১৯৭০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের উত্তাল সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের রিচার্ড নিক্সন প্রশাসনের পক্ষ হইতে পেশাদার কূটনীতিক আর্চার কেন্ট ব্লাড (যিনি আর্চার কে ব্লাড বলিয়াই সমধিক পরিচিত) পূর্ব পাকিস্তানে আমেরিকার কনসাল জেনারেল হিসাবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। ১৯৭১ সালে ২৫শে মার্চ পাকিস্তানের সশস্ত্র সেনাবাহিনী ঝাঁপাইয়া পড়ে। তখন দেশব্যাপী, এমনকি আন্তর্জাতিক মহলেও যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধী বলিয়া ধরিয়া লওয়া হইত। কিন্তু পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের দলিলাদি উন্মুক্ত হওয়ায় এবং দেখা গিয়াছে, ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের কনসাল জেনারেল আর্চার কে ব্লাড ডিসেন্ট চ্যানেলে (ফরেইন সার্ভিস কর্মকর্তা ও ইউএসএইড কর্মকর্তাদের গঠনমূলক মতামত ও সমালোচনা জানাইবার ব্যবস্থা) ২৫শে মার্চের ভয়াবহ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের রিপোর্ট জানাইয়াছেন এবং তিনি আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করিয়া সমালোচনা করেন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দমন করার বিষয়ে, নৃশংসতার ব্যাপারে সরকার পাকিস্তানের সমালোচনা না করায় তিনি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সমালোচনা করেন। পরবর্তীকালে গ্যারি ব্যাস লিখিত ‘দ্য ব্লাড টেলিগ্রাম :নিক্সন, কিসিঞ্জার অ্যান্ড আ ফরগটেন জেনাসাইড’ গ্রন্থ হইতেও জানিতে পারি, যে শুধু ব্লাড নহে, তাহার স্ত্রী-পরিবারও ছিল বাংলাদেশের ব্যাপারে যথেষ্ট সহানুভূতিশীল।
বাংলাদেশ এখন স্বাধীন দেশ। যুক্তরাষ্ট্র এইখানে সরাসরি রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দিয়া থাকে। রাষ্ট্রদূত হইয়া থাকেন হয় ফরেইন সার্ভিস কর্মকর্তা, অথবা রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি—যাহাদের শিক্ষা, ব্যবসায় ইত্যাদি বিষয়ে ধারণা রহিয়াছে। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতকে সরাসরি সেক্রেটারি অব স্টেটের নিকট জবাবদিহিতা করিতে হয় এবং প্রেসিডেন্টকে সন্তুষ্ট রাখিতে হয়। সুতরাং যেই দেশে তাহাদের নিয়োগ প্রদান করা হয়, সেই দেশ হইতে যতখানি সম্ভব নিরপেক্ষ থাকিয়া রিপোর্ট প্রেরণ করিতে হয়। তাহাদের এই কার্যক্রম ও পেশাদারিত্ব স্থানীয় রাজনৈতিক মহলও নিশ্চয়ই বুঝিয়া থাকেন।
এত কথা বলিবার কারণ সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের ‘মায়ের ডাক’ নামক সংগঠনের আমন্ত্রণে বাংলাদেশের এক নিখোঁজ ব্যক্তির বাসা পরিদর্শনকে ঘিরিয়া। তাহার উপর অর্পিত দায়িত্ব হিসাবে তিনি বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করিতে পারেন। ইহাতে ভুল বুঝাবুঝির অবকাশ আছে বলিয়া আমরা মনে করি না। প্রকাশিত সংবাদ হইতে জানা গিয়াছে, তিনি ১৪ ডিসেম্বর যখন শাহীনবাগে অবস্থিত নিখোঁজ ব্যক্তির বাড়িতে যান তখন ‘মায়ের কান্না’ নামে আরও একটি সংগঠন তাহার নিকট স্মারকলিপি প্রদানের জন্য ভিড় করিয়াছিল। কিন্তু নিরাপত্তার স্বার্থে তিনি তাহা গ্রহণ না করিয়া তাহার নিরাপত্তায় নিয়োজিতদের পরামর্শে দ্রুত সে স্থান ত্যাগ করিয়াছেন। বিষয়টি লইয়া খানিকটা উদ্বিগ্ন হইয়াছেন তিনি। আবার মায়ের কান্না সংগঠনের স্মারকলিপি গ্রহণ না করায় সরকারের বিভিন্ন মহল হইতেও অসন্তোষ প্রকাশ করা হইয়াছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে বিশেষ টানাপড়েন নাই। বরং যথেষ্টই ভালো। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী। ইহা সরকারের দায়িত্বশীল মহলও মনে করেন। কিন্তু সেই সঙ্গে মনে রাখা দরকার, ছোট কিংবা বড় কোনো ভুল বুঝাবুঝি নিরসন করিতে পারে সকল মহলের সহিষ্ণু আচরণ। যুক্তরাষ্ট্রসহ বহির্বিশ্বের দেশগুলিতে দেশ সম্পর্কে সঠিক চিত্র তুলিয়া ধরা আমাদের সকলের দায়িত্ব। সকলেরই মনে রাখা দরকার, অতিরঞ্জন, মিথ্যা তথ্য, ভুল বুঝাইবার, ভুল ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রবণতা কেবল সম্পর্ককেই খাটো করিতে পারে। কোনো পক্ষের জন্যই ইহা ভালো ফল আনে না।
