আর্জেন্টিনা গোল দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখলাম রোনালদিনহো হাসিমুখে খুশিতে হাততালি দিচ্ছেন। নেইমার ও মেসির একসঙ্গে অনেক ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা যায়। তারা এক দেশ অপর দেশকে সইতে পারে। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে একে অপরের মঙ্গল চায়। নিজেদের মহাদেশে কাপ নিতে চায়।
তুরস্কে আসার পর আন্তর্জাতিক ডর্মে থাকার সুবাদে বিভিন্ন মহাদেশ ও দেশের শিক্ষার্থীর সঙ্গে মেশার সুযোগ হয়েছে। তাদের মানসিকতা বুঝি। অনেকে একাধারে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, স্পেন—এরকম একাধিক দল সাপোর্ট করে। রোলানদো, নেইমার, মেসিসহ সেরা সেরা তারকাকে সবাই পছন্দ করে। কেউ কেউ বিশেষ দল হেরে গেলে মনে কষ্ট পায়। অন্য দুয়েক জন হয়তো হালকার ওপর ঝাপসা মজাও করে। কিন্তু সেটা একটা সীমার মধ্যে থাকে।
ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার খেলা নিয়ে তাদের দেশের খেলোয়াড় বা কোচের যতটা না চাপ থাকে তার চেয়ে বেশি চাপ থাকে বাঙালি দর্শকের। কখনো মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে মারামারি, তর্কাতর্কি, কোপাকোপি করতেও দ্বিধা করে না। এরকম ঘটনা ঘটার খবর পেয়েছি আমাদের বাংলাদেশে। চলমান বিশ্বকাপের খেলাকে কেন্দ্র করে বিবাদে জড়িয়ে ১২ জন হত্যা ও ২৭ জন আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে!
খেলাকে কেন্দ্র করে সামাজিক বিভাজন তৈরি হচ্ছে। আবার বিভাজনের মধ্যে ঐক্যও হচ্ছে। হয়তো দুজনের মধ্যে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত কারণে ব্যবধান ছিল। কিন্তু ঐ বিরোধী দুজন যখন একই দল সাপোর্ট করে তারা এক হয়ে যাচ্ছে। তবে বিভাজনের ভয়াবহতা মারাত্মক আকারে বেড়ে চলছে। একে অপরকে মানসিকভাবে অগ্রাহ্য করছে। খেলাকে কেন্দ্র করে এগুলো হওয়ার পিছনে সবচেয়ে সমস্যা হচ্ছে বিদ্রূপাত্মক ট্রল। ভার্চুয়াল জগত ও সরাসরি ট্রল করার ফলে এটা মনে এক ভয়াবহ প্রভাব বিস্তার করছে।
খেলাকে কেন্দ্র করে অসহিষ্ণু আচরণকে নিছক বিনোদন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটা চলে গেছে সামাজিক, মানসিক ও সাংস্কৃতিক এক সংকটের মধ্যে। আমাদের বর্তমান প্রজন্মের জন্য এ ধরনের বিভাজন সত্যিই দুঃখজনক। সেজন্য অন্তত যারা শিক্ষিত তাদের আগে সচেতন হওয়া জরুরি। খেলাকে নিছক খেলা ও বিনোদনের মতো করে উপভোগ করা শ্রেয়। অতি বাড়াবাড়ি বাদ দিতে হবে। অতি মাতামাতির চর্চা বন্ধ করতে হবে। অন্যদেরও এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। খেলা খেলার জায়গায় থাকবে; আমাদের সামাজিকতা, বন্ধুত্বের বন্ধন যেন শক্ত থাকে।
খেলাকেন্দ্রিক মিছিল, পতাকা প্রদর্শনের যে প্রতিযোগিতা তা বন্ধ হোক। দেশের নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দেশবাসী আইডল হিসেবে বিবেচনা করে। তারা যা করে তাতেই বাকিরা অনুপ্রাণিত হয়। স্রেফ ট্রলের মধ্যে বসে থাকতে পারে না। খেলা নিয়ে উন্মাদনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বিভাগীয় শহর, জেলা, উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ে পৌঁছে যায়। যার ফলে খেলাকেন্দ্রিক সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকট উত্তরণে সবার এগিয়ে আসা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, মেরসিন বিশ্ববিদ্যালয়, তুরস্ক
