সরকার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সচল রাখিবার জন্য কলকারখানার মালিকদের ঋণ পরিশোধে বেশ কয়েকটি বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ গ্রহণ করিয়াছে। যেমন—কিস্তির অর্ধেক দিলেই ব্যবসায়ীরা ঋণখেলাপি হইবেন না বলিয়া প্রজ্ঞাপন জারি করিয়াছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পূর্বে ইহা ছিল ৭৫ শতাংশ। এই সুবিধা পাওয়া যাইবে চলতি ডিসেম্বর পর্যন্ত। তবে শুধু ইহাতেই শেষরক্ষা হইবে না।
করোনাকালে সরকার প্রণোদনা প্রদান করিয়াছিল শুধু পোশাক খাতের জন্য; কিন্তু শুধু পোশাকশিল্প চালু থাকুক, আর অন্য শিল্পকারখানা বন্ধ হইয়া যাউক, ইহা তো কাহারো কাম্য হইতে পারে না। বর্তমানে আমাদের বিদ্যুৎ উত্পাদনসক্ষমতা ২১ হাজার ২৩৯ মেগাওয়াট; কিন্তু বিশাল এই সক্ষমতার মাত্র ৪০ শতাংশ ব্যবহার হইতেছে। ইতিমধ্যে সরকার বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলিকে ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নির্দেশ দিয়াছে। তবে আমাদের বিদ্যুৎ কত মেগাওয়াট ছিল ও বর্তমানে আছে উহা বড় কথা নহে। স্ট্যাবল তথা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্সুবিধা না দিলে মাঝারি ও বড় কারখানাগুলির অস্তিত্ব টিকাইয়া রাখা কঠিন হইবে। আমরা প্রায়শ ঋণখেলাপির কথা বলি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে ঋণখেলাপি বাড়িয়াছে ৩৩ হাজার কোটি টাকা। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খেলাপির পরিমাণ ১ লক্ষ ৩৪ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা। অবশ্য ইহা মোট ঋণের মাত্র ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ; কিন্তু কেন ব্যবসায়ীরা ঋণখেলাপি হন তাহা কি আমরা একবার গভীরভাবে চিন্তা করিয়া দেখিয়াছি? মতলববাজদের কথা ভিন্ন। ঋণ নেওয়ার পর তাহাদের অনেককে তো আর খুঁজিয়াই পাওয়া যায় না; কিন্তু যাহারা ব্যাংক, শ্রমিক ও নিজেদের জন্য দিবারাত্রি পরিশ্রম করিয়া শিল্পকারখানা পরিচালনা করেন, তাহাদের কথা অবশ্যই ভাবিতে হইবে। জনৈক শিল্পোদ্যোক্তা একদা বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নরকে বলিয়াছিলেন যে, তিনি যেন তাহার কারখানায় ব্যাংকের লোক নিয়োগ দেন। তাহাদের থাকা-খাওয়াসহ যাবতীয় ব্যয় বহন করিবে মালিকপক্ষ। তাহা হইলে বুঝা যাইবে শিল্পমালিকরা কেন ও কীসের জন্য ঋণখেলাপি হন! ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণে তাহাদের দ্বিগুণ-তিন গুণ বেশি অর্থ পরিশোধ করিতে হয়। শিল্পমালিকগণ যেই অর্থ নেন নাই, তাহা তাহাদের দিতে বাধ্য করা হইবে কেন?
এইদিকে ঋণ লওয়ার সময় ব্যাংকের কাগজপত্র অধিকাংশ ক্ষেত্রে মালিকরা দেখেন না। অথচ ব্যাংকের কাগজপত্র, চেয়ার-টেবিল, এয়ারকন্ডিশন ইত্যাদি সকল খরচের দায়ভাগ আসিয়া পড়ে শিল্পমালিকদের উপর। গ্রামাঞ্চলে ঘরে ঘরে বাতি আছে ইহা অসত্য নহে; কিন্তু কলকারখানায় দৈনিক কতবার বিদ্যুৎ আসে ও যায়, ইহাতে সেই প্রতিষ্ঠানের মেশিনারিজ নষ্টসহ উৎপাদন কতটা ব্যাহত হয়, শ্রমিকদের বসাইয়া বসাইয়া বেতন-ভাতা দিতে হয়—এই সকল ক্ষতি বিবেচনায় লওয়া দরকার। শিল্পকারখানায় বিদ্যুৎ-গ্যাসের স্থিতিশীলতা বজায় রাখিতে শিল্প, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কথার পিঠে কথা আসে। সরকার যেই সকল শিল্পকারখানা পরিচালনা করে, তাহাতে লোকসান হয় কেন? বেসরকারি খাতের ঋণখেলাপির কথা প্রতিদিন বলা হয়, আর সরকারি খাতের লুটপাট ও লোকসানের কথা? কেহ না কেহ তাহা একদিন বলিবেই। করোনা ও ইউক্রেন যুদ্ধ ইত্যাদির কারণে অর্থনৈতিকভাবে সরকারের পিঠ দেওয়ালে ঠেকিয়া গিয়াছে। আর যাহারা বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা তাহাদের জীবনও আজ ওষ্ঠাগত। তাহাদের অবস্থা ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’। তাহারা যদি কান্দিয়া বাঁচিতে চাহেন, তাহা হইলে শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও সামাজিক অস্থিরতাসহ দেশের অবস্থা কী হইবে, তাহা সহজেই অনুমেয়। এই জন্য বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখিবার অবকাশ নাই। অথচ কোনো সরকারের আমলেই ব্যবসায়ীরা নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস-বিদ্যুতের সুবিধা পান নাই। বর্তমানে প্রাইভেট বিদ্যুৎ-গ্যাস কোম্পানির সহিত এমন চুক্তি করা হইয়াছে কেন যে, তাহারা উৎপাদনে থাকুক আর না থাকুক সরকারকে টাকা গুনিতে হইবে। কাহারা কোন মতলবে এমন চুক্তি করিয়াছে তাহা ভাবিয়া দেখিতে হইবে। নতুবা একদিন শিল্পকারখানা মুখ থুবড়াইয়া পড়িবে। অতএব, শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-গ্যাস অবশ্যই নিশ্চিত করিতে হইবে। ইহার আর কোনো বিকল্প নাই।
