বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৪, ১২ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

‘ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার বিকাশে ইত্তেফাকের ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিলো গুরুত্বপূর্ণ’

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৩, ১১:০৪

দৈনিক ইত্তেফাকের ৭১ বছরে পদার্পনের প্রক্কালে কানাডার অটোয়া, মন্ট্রিয়ল, ভ্যাংকুভার এবং টরন্টো থেকে দশ লেখক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, ব্যাংকার ও আইনজীবী শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তারা ইত্তেফাকের লেখক এবং ইত্তেফাকের পাঠক হিসেবে নানান স্মৃতিচারণ করেন।

বিটিভির 'আইন আদালত 'খ্যাত ব্যারিস্টার রেজাউর রহমান বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে দৈনিক ইত্তেফাক এক অনন্য ভূমিকা পালন করেছে। নিপীড়িত, নির্যাতিত বাঙালি জাতির প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর দৈনিক ইত্তেফাক পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে পুরো জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেছে। ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে রইলো নিরন্তর শুভ কামনা।

প্রবাসী কণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক খুরশিদ আলম বলেন, শৈশবে আমার পত্রিকা পাঠের প্রথম হাতেখড়ি হয় বনেদি পত্রিকা ইত্তেফাক পড়ার মধ্য দিয়ে। আজ অর্ধশতাব্দী পরে এখনও সেই ইত্তেফাক পড়ছি নিয়মিত।
নব্বই দশকের মাঝামাঝি কানাডায় স্থায়ী হওয়ার পরও ইত্তেফাক পড়তাম নিয়মিত। তখন অনলাইল ভার্সন শুরু হয়নি। টরন্টোর সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে রাখা হতো ইত্তেফাক পত্রিকার হার্ড কপি। নিয়মিত সেখানে যেতাম পত্রিকাটি পড়ার জন্য। বর্তমানে ঢাকার অনেক পত্রিকার ভিড়েও ইত্তেফাক না পড়লে মনে হয় কি যেন বাকি রয়ে গেল। ঢাকায় সাংবাদিকতা ও জনসংযোগ পেশার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার সুবাদে ইত্তেফাক ভবনে নিয়মিত যাতায়ত ছিল এক সময়। সেই সব দিনের স্মৃতি এখনেও গেঁথে আছে মনের মধ্যে।

সাপ্তাহিক বাংলা মেইলের সম্পাদক শহিদুল ইসলাম মিন্টু বলেন, ইত্তেফাক সময়ের চলে আর আমরাও চলি ইত্তেফাকের সাথেই। সেই যে কবে এই দৈনিকটি পড়া শুরু করেছি, এখনও শেষ করতে পারছি না। দেশে বসে প্রিন্ট ভার্সন পড়তাম, এখন বিদেশে এসেও অনলাইনে ইত্তেফাক পড়ি।

কানাডিয়ান বাংলাদেশি নিউজের সম্পাদক মাহবুব ওসমানী বলেন, একাত্তর শব্দটার সঙ্গে বাংলাদেশিদের একটা গভীরতম সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৭১ সালে আমরা পেয়েছি লাল-সবুজের পতাকা। সেই একাত্তর বছর বয়সে পা রাখলো ইতিহাসের সাক্ষী দৈনিক ইত্তেফাক। জন্মদিনে অনেক শুভেচ্ছা প্রিয় এই পত্রিকার জন্য। জন্মলগ্ন থেকেই ইত্তেফাক ছিল গণ মানুষের কণ্ঠস্বর। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টকে বিজয়ী করতে ভূমিকা রাখা, আইয়ুব খান হতে ইয়াহিয়া খান পর্যন্ত সকল সামরিক শাসনের বিরোধিতা করা, ১৯৬৬ সালের ছয় দফার পক্ষে অবস্থান, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় বাঙালির জাতীয়তাবাদ আন্দোলনকে সমর্থন জানায় দৈনিক ইত্তেফাক। এরপর ১৯৭১ এ আসে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। এ সময় দৈনিক ইত্তেফাক পাকিস্তান সরকারের নির্দেশ মেনে সংবাদ প্রকাশ করতে বাধ্য হয়। সেই অবরুদ্ধ ও কণ্ঠরোধ করা দিনগুলোতেও ইত্তেফাক সতর্কতার সাথে সত্য তথ্য উপস্থাপন করেছিল। স্বাধীনতার মাস অগ্নিঝরা মার্চে দৈনিক ইত্তেফাক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

তিনি আরও বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পাতায় প্রধান খবরের শিরোনাম ছিল, ‘বাংলার উপর কোন কিছু চাপাইয়া দেওয়ার চেষ্টা বরদাশত করা হইবে না’। সাহসী সাংবাদিকতার জন্য জীবন দিতে হয় ইত্তেফাকের কার্যনির্বাহী সম্পাদক সিরাজুদ্দীন হোসেনকে। লাশও পাওয়া যায়নি এই শহীদ সাংবাদিকের। স্বাধীনতার সময় রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে যেমন সোচ্চার ছিল দৈনিক ইত্তেফাক, সেই ধারা এখনও অব্যাহত থাকুক, ৭১তম জন্মদিনে এই প্রত্যাশা রাখি।

সাংবাদিক সুব্রত নন্দী ইত্তেফাক সম্পর্কে বলেন, দেশ বিভাগ উত্তর তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে মুসলমানদের মধ্যে বাঙালি জাতিয়তাবাদের উন্মেষ ও চর্চা থেকে শুরু করে ভাষাভিক্তিক জাতীয়তার বিকাশে ইত্তেফাকের ঐতিহাসিক ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রামে বিশিষ্ট রাজনীতিক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ইত্তেফাকের অবদান মনে রাখবার মতো। ইত্তেফাক ছিল বাঙালির মুখপাত্র। এই পত্রিকাটির দীর্ঘ ৭০ বছরে বাংলাদেশে রাজনীতি, শিক্ষা, সাংস্কৃতিক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছে।

মন্ট্রিয়ল থেকে রাজনীতিবিদ মঈনুর আর সরকার বলেন, বাংলাদেশে সবচাইতে পুরানো এবং বহুল প্রচারিত পত্রিকা ইত্তেফাক-এর ৭১তম বছরে পদার্পণ উপলক্ষে শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন জানাচ্ছি। দেশে এবং বহির্বিশ্বে সৎ, সুন্দর, এবং নিরপেক্ষ সংবাদ প্রকাশে আপোষহীণ ভূমিকায় এই দৈনিকের সাথে যারা জড়িত, তাদেরকেও জানাচ্ছি শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন।

ব্যারিস্টার রেজোয়ান রহমান বলেন, ইত্তেফাক আমার পরিবারের সাথে সেই ছোটবেলা থেকেই আছে। আমার দাদার যে ছবিটা আমার মানষপটে গেথে আছে, যেখানে সকালের রোদে তিনি উঠানে বসে আছেন সংবাদপত্র হাতে, সেখানে ইত্তেফাক আছে। আমার বাবা-চাচারা সর্বশেষ এবং নির্ভরযোগ্য সংবাদের জন্য যে পত্রিকাটি হাতে নিয়ে ঘরে ফিরতেন, সেটা ছিলো ইত্তেফাক। গ্রামে-গঞ্জে-মফস্বলে বেড়ে ওঠা আমার মতো হাজারো কিশোরকে কমিক সিরিজের সাথে প্রথম পরিচয় করিয়েছিলো ইত্তেফাকে নিয়মিত ছাপা 'টারজান সিরিজ'। আজ সময় অনেক পেরিয়ে গেলেও ইত্তেফাক তার গৌরবোজ্বল ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে আর বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনায় অদ্বিতীয় আছে, এই বিশ্বাস রাখি।

ভ্যাংকুভারের অধিবাসী কবি ও অনুবাদক শাহানা আক্তার মহুয়া বলেন, ১৯৫৩ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকেই দৈনিক ইত্তেফাক হয়ে উঠেছিল গণমানুষের মুখপত্র। স্বাধিকার আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা আন্দোলন- গণমানুষের প্রতিটি আন্দোলনে তাই সংবাদপত্রটি নির্ভীকভাবে, অকুণ্ঠচিত্তে সোচ্চার থেকেছে। বর্তমানে প্রকাশিত চাকচিক্যময় অনেক সংবাদপত্রের ভিড়েও ইত্তেফাক তার স্বকীয়তা হারায়নি। আপসহীনভাবে এভাবেই সত্য প্রকাশ করে যাক দৈনিক ইত্তেফাক।

সাংবাদিক সঞ্জয় চাকীর ভাষ্য, ইত্তেফাক মানে ট্রাস্ট, বিশ্বাস, আস্থা। ইত্তেফাক হচ্ছে নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার এক মূর্ত প্রতীক। হাজারো চাপ, প্রতিকূলতার এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়েও দশকের পর দশক ধরে ইত্তেফাক তার নিরপেক্ষতা বজায় রেখে চলেছে। ইত্তেফাক শুধু সংবাদপত্রই নয়... একটি সফল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। সাধারণত গণমাধ্যম বা সংবাদপত্র দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবসা করে যাওয়ার রেওয়াজ খুবই কম। কিন্তু ইত্তেফাক তা পেরেছিল এবং এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে টিকে ছিল দীর্ঘ সময়। সময়ের প্রয়োজনে ব্যবসা আর পাঠকপ্রিয়তা নানা দিকে ছড়িয়ে গেলেও ইত্তেফাক এখনও স্বমহিমায় সমুজ্জ্বল বলেই মনে করি, অন্তত নিরপেক্ষ গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে।

টরন্টোতে অস্থায়ী অধিবাসী ব্যাংকার রুনা লায়লা বলেন, ইত্তেফাক সব সময়ই সময়ের সাথে চলে। একটি দৈনিকের জন্য এটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ইত্তেফাক দীর্ঘদিন বছর ধরে বের হচ্ছে, এটাও একটা আনন্দের ব্যাপার। কানাডায় আসার পর ইত্তেফাকে আমার কথাও দু’একবার ছাপা হয়েছে। ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে অভিনন্দন জানাচ্ছি।

ইত্তেফাক/এসকে