‘শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা’

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:৩৩

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বছরে ভাস্কর চক্রবর্তী নামে এক কবি ‘শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা’ নামে একটি কবিতার বই লিখেছিলেন। এই বইয়ের নাম—কবিতার প্রথম লাইনটি এখনো কবিতাপ্রেমী মানুষের মুখে মুখে ফেরে। কবি শুরু করেছিলেন এভাবে—‘শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা আমি তিন মাস ঘুমিয়ে থাকব— প্রতি সন্ধ্যায়/কে যেন ইয়ার্কি করে ব্যাঙের রক্ত/ ঢুকিয়ে দেয় আমার শরীরে—আমি চুপ করে বসে থাকি—অন্ধকারে/ নীল ফানুস উড়িয়ে দেয় কারা, সারা রাত বাজি পোড়ায়/হৈ-হল্লা—তারপর হঠাৎ/ সব মোমবাতি ভোজবাজির মতো নিভে যায় একসঙ্গে—উৎসবের দিন হাওয়ার মতো ছুঁয়ে যায়, বাঁশির শব্দ/ আর কানে আসে না—তখন জল দেখলেই লাফ দিতে ইচ্ছে করে আমার/ মনে হয় জলের ভেতর—শরীর ডুবিয়ে/ মুখ উঁচু করে নিঃশ্বাস নিই সারাক্ষণ—ভালো লাগে না সুপর্ণা, আমি/ মানুষের মতো না, আলো না, স্বপ্ন না—পায়ের পাতা/ আমার চওড়া হয়ে আসছে ক্রমশ—ঘোড়ার খুরের শব্দ শুনলেই/ বুক কাঁপে, তড়বড়ে নিঃশ্বাস ফেলি, ঘড়ির কাঁটা আঙুল দিয়ে এগিয়ে দিই প্রতিদিন—আমার ভালো লাগে না—শীতকাল/ কবে আসবে সুপর্ণা আমি তিন মাস ঘুমিয়ে থাকব!’    

আমাদের দেশের শীতবিলাসী মানুষের প্রতীক্ষার প্রহর শেষ হতে চলেছে। তাপমাত্রা একটু করে কমছে। উত্তরের জেলাগুলোতে কুয়াশার চাদরে ঢেকে থাকছে সূর্য। করতোয়া, তিস্তাপাড়ে কুয়াশার জালে পড়ে উধাও নদীর চিহ্ন! শীত এসে গেছে। শীত আসছে। শীত জাগছে। আর বাঙালির মনে পড়ে যাচ্ছে সেই অমোঘ লাইন—‘শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা আমি তিন মাস ঘুমিয়ে থাকব’! না, তিন মাস ঘুমিয়ে থাকার কোনো সুযোগই নেই। বিশেষত এই আর্থিক মন্দার সময়ে। আমাদের কাজ করতে হবে। কাজ করে খেতে হবে। তিন মাস ঘুমিয়ে কাটালে আমাদের খাবার জুটবে কীভাবে? এদিকে রাজনীতির ‘তাপমাত্রা’ কেবল ওঠানামা করছে। বিএনপির নেতানেত্রীরা গরম কর্মসূচি ও বক্তৃতা দিয়ে কর্মীদের চাঙ্গা করার নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশকে কেন্দ্র আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে উত্তাপ সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের ‘শক্তি’র দাপটের কাছে বিএনপির ‘আত্মসমর্পণ’ শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতিকে শান্তই রেখেছে। রাজনীতিতে আপাতত ‘তাপমাত্রা বৃদ্ধির তেমন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।

আমাদের দেশে শীত ও রাজনীতির মধ্যে একটা বিস্ময়কর সম্পর্ক আছে। যদিও শীত ও রাজনীতি সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি প্রসঙ্গ। একটির সঙ্গে অপরটির বৈধ ও যৌক্তিক কোনো সম্পর্ক নেই। থাকার কথাও নয়। শীত হচ্ছে প্রকৃতির খেলা। আর রাজনীতি হলো রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রীদের ক্ষমতায় যাওয়া অথবা ক্ষমতায় টিকে থাকার কলাকৌশল। একে প্রহসনও বলা যেতে পারে। প্রতি বছর একবার করে শীত আসে, আবার চলেও যায়। কিন্তু রাজনীতির ‘প্রহসন’ শেষ হয় না। বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ ধরে তা চলতেই থাকে।

শীত আমাদের যতই শীতল ও শীতার্ত করুক না কেন, এ নিয়ে তেমন কোনো আলাপ-আলোচনা তোলপাড় বা লেখালেখি হয় না। অথচ রাজনীতি নিয়ে আমাদের দেশে কী তোলপাড়ই না হয়! রাজনীতি নিয়ে বক্তৃতা, বিবৃতি, সংবাদ, সংবাদ ভাষ্য, কলাম, বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন, সমীক্ষা কতই না আয়োজন। আমাদের দেশের রাজনীতি অবশ্য প্রধান দুটি শিবিরে বিভক্ত। এক পক্ষে আছে আওয়ামী লীগ; অন্য পক্ষে বিএনপি। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে দেখে নেওয়ার চেষ্টায় সারাক্ষণ তত্পর। কে কাকে ঘায়েল করতে পারে, জব্দ করতে পারে—রাজনীতি যেন তারই সাধনা। এই রাজনীতি নিয়ে দলাদলি, সংঘর্ষ, কোন্দল, হুমকি-ধমকি কোনো কিছুরই কমতি নেই। রাজনীতি মানেই হচ্ছে উত্তাপ, গণ্ডগোল, বিশৃঙ্খলা, উত্তেজনা। সেখানে শীত অত্যন্ত উপেক্ষিত ও অবহেলিত ইস্যু। অথচ শীত আমাদের জীবনে কম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নয়। শীতের প্রকোপ বাড়লে জীবনযাত্রা অচল হয়ে যায়। স্থবির হয়ে যায় সবকিছু। সেই শীতকে নিয়ে কেন এমন উপেক্ষা, সেটাও একটা রহস্য বটে।

শীত মারাত্মক সব উপাদান নিয়ে হাজির হয়। আমাদের সমাজ-সংস্কৃতিতে ভীষণ প্রভাব ফেলে। আমাদের পোশাক, খাদ্যতালিকা, চলাফেরা, ভোগ-দুর্ভোগ—সব কিছুই পালটে যায়। সেই শীতকে নিয়ে কী নির্মম উদাসীনতা! বাংলা সাহিত্যের ‘বিষণ্নতম’ কবি জীবনানন্দ দাশের কিছু কুয়াশাচ্ছন্ন কবিতা ছাড়া শীতকে নিয়ে তেমন সাহিত্যকর্মও চোখে পড়ে না।

শীতকালকে আমরা যত উপেক্ষাই করি না কেন, এ সময় রাজনীতি কিন্তু বেশ জমে ওঠে। রাজনীতির ভরা জোয়ার বা তেজকটাল বলা যায় এই শীতকালকে। আমাদের জাতীয় জীবনের তাত্পর্যময় সব দিবসও এই শীতকালেই। ১৬ ডিসেম্বর, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ সবই হচ্ছে শীতকালীন ঘটনা। এরশাদের বিরুদ্ধে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানও সংঘটিত হয়েছে শীতকালেই।

আসলে শীতকালে এ দেশের মানুষের মধ্যে একধরনের তেজ চাড়া দিয়ে ওঠে। এর একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে শীতের সবজি। নানা জাতের, নানা স্বাদের বিচিত্র টাটকা সবজি খেয়ে শরীরের মধ্যে একধরনের টগবগে ভাব আসা স্বাভাবিক। আর শরীরে তেজ থাকলে, তেল থাকলে তা বের হবেই। এই তেজের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আন্দোলন, মানি না, মানব না—ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়। কথায়ও আছে—পেটে খেলে পিঠে সয়। আন্দোলন তো একধরনের পিঠে সওয়াই। হামলা-মামলা, ধাওয়া, লাঠি-গুলি-টিয়ার গ্যাস, চিৎকার, স্লোগান, দৌড়ঝাঁপ ইত্যাদিতে শক্তি ক্ষয়ের সম্মিলিত যোগফল। পেটে খাবার না থাকলে, তেজ না থাকলে কি আর এসব করা সম্ভব?

একবার শীতের শাক-সবজির কথা ভাবুন। বলিউডের ‘মন-কেমন করা চাহনি’র নায়িকাদের মতো ধবধবে ফুলকপি, আঁটসাঁট নববধূর মতো বাঁধাকপি, ঘুষখোর সরকারি অফিসারদের পাটকরা পোশাকের মতো চকচকে শিম, কুমারীর রাঙা ওষ্ঠের মতো টকটকে লাল টম্যাটো, কিশোরের রঙিন স্বপ্নের মতো সুন্দর সুন্দর গাজর, সুলতানের আঁকা স্বাস্থ্যবান ছবির মতো ঢাউস ঢাউস বেগুন আর হালকা সবুজ কচি লাউ, সাদায় মেশানো রাক্ষুসে সাইজের মুলা, পালঙ্কে রাখার মতো গাঢ় সবুজ পালংশাক, সাপের মতো লকলকে লাউডগা আরো কত কী!

কই মাছ দিয়ে ফুলকপির তরকারি, চিংড়ি মাছ দিয়ে লাউ বা বাঁধাকপির ঘণ্ট, আলু-বেগুন-শিম-কপি সহযোগে পাঁচফোড়ন দেওয়া তরকারি, ডালের বড়াসহ মাগুর কিংবা বোয়াল মাছের হালকা ঝোল, ধনিয়া পাতা কাঁচা মরিচ সহযোগে বাটা, ফুলকপির সঙ্গে বেসন মিশিয়ে বড়া, মিষ্ট কুমড়ার ফুল বা সরিষা ফুলের বড়া, পেঁয়াজু, বেগুনি, গরম মুড়ি, মাদকতা মেশানো খেজুরের রস ও খেজুরের গুড়, নানা জাতের পিঠা, হাঁস কিংবা পাঁঠার মাংস—এমনি অসংখ্য উপাদেয় খাদ্যসুখ আমাদের ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে’ উচ্চারণ করতে উত্সাহিত করে। আসলে শীতকালটা হচ্ছে সুখের কাল, উপভোগের কাল (দরিদ্রদের জন্য নয়, অবশ্যই। তাদের নিয়ে এ দেশে কেউ কী ভাবে? তাদের জন্য এ লেখাও নয়)!

আমাদের দেশে শীতের রাজনীতি আছে, তবে শীতকে নিয়ে রাজনীতি এখনো শুরু হয়নি। বন্যার সময় যেমন বলা হয় ‘ভারতীয় বন্যা’, শীতকে তেমনভাবে ভারতীয়, পাকিস্তানি কিংবা পশ্চিমা শীত বলার প্রবণতা এখনো শুরু হয়নি। তবে আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের যে স্বভাব, তাতে শীত নিয়ে রাজনীতি শুরু হয়ে গেলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। বিএনপি-জামায়াতপন্থিরা বলবে, এই শীত আওয়ামী লীগ সরকারের সীমাহীন অযোগ্যতা, দুর্নীতি ও লুটপাটেরই ফল। এই সরকারকে ক্ষমতা থেকে না সরালে শীতসহ যাবতীয় সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে না। কাজেই আসুন, জনগণের ঐক্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলি। এই সরকারকে উৎখাত করার শপথ গ্রহণ করি।

পক্ষান্তরে আওয়ামী লীগ বলবে, এই শীত জঙ্গি শীত, জামায়াত-বিএনপিওয়ালারা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে এই অবৈধ শীতকে আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। এটা বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি নষ্টের চক্রান্ত। একটি মহল শীতের ধুয়া তুলে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতায় যেতে চায়। কিন্তু জনগণ তা হতে দেবে না।

যা হোক, শীতের আরেকটি বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, মানুষের মাথার নার্ভগুলো এ সময় কেন জানি ঢিলা হয়ে যায়। হাইকোর্টের সামনের মোড়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাগলের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। রাস্তাঘাটে ‘শ্রীপুরের বটিকা’সহ নানা রকম চুলকানির মলম, জটিল-কঠিন-দুরারোগ্য সব রোগের ওষুধ, সালসা, তাবিজ ইত্যাদি নিয়ে ক্যানভাসাররা আবির্ভূত হয়। বিরোধী দল ও জোটের আন্দোলন-আন্দোলন খেলা, চূড়ান্ত আন্দোলনের হুমকি, ক্ষমতাসীনদের লুটপাট, দুর্নীতি ও মিথ্যাচার উৎসব, বইমেলা, পিকনিক, বিয়ে, সম্মেলন, খুন-হত্যা-সড়ক দুর্ঘটনা, নারী নির্যাতন, ছিনতাই, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ইত্যাদি শীতকালে ‘প্রকট’ আকার ধারণ করে। পুরোনো বাতের ব্যথা, অম্লতা, পিত্তশূল, নিউমোনিয়া, ব্রংকাইটিসসহ নানা রকম কোল্ড ডিজিজ শীতের অতিথি পাখির মতো ব্যাপকভাবে আবির্ভূত হয়।

আজ থেকে বহু বছর আগে এক শীতপ্রধান দেশের মহাকবি লিখেছিলেন, ‘শীতের বাতাস তুমি বও, তুমি বও/ মানুষের অকৃতজ্ঞতার মতো তুমি নির্দয় নও।’ কবির সেই দেশে মানুষ ছিল। সেই মানুষের মধ্যে অকৃতজ্ঞতাও ছিল, যা নিয়ে কবি ক্ষুব্ধ কবিতা লিখেছিলেন। কিন্তু আমাদের দেশে বর্তমানে তেমন ‘মানুষ’ নেই। এখানে এক দল আছে নেতা, অপর দল জনতা। এক দল প্রভু, অন্যরা ভৃত্য। প্রভুদের জীবনে শীত স্পর্শ করে না, স্পর্শ করে রাজনীতি। এই রাজনীতিকে পুঁজি করে তারা সবকিছু বাগিয়ে নেন। ভোগ-লালসা, সুখ-সচ্ছলতা, আনন্দ-উৎসব—সবকিছু। কিন্তু এই রাজনীতি জনতারূপী ভৃত্যদের স্পর্শ করে না। তাদের জীবনে বঞ্চনা ছাড়া অন্য কোনো যৌতুক নেই। কোটরাবদ্ধ ব্যাঙের মতো গুটিশুটি মেরে কোনো রকমে নিশ্চুপ তাদের বেঁচে থাকা! 

লেখক রম্য লেখক

ইত্তেফাক/ইআ