সম্প্রতি দেশের একটি জেলা শহরে একজন ব্যবসায়ীকে বিবস্ত্র করিয়া রাস্তায় ঘুরানো হয়। সেই ঘটনা আবার মোবাইল ফোনে ধারণ করিয়া তাহার ভিডিও ছড়াইয়া দেওয়া হইয়াছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তাহার বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগ আনা হইলেও ভুক্তভোগী ইহাকে চাঁদাবাজিসংক্রান্ত পরিকল্পিত ঘটনা হিসাবে তুলিয়া ধরিয়া মামলা করিয়াছেন। তাহাতে কয়েক জন আসামি গ্রেফতারও হইয়াছে। এই ঘটনাটি একটি উদাহরণ মাত্র। প্রকৃতপক্ষে আমাদের মতো আধাসামন্তবাদী সমাজে আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করিয়া তাহা ফেসবুক ও ইউটিউবের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে ছড়াইয়া দিতে অনেকে সামান্যতম নীতি-নৈতিকতারও ধার ধারিতেছে না। যে কোনো নাগরিকের মান-সম্মানের সহিত সমাজে বসবাস করিবার অধিকার রহিয়াছে। তাহার পরও এইরূপ ঘটনা কীভাবে ঘটে, তাহা ভাবিতেও আমাদের বিস্মিত হইতে হয়। ইহা কত বড় যে এক সামাজিক ব্যাধি ও একশ্রেণির বিকারগ্রস্ত মানুষের ঘৃণ্য মানসিকতা—তাহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না।
সমাজে একশ্রেণির প্রভাবশালী মহল অর্থ ও ক্ষমতার মদমত্তে এতটাই জ্ঞানশূন্য হইয়া পড়িয়াছে যে, তাহারা ইচ্ছা করিলেই যেন যখন যাহা খুশি তাহাই করিতে পারে। তাহাদের হস্তে দেশের সাধারণ নাগরিকের মান-ইজ্জত নিরাপদ নহে। মানুষকে হেনস্তা ও অপমান করিতে পারিয়াই তাহারা হাসে শয়তানের হাসি। তাহাদের হাতে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা থাকায় অনেকে নানা ঘটন-অঘটন সর্বত্র ছড়াইয়া দিতেছে। এই যে এইভাবে একজন নাগরিকের মানহানি করা হইতেছে তাহার প্রতিকার কী, তাহা কি আমরা একবার ভাবিয়া দেখিতেছি? আমাদের সমাজে নারী, দরিদ্র ও অসহায় মানুষ আজ নানাভাবে নিগৃহীত হইতেছে। তাহারা হয়রানি, বিড়ম্বনা ও অপমান-অপদস্তের শিকার হইয়া মানসিকভাবে ভাঙিয়া পড়িতেছে। ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হইয়া কত ছাত্রী, তরুণী ও গৃহবধূ যে অপমান সহ্য করিতে না পারিয়া আত্মহত্যা করিয়াছে—এই দেশে তাহার ইয়ত্তা নাই। প্রেমের ফাঁদ পাতিয়া ধর্ষণ করা হইয়াছে এবং সেই ধর্ষণের ছবি আবার সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল করিয়া সেই মেয়েটি ও তাহার পরিবার-পরিজনকে অপমানিত করা হইয়াছে। ইহার মাধ্যমে চাঁদা আদায়ের ঘটনাও ঘটিতেছে। সালিশি বৈঠকের নামে অনেকের মাথার চুল কাটিয়া বা মারধর করিবার পর গলায় জুতার মালা পরাইয়া এলাকায় ঘুরানো হইতেছে। অনেক যুবক ইহাতে আত্মহত্যা করিতেছে বা আত্মহত্যার চেষ্টা করিতেছে। সালিশি বৈঠকেও ধর্ষণের ভিডিও প্রদর্শন করা হইতেছে জনসম্মুখে। সালিশের নামে জুতায় থুতু ফেলিয়া তাহা চাটাইতে বাধ্য করা হইতেছে। নাকে খত দেওয়া হইতেছে। আমরা এখনো কোন সমাজে বসবাস করিতেছি? এমনকি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের গোসল করিবার দৃশ্যও ভাইরাল করা হইতেছে!
ধর্ষণসহ মানুষকে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে অপমান করিবার ভিডিও ভাইরালের সংস্কৃতি অবশ্যই বন্ধ করিতে হইবে। অনেক সময় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করিবার পরও এই ধরনের ভিডিও ভাইরাল হইতে দেখা যায়। আমরা সচেতনতার কথা বলিয়া থাকি, তবে সচেতনতার পাশাপাশি প্রশাসনিক প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণেও তত্পরতা বৃদ্ধি করিতে হইবে। একশ্রেণির চিহ্নিত মাস্তান ও সন্ত্রাসীর নিকট কোনো এলাকার মানুষ জিম্মি থাকিতে পারেন না। আর সালিশের নামে সামন্তবাদী আচরণ কাম্য নহে। এইরূপ ক্ষেত্রে আইনের আশ্রয় লওয়াই উত্তম। এইখানে এই সকল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিটিসিএল কর্তৃপক্ষেরও দায় রহিয়াছে। তাহাদেরও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হইবে। আমরা দেখিতেছি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হয়—এমন অনেক কনটেন্ট ভাইরাল হইতেছে, যাহা সঙ্গে সঙ্গে মুছিয়া ফেলা যাইত। একইভাবে ধর্ষণ বা নগ্ন ভিডিও দ্রুত বন্ধ করিতে হইবে। আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই ধরনের ক্ষতিকর ভাইরাল সংস্কৃতির অবসানে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।
