জির স্মৃতিচারণে। ব্যানার্জি বাবু সে সময় থাকতেন দৈনিক ইত্তেফাকের লাগোয়া চক্রবর্তী ভিলায়। সেদিন মধ্যরাতে বাসার দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনে দরজা খুলে তিনি দেখতে পান, অল্পবয়সি একটি ছেলে দাঁড়িয়ে। বয়স ১৪ বছরের বেশি হবে না। ছেলেটি শশাঙ্ক ব্যানার্জির কাছে তার পরিচয় নিশ্চিত হয়ে তাকে জানান যে, কাছেই ইত্তেফাক অফিসে বঙ্গবন্ধু তার জন্য অপেক্ষা করছেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শশাঙ্ক ব্যানার্জির তখনো পরিচয় ছিল না। তবে মানিক মিয়াকে তিনি চিনতেন। তবে এভাবে তাকে ডেকে পাঠানোয় প্রথমটায় তিনি একটু বিরক্তই হয়েছিলেন। কিন্তু তার পরও কৌতূহল বসে তিনি সেখানে যান এবং সেই যাওয়াই তাকে ইতিহাসের অংশ করে নেয়। ইত্তেফাক অফিসে মানিক মিয়ার কক্ষে প্রবেশ করে তিনি সেখানে বঙ্গবন্ধুকে তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে পাইপ হাতে বসা দেখতে পান। বঙ্গবন্ধু শশাঙ্কর মাধ্যমে ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। সেই চিঠিতে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় ভারত সরকারের সমর্থন চান। এটি সম্ভবত স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় চূড়ান্ত যাত্রার পথে বঙ্গবন্ধুর প্রথম পদক্ষেপ ছিল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশে এই শশাঙ্ক ব্যানার্জিই ১৯৭২-এর ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত বঙ্গবন্ধুর হিথরো থেকে পালামে ফিরতি যাত্রায় তার সহযাত্রী হয়েছিলেন।

১৯৭১-এ ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন সিরাজউদ্দিন হোসেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিপর্বে তার বলিষ্ঠ লেখনীর মাধ্যমে তিনি সাংবাদিকতাকে অন্য একটা মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিলেন। ১৯৫৪-তে দৈনিক আজাদী পত্রিকায় কাজ করতেন এই জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক। পত্রিকাটির সম্পাদক মাওলানা আকরাম খার নির্দেশে যুক্তফ্রন্ট ভেঙে যাওয়ার খবরটি শিরোনাম না করে, বরং জোটটির বিবৃতিকে ধর্তব্যে এনে উলটো শিরোনামটি ছেপেছিলেন তিনি। বাংলাদেশ আন্দোলনের কলমসৈনিক প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়েছিল সিরাজুদ্দীন হোসেনকে। ১৯৭১-এর ১০ ডিসেম্বর আলবদর বাহিনীর সদস্যরা তাকে তার চামেলীবাগের বাসা থেকে উঠিয়ে নেয়। শহিদ সিরাজুদ্দীন হোসেন বাংলাদেশের অন্যতম শহিদ বুদ্ধিজীবী।

চাঁদের যেমন কলঙ্ক আছে, দৈনিক ইত্তেফাকের গৌরবোজ্জ্বল যাত্রায় পুরোটাই যে কলঙ্কমুক্ত, এমনটা বলা যাবে না। ১৯৭১-এ ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের সময়ে দৈনিক ইত্তেফাকে গোলাবর্ষণ করে। পরবর্তী সময়ে ১৯৭১-এর জুলাইয়ে পাকিস্তান সরকার ইত্তেফাক কর্তৃপক্ষকে ক্ষতিপূরণ দেয়। অবরুদ্ধ বাংলাদেশে আবারও ছাপতে থাকে ইত্তেফাক। এ সময় শহিদ সিরাজুদ্দীন হোসেনসহ কেউ কেউ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পুনরুজ্জীবিত ইত্তেফাকে যোগদান করতে অস্বীকৃতি জানালেও পরে তারা প্রয়াত মানিক মিয়ার স্ত্রীর অনুরোধে সম্মত হয়েছিলেন। অনেকে মনে করেন, সেসময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চাপে পড়ে এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিলেন ইত্তেফাকের মালিকপক্ষ। তবে আমার কাছে যা এখনো বোধগম্য নয়, তা হলো ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী মইন উদ্দিন-ফখরুদ্দীন সরকারের সময় পত্রিকাটির অন্যতম একজন কর্ণধারের অতি বিতর্কিত ভূমিকাগুলো। শেখ হাসিনাকে রাজনীতির বাইরে পাঠিয়ে মাইনাস ওয়ান ফর্মুলা বাস্তবায়ন থেকে শুরু করে রাজনীতির টোটাল বিরাজনীতিকরণে নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছিলেন ইত্তেফাক পরিবারের সদ্যপ্রয়াত এই আইনজ্ঞ। হতে পারে এটি তার ব্যক্তিগত অবস্থান, কিন্তু তিনি এমন একটি পরিবারের উত্তরাধিকারী—যে তা আমার মতো সাধারণের জন্য বেদনাদায়ক।

মন্দ আর ভালোর দিকগুলো পাল্লায় তোলা হলে ইত্তেফাকের ভালোর পাল্লাটাই যে খুব বেশি ভারী হবে—তা অবশ্য চোখ বন্ধ করে বলা যায়। স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নপূরণের ইত্তেফাকের পথ চলায় মানিক মিয়া নিজেও কম ত্যাগ স্বীকার করেননি। ১৯৬২ সালে সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেফতারের পর ব্যাপক গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে মানিক মিয়া গ্রেফতার হন। তিনি আবারও গ্রেফতার হন ১৯৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলনকে সমর্থন করার অভিযোগে। ১০ মাস পর স্বাস্থ্যগত কারণে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়, তবে স্বাস্থ্য তিনি আর সেভাবে কখনোই ফিরে পাননি। ১৯৬৯ সালে ১ জুন মাত্র ৫৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। হালের শেখ হাসিনা এক্সপ্রেসওয়েটি বাদ দিলে, ঢাকা শহরের প্রশস্ততম সড়কটি ইত্তেফাকের প্রাণপুরুষ মানিক মিয়ার নামে নামকরণ করে বাঙালি জাতি এরই স্বীকৃতি দিয়েছে। কাজেই আরেকটি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দাঁড়প্রান্তে এসে সবকিছু বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশের ইতিহাসের ওতপ্রোত অংশীদার হিসেবে দেশ এবং দেশের মানুষগুলোর জন্য ভালো কিছু করার তৃপ্তির ঢেকুর তুলতেই পারেন ইত্তেফাক পরিবারের সদস্যরা।

লেখক: ডিভিশন প্রধান, ইন্টারভেনশনাল হেপাটোলজি ডিভিশন
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও সদস্যসচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ।

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন