স্বাধীনতার অনস্বীকার্যতা : অবশেষে মুখ খুলছে পাকিস্তানও

আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০২২, ০৩:৪৯

মহান স্বাধীনতা অর্জনের ৫১তম বার্ষিকী উদযাপন করছে বাংলাদেশ। স্বাধীনতাযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত এবং পাকিস্তানি বর্বর সৈন্যদের পরাজিত করে যে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা আজ বিশ্বের মানচিত্রে অনন্য এক উচ্চতায় অবস্থান করছে। বিজয়ের এই ৫১ বছরে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেকে স্বমহিমায় গৌরবান্বিত করেছে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। আর ঠিক এই সময়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা যে চরম অনিবার্য হয়ে উঠেছিল, আজ দেরিতে হলেও পাকিস্তান তা স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে।

একসময় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পাকিস্তানে কথা বলাটা একপ্রকার নিষিদ্ধই ছিল। কিছু সাংবাদিক কিংবা বুদ্ধিজীবী মুখ খোলার চেষ্টা করলেও সরকারের পক্ষ থেকে তাদের কথা বলতে দেওয়া হতো না। কিন্তু আজ সময়ের পরিক্রমায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পাকিস্তানের রাজনীতির হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

৩ নভেম্বর পাকিস্তানের ওয়াজিরাবাদে বিক্ষোভ মিছিলের সময় হত্যার পরিকল্পনায় ইমরান খানের ওপর গুলি চালানো হয়। এ ঘটনার এক দিন পর তিনি পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতিকে ১৯৭১ সালের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করেন। সে সময় তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নির্বাচনে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়ার পরেও তাদের সরকার গঠন করতে দেওয়া হয়নি। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে গণতান্ত্রিকভাবে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে জয়ী হয় শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। অথচ পশ্চিম পাকিস্তানি সংস্থা তাদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়নি। উপরন্তু পাকিস্তানি সৈন্যরা বাঙালির ঐক্যকে চূর্ণ করার জন্য এবং তাদের আশা ও স্বাধীনতার স্বপ্ন চিরতরে ধ্বংস করার জন্য জঘন্য পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র করে।’

তিনি আরো বলেন, ‘অপারেশন সার্চলাইট নামে জঘন্য এক সামরিক হামলা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তার সহযোগীদের দ্বারা পরিচালিত হয়। লক্ষাধিক নিরপরাধ বেসামরিক মানুষ, নারী-পুরুষ, এমনকি শিশুদেরও নির্মমভাবে হত্যা করা হয় এবং সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়। প্রায় ১ কোটি শরণার্থী ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে চলা পাকিস্তানিদের সন্ত্রাসী রাজত্ব থেকে নিজেদের বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।’

পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় দলটির প্রধানের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়েই স্বীকার করে নেওয়া হয় ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সৈন্য দ্বারা নিরীহ বাঙালিদের প্রতি অমানবিক অত্যাচারের কথা। কথা চালাচালির এখানেই শেষ নয়। ২৯ নভেম্বর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর প্রধান তার অবসর গ্রহণের এক দিন আগে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটি অপ্রাসঙ্গিক কথা বলেন। পাকিস্তানের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া পূর্ব পাকিস্তানের পরাজয়কে ‘রাজনৈতিক ব্যর্থতা’ বলে অভিহিত করেন।

ঠিক এই বক্তব্য আসার দুই দিন পরেই পাকিস্তানের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো-জারদারি ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের পরাজয়কে একটি ‘বিশাল সামরিক ব্যর্থতা’ বলে মত প্রকাশ করেন।

পাকিস্তানের এই রাজনৈতিক নেতা ও সামরিক কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও পালটা বক্তব্য থেকে বেরিয়ে আসছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অনেক সত্য, যার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের নতুন প্রজন্ম আস্তে আস্তে জানতে শুরু করছে তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক পূর্বপুরুষদের করে যাওয়া অতিদানবীয় সব অপকর্মের কথা। এর মধ্য দিয়েই আশা করা যায়, বাঙালির প্রতি পাকিস্তানিদের চালানো নৃশংস গণহত্যার বিচার জাতিসংঘ কর্তৃক সম্পন্ন হবে।

তবে সবকিছু পেরিয়ে স্বাধীনতার ৫১ বছরে আজকের বাংলাদেশ পৃথিবীর মানচিত্রে এক অনন্য অবস্থানে পৌঁছাতে শুরু করেছে। বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচকে অনেক বড় বড় দেশের চেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে। আর ঠিক এই সময়ে স্বৈরশাসক মনোভাব, অপশাসন, দুর্নীতি, অপসংস্কৃতি, সন্ত্রাস, সর্বোপরি ভঙ্গুর রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য প্রতিটি ক্ষেত্রে পিছিয়ে চলেছে পাকিস্তান। মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব ও দারিদ্র্য নিয়ে চরম হতাশার মধ্যে পাকিস্তানিরা।

অতি সম্প্রতি আইপিএসওএস পাকিস্তানে একটি জরিপ চালায়। সেখানে দেখা যায়, ৪৯ শতাংশ পাকিস্তানি মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন, বেকারত্ব নিয়ে উদ্বিগ্ন ১৮ শতাংশ এবং ৯ শতাংশ পাকিস্তানি দারিদ্র্যকে তাদের উদ্বেগের প্রধান কারণ মনে করে।

গড় মাথাপিছু আয়ে বাংলাদেশ থেকে অনেকটা পিছিয়ে পাকিস্তান। এ সময় পাকিস্তানের গড় মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৪৩০ মার্কিন ডলার। অন্যদিকে বাংলাদেশের গড় মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৭২০ মার্কিন ডলার। এর মধ্য দিয়ে খুব পরিষ্কারভাবে বোঝা যাচ্ছে, পাকিস্তান আজ একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র, যার জন্য এই সময়ে দেশ জুড়ে জনমনে মানসিক ও অর্থনৈতিক হতাশাগ্রস্ত অবস্থা বহমান। এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের ব্লগার ও ইউটিউবাররা বেশি করে বলতে শুরু করেছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের কথা, যা সোশ্যাল মিডিয়া পেরিয়ে নতুন প্রজন্মসহ জনগণের মনে স্থান নিয়েছে এবং তা থেকে শুরু হয়েছে একটি নতুন আলোড়ন। এর মধ্য দিয়েই পরিষ্কারভাবে বোঝা যাচ্ছে, পাকিস্তানের জনগণ তাদের দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের দোষারোপ করতে শুরু করেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে করে যাওয়া অন্যায়ের জন্য। যার জন্যই পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতা ও সামরিক কর্মকর্তারা মনের ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও উচ্চারণ করছেন বাংলাদেশের সঙ্গে যুদ্ধে করে যাওয়া সব অপকর্মের কথা।

পাপ যে তার বাপকেও ছাড়ে না, তার প্রকৃত উদাহরণ পাকিস্তান। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের ওপর যে অন্যায়-অত্যাচার, জুলুম-নির্যাতন চালিয়েছে, তার ফল ভোগ করছে পাকিস্তান। এমনকি আজ পাকিস্তানের জনগণই দেশটিকে একটি ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ তথা ‘ব্যানানা রিপাবলিক’ বলে অভিহিত করছে।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী

ইত্তেফাক/ইআ