ইত্তেফাক: গণমানুষের আস্থার প্রতীক

আপডেট : ২৬ ডিসেম্বর ২০২২, ২৩:২৫

সংবাদপত্র হচ্ছে সমাজের দর্পণ। সমাজের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রগতির দর্শন প্রচার করে গণমাধ্যম সমাজের দর্পণের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়—এই ধারা চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। মূলত সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানসমূহের সুদৃঢ়তা স্থাপনেই আধুনিক সংবাদমাধ্যমের আবির্ভাব। বলা হয়ে থাকে, স্বাধীন ও মুক্ত গণমাধ্যম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। যে কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি এবং সামাজিক নানা ঘটনাপ্রবাহের প্রতিচ্ছবি বস্তুনিষ্ঠভাবে গণমানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যম অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। যার বাস্তব রূপ মূর্ত হয়ে ওঠে আমেরিকার স্বাধীনতার জনক ও প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসনের অভিব্যক্তিতে। তিনি একবার বলেছিলেন, ‘আমাকে যদি এই বিকল্পটি দেওয়া হয় যে, তুমি কি সংবাদপত্রবিহীন সরকার চাও, না সরকারবিহীন সংবাদপত্র চাও? তখন আমি পরেরটা বেছে নেব।’ জেফারসন মূলত বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ ও সংবাদপত্রের কথা বলেছিলেন।

১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে। বাঙালি জাতির আজীবনের লালিত-স্বপ্নের বিজয় ছিল নানা কণ্টকাকীর্ণতায় পরিপূর্ণ। এই দীর্ঘ সংগ্রামের পথে গণমানুষের দাবিদাওয়া আদায় ও স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের বহুল প্রচারিত সংবাদমাধ্যম ‘দৈনিক ইত্তেফাকের’ নাম। স্বাধীনতার মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মানিক মিয়া ও দৈনিক ইত্তেফাক—এই তিন বিন্দু একে অপরের পরিপূরক হিসেবে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের পথ সৃষ্টি করেছিল। বাংলার গণমানুষের মুখপত্র হিসেবে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৯৫৩ সালের ২৪শে ডিসেম্বর কালের দর্পণ, গণমানুষের বিশ্বস্ততার প্রতীক এবং গণতন্ত্রের সহায়ক শক্তির হাতিয়ার হিসেবে নবরূপে যাত্রা শুরু করে দেশের প্রাচীনতম, সর্ববৃহত্ এবং বহুল প্রচারিত জাতীয় পত্রিকা ‘দৈনিক ইত্তেফাক’।

স্বাধীনতার ৫১তম বর্ষে  গণমানুষের ভালোবাসা, বিশ্বাস, ও আস্থার প্রতিষ্ঠান হিসেবে দৈনিক ইত্তেফাক নানা চড়াই- উতরাই পেরিয়ে ৭০তম বর্ষে পদার্পণ করেছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের মুখপত্র হয়ে ওঠা ইত্তেফাক ইতিহাসের রূপকধারার এক বিশেষ ঐতিহাসিক প্রক্ষাপটে আত্মপ্রকাশ করে, যা আজও কালের প্রবহমান ধারায় সত্য, সুন্দর ও ন্যায়ের পথে অবিচল রয়েছে। স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন থেকে শুরু করে বিজয় অর্জনের মুহূর্ত পর্যন্ত ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে মুক্তিসংগ্রামে জাগ্রত ভূমিকা পালন করেছে ইত্তেফাক। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৫৪ যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, পরবর্তীকালে ১৯৫৮ সালের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বররূপে যেমন নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছিল, তেমনি ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, বাঙালির বাঁচার দাবি ছয় দফার পক্ষে জোরালো সমর্থনের মাধ্যমে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছে ইত্তেফাক। কালজয়ী এই ঐতিহাসিক ভূমিকার অগ্রপথিক হিসেবে দৈনিক ইত্তেফাক ঊনসত্তরের অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নিজেকে সমুন্নত রেখে গৌরবান্বিত ইতিহাসকে অলংকৃত করেছে বারবার। আর এসব ভূমিকার কারণে বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়া ইত্তেফাক পাকিস্তানি সরকারের রোষানলের শিকার হয়েছে বারবার। কারাবরণ থেকে শুরু করে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছেন পত্রিকাটির স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রতিষ্ঠাতা তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াসহ অসংখ্য সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবী। তবে সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারক চিরযৌবনা ইত্তেফাক সদা অবিচল থেকেছে নির্মোহ সত্য প্রকাশে। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় সত্য প্রকাশের অদম্য সাহস নিয়ে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে দৈনিক ইত্তেফাক।

কালজয়ী, পাঠকনন্দিত, জনপ্রিয় সংবাদ মাধ্যমের রূপে রূপায়িত ইত্তেফাক স্বাধীন বাংলাদেশেও প্রগতির ধারায়, মুক্তিযোদ্ধের চেতনায়, স্বমহিমায় সদাভাস্বর। দেশের স্বনামধন্য লেখকের অসাধারণ লিখন শৈলীর সঙ্গে নবীন লেখকদের চিন্তার মিতালির এক অপূর্ব সুযোগের সমন্বয় ঘটিয়েছে ইত্তেফাক। নতুন প্রজন্মের ভাবনায় আগামী দিনের বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টাদের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের যে ভাবনার জাগরণের সৃষ্টি হয়েছে, তা আগামী দিনের স্বপ্নের স্বদেশ সৃজনের দিকপাল হবে। ভিন্নমুখী চিন্তা, বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা, গণতন্ত্রের প্রতি দায়বদ্ধতার মাধ্যমে ইতিহাসেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে যাচ্ছে কোটি মানুষের আবেগ-অনুভূতির প্রতিষ্ঠান ইত্তেফাক। এই ধারাবাহিকতায় বৈষম্যহীন সমাজবিনির্মাণ এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় দৈনিক ইত্তেফাক তার মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অবিচল থেকে সংবাদ সরবরাহ করে যাবে বলেই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বাংলার জনগণের প্রত্যাশা। আর শুধু সংবাদ বা তথ্য নয়, মানুষের স্বপ্নের ফেরিওয়ালা হয়ে মানুষকে স্বপ্ন দেখাবে ইত্তেফাক—এই আশাবাদ প্রতিটি বাঙালির। মানুষের সুখে-দুঃখে যে কণ্ঠ মানুষকে আশা দেবে, ভরসা দেবে—৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এই প্রত্যাশা ইত্তেফাকের কাছে। সব প্রকার কুসংস্কার ও সাম্প্রদায়িকতার বেড়াজাল ছিন্ন করে ইত্তেফাক এগিয়ে যাক যুগান্তরের সীমানা পেরিয়ে। সর্বোপরি, ইতিহাসের জয়গান গেয়ে আলোর মশাল হাতে সত্য, সুন্দর ও সমৃদ্ধির চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে তাজাপ্রাণ তারুণ্যশক্তির বলীয়ান অনিন্দ্য উপমায় সদাহাস্যোজ্জ্বল থাকুক ভালোবাসার ‘দৈনিক ইত্তেফাক’।

ইত্তেফাক/এআই

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন