যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধের সম্ভাবনা কতটা?

আপডেট : ১৭ জুন ২০১৯, ০০:৪৩

ওমান উপসাগরে দুটি তেলের ট্যাংকারে হামলায় ইরান জড়িত থাকার অভিযোগ করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং সৌদি আরব। প্রাথমিক গোয়েন্দা তথ্য যুক্তরাষ্ট্র দেওয়ার পর উপসাগরীয় অঞ্চলে সংকট জোরদার হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ওই তথ্য প্রমাণ করে, গত বৃহস্পতিবারের হামলায় জড়িত ছিল ইরান। এমনকি গতকাল সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানও বলেছেন, ইরানই ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের মতে, এতেই বেশ পরিষ্কার প্রমাণ রয়েছে। এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, কেমন হতে যাচ্ছে পরবর্তী পরিস্থিতি? যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে? কিংবা কতটা মারাত্মক হতে পারে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের পূর্ণ মাত্রার বিমান ও নৌ সংঘর্ষ? এ বিষয়গুলো নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন বিবিসির কূটনৈতিক সংবাদদাতা জনাথন মার্কাস।

মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, বৃহস্পতিবার হামলার শিকার তেল ট্যাংকার দুটির একটি থেকে অবিস্ফোরিত একটি লিমপেট মাইন সরিয়ে নিচ্ছে ইরানের একটি ছোট তরীর ক্রুরা। যাকে এই যুদ্ধে প্রকৃত ঘটনা প্রতিষ্ঠার প্রথম শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে ইরান এবং ট্রাম্প প্রশাসন উভয় পক্ষের সমালোচনাই বিষাক্ত। গত মে মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে জাহাজে চারটি লিমপেট মাইন হামলার মতোই শুরু থেকেই এ ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করে আসছে ইরান। ইরানের এক কর্মকর্তা বলেন, কেউ ইরানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্পর্ক খারাপ করতে চাইছে। তবে দুটো ঘটনার জন্যই তেহরানকে দোষারোপ করছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে শঙ্কা দেখা দিয়েছে যে, এই বাকযুদ্ধ শেষ মেষ সংঘাতে রূপ নিতে পারে।

অস্বাভাবিক কালক্রম?

সাধারণভাবে মার্কিন নৌবাহিনীর ভিডিওটি বিশ্বাসযোগ্যই বটে। এরপরও অনেক প্রশ্ন থেকে যায়। মার্কিনীদের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রাথমিক বিস্ফোরণের কিছু সময় পর এটি রেকর্ড করা হয়েছিলো, যখন কিনা ইরানিরা প্রমাণ মুছে ফেলার চেষ্টা করছিলো। তবে এই হামলার কালক্রম সম্পর্কে আরো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ হওয়া দরকার। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কখন এই মাইনগুলো জাহাজে স্থাপন করা হয়েছিলো? ওই এলাকায় শক্তিশালী মার্কিন নৌ উপস্থিতি থাকায় গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের বেশ সক্ষমতা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। তাই আরও তথ্য সামনে আসা উচিত। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজগুলোর ময়না তদন্তও আরো তথ্য উদঘাটন করবে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও বলেছেন, পুরো ঘটনা আমলে নিলে বোঝা যায়, এ ধরণের উস্কানিহীন হামলা আন্তর্জাতিক শান্তি ও সুরক্ষার প্রতি হুমকি, নৌ চলাচলের স্বাধীনতার উপর আক্রমণ এবং উত্তেজনা বাড়ানোর অগ্রহণযোগ্য প্রচারণা। এসব স্থূল অভিযোগের পর প্রশ্ন, এগুলো ঠেকাতে কি ধরণের প্রস্তুতি আছে যুক্তরাষ্ট্রের? সমন্বিত কুটনৈতিক তত্পরতা হতে পারে এক ধরণের উদ্যোগ যাতে আন্তর্জাতিক নিন্দা জানানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইরানকে আরও কোণঠাসা করা যায়। তবে এ বিষয়ে খুব একটা সন্দেহ নেই যে, ভুল কিংবা সঠিক, অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা তেহরানের উপর চাপ প্রয়োগ করে বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। রেভ্যুলিউশনারি গার্ড কর্পসের মতো স্বাধীন নৌশক্তি পরিচালনাকারী গ্রুপগুলো হয়তো পাল্টা আঘাতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ভয়ংকর সময়

বাস্তবে বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে যে, হামলার শিকার হলে ইরান সরাসরি বা তার মিত্র দেশগুলোর সহায়তায় হাইব্রিড যুদ্ধের সূচনা করতে পারে। জাহাজ পরিচালনা ও অন্যান্য টার্গেটে ব্যাপকহারে হামলা করতে পারে, বাড়তে পারে তেল ও বীমার দাম। যা আসলে আরও শাস্তিমূলক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেবে। কোন পক্ষই এ ধরণের বিপজ্জনক সংঘাতের শঙ্কার বিষয়ে আগ্রহী হবে না। অবশ্য কেউ ভাবে না যে, ইরান বা যুক্তরাষ্ট্র দুপক্ষই পূর্ণমাত্রার সংঘাত শুরু করতে চায়। আমেরিকার পর্যাপ্ত সামরিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও ইরানের বিরুদ্ধে বিমান ও নৌ হামলা সব ধরনের বিপদ ডেকে আনবে। যদিও বর্তমানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে ধৈর্যশীল। আসল বিপদ হচ্ছে, দুর্ঘটনাবশত যুদ্ধের সূচনা। তেহরান ও ওয়াশিংটন দুপক্ষই সংকট সমাধানের ইঙ্গিত দিলেও কেউই তা সঠিকভাবে গ্রহণ করছে না। উদাহরণস্বরূপ, উপসাগরীয় এলাকায় মার্কিন অবকাঠামোকে হুমকি হিসেবে দেখতে পারে ইরান। আর নিজেদের দোরগোড়ায় এ ধরণের হুমকি কখনোই সহ্য করবে না তারা। ধরা যাক, এই বার্তাকে ভুলভাবে নিতে পারে ইরানের রেভ্যুলিউশনারি গার্ড কর্পস। তারা ভাবতে পারে, তাদেরকে জোর করে খামে ঢুকানোর চেষ্টা চলছে। যার জন্য ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের শাস্তি পেতেই হবে। এদিকে জার্মানি আর ফ্রান্সের মতো ওয়াশিংটনের মিত্ররা এরইমধ্যে সাবধানতার আহ্বান জানিয়েছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাজ্য যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করে। তবে এক্ষেত্রে নিজের উপসংহার নিজে টানতে চায় তারা।