অবশেষে ‘মুক্তিপণে’ই ফিরেছে টেকনাফে অপহৃত ৮ ব্যক্তি

আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০২২, ০৬:৩০

টেকনাফের বাহারছড়ার জাহাজপুরা পাহাড়ি এলাকা থেকে অপহৃত শিক্ষার্থীসহ আট জন অবশেষে চার দিনের মাথায় ছাড়া পেয়েছেন। জনপ্রতি নির্দিষ্ট পরিমাণ মুক্তিপণ পরিশোধের পর বৃহস্পতিবার (২২ ডিসেম্বর) গভীর রাত ২টার দিকে তারা ছাড়া পান বলে জানিয়েছেন অপহৃতদের স্বজনেরা। তবে কত টাকা পণ দিয়ে তারা ফিরেছেন, বিষয়টি খোলাসা করছেন না বলে উল্লেখ করেছেন বাহারছড়া ইউপি চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন খোকন। ফিরে আসা অপহৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ভোররাতেই থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাদের সঙ্গে নিয়ে বিকেলে অপহরণস্থল পরিদর্শন করেছে টেকনাফ থানা ও কক্সবাজার জেলা পুলিশ। পুলিশের দাবি, অভিযানে ভীত হয়ে বিনা পণে তাদের ছেড়ে দিয়েছে অপহরণকারীরা।

অপহৃতদের মধ্যে সেলিমের বড় ভাই আকতার হোসেন জানান, শুরু থেকেই জনপ্রতি ৩ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করছিল অপহরণকারীরা। এর মধ্যে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জনগণকে সঙ্গে নিয়ে পাহাড়ে পাহাড়ে তল্লাশি এবং সাংবাদিকেরা এ নিয়ে নিউজ করায় পুলিশ  ও সাংবাদিকদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে অপহৃতদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালায় সন্ত্রাসীরা। এর মধ্যেও তাদের সঙ্গে দেনদরবার চলছিল। তাদের চাহিদামতো টাকা দেওয়ার কথা নিশ্চিত করার পর বৃহস্পতিবার রাত ২টার দিকে অপহৃতদের নিয়ে জাহাজপুরা গর্জন বাগানের কাছাকাছি আসে অস্ত্রধারী অপহরণকারীরা। সেখানেই অপহৃতদের পরিবার টাকা হস্তান্তর করার পর অপহৃতদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

তবে কত টাকা দিয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছুই বলেননি তিনি। কিন্তু অসমর্থিত একটি সূত্র জানিয়েছে, সাকল্যে ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা পরিশোধ করেই আট জনকে ছাড়িয়ে আনা হয়েছে। পারিবারিক আর্থিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করেই টাকার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

অপহরণকারীদের কবল থেকে ফিরে আসা অপহৃত রিদুয়ান জানায়, শখ করে পাহাড়ের ছড়ায় মাছ শিকারে গিয়ে তারা অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের জিম্মিদশায় পড়েন। অস্ত্রের মুখে তাদের গভীর পাহাড়ের আস্তনায় নিয়ে যাওয়া হয়। আস্তনায় নিয়ে গাছের সঙ্গে হাত-পা বেঁধে মুখের ভেতরে কাপড় ঢুকিয়ে রাখা হয়। ফিল্মি স্টাইলে একেক জনকে একেকভাবে বেঁধে রেখেছিল। কাউকে বেঁধে এই ঠাণ্ডায় পাহাড়ি ছড়ার পানিতে ভিজিয়ে রাখে। পালা করে তাদের বেত্রাঘাত করা হতো। তাদের কথা ছিল, মুক্তিপণ দিলে মুক্তি মিলবে, বাড়ি যাওয়া যাবে।

অপহৃত রিদুয়ানের ভাষ্য, অপহরণকারী অস্ত্রধারী গ্রুপের লিডারের হাতে ল্যাপটপ ছিল। তারা ইন্টারনেট ব্যবহার করে আমাদের নিয়ে গণমাধ্যমে প্রচারিত নিউজসহ পুলিশের অভিযান বিষয়ে খোঁজ নিয়েছে প্রতিনিয়ত। অভিযানের বিষয়টি নিয়ে অপহৃতদের ওপর বেশি নির্যাতন করা হয়েছে।

অপহৃত মোস্তফা কামালের ভাই হাবিব উল্লাহ জানান, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা অপহৃত অপহৃতদের অমানবিকভাবে নির্যাতন করেছে। এতে অনেকে জখম হয়েছেন। তাদের মধ্যে মারাত্মক জখম হয়েছেন জাহাজপুরার বাসিন্দা মৃত কাদের হোসেনের ছেলে নুরুল হক (৫৫) ও ছৈয়দ আমিরের ছেলে করিম উল্লাহ (২২)।

ফিরে আসা ভুক্তভোগীরা জানান, অপহরণকারীরা তাদের বেঁধে রেখে মারধর শুরু করত, ঠিকমতো খাবারও দেয়নি। অথচ তারা পাহাড়ি হরিণ শিকারের পর মাংস রান্না করে পিকনিকের মতো করে খেয়েছে। আস্তানায় অবস্থানের জন্য অত্যাধুনিক সব ব্যবস্থা রয়েছে। তাদের অপহরণের পর পুলিশ-সাংবাদিক বা তাদের পরিবারের লোকজন কে কী বলছেন ও করছেন, মুহূর্তে খবর পেত তারা। এসব বিষয় নিয়ে তাদের মারধর ও হত্যার হুমকি-ধমকি দেওয়া হতো। 

এরই মধ্যে পরিবারের সদস্যরা দেনদরবার করে কেউ ২ লাখ, কেউ ১ লাখ আবার কেউ ৫০ হাজার টাকা দিয়ে মুক্তি পেয়ে বাড়ি ফিরেছেন। রাতের আঁধারে গর্জন বাগানের কাছে এনে নিজেরা টাকা বুঝে নিয়ে অপহৃতদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেন।

টেকনাফ থানার ওসি আবদুল হালিম বলেন, অপহরণের ঘটনায় মামলা করেছেন অপহৃত কলিমুল্লাহর ভাই হাবিবউল্লাহ। অপহরণ ও চাঁদাবাজির ধারায় অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে মামলাটি করা হয়েছে (নং-৪৪/২০২২)। সেই মতেই পদক্ষেপ নিয়েছে পুলিশ।

অপহৃত অপহৃতদের নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে পুলিশ সুপার কার্যালয়ে একটি সংবাদ সম্মেলন করেন জেলা পুলিশ সুপার মাহফুজুল ইসলাম। সেখানে এসপি বলেন, জাহাজপুরায় আট জন অপহরণের ঘটনায় তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত পেয়ে অভিযানে নামে পুলিশ। সাড়াশি অভিযানের পাশাপাশি ড্রোনের সাহায্যে পাহাড়ে নজরদারি বাড়ানো হয়। ফলে অপহরণকারীরা ভয় পেয়ে রাতের আঁধারে কোনো ধরনের মুক্তিপণ ছাড়াই অপহৃতদের সুস্থ অবস্থায় ছেড়ে দেয়। 

ইত্তেফাক/এমএএম