বিশ্বকাপ ফুটবলের রেশ : হতাশ মনে প্রাণের সঞ্চার 

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০১

দেখতে দেখতে কাতারে বিশ্বকাপ ফুটবলের মহারণ শেষ হয়ে গেল। ফাইন্যালের শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে শেষ বিজয়ী মেসিদের খুশির ঝলক আনন্দাশ্রু হয়ে বিশ্বের প্রতিটি কর্নারে সব মিনি পর্দার সমাগমকে আপ্লুত করে মিলনমেলাকে বিদায় জানাল। এখন সবার মনে জেগে থাকল মরু কাতারের আলোকময় স্মৃতি। বিশ্বে এখনো এর রেশ রয়ে গেছে। ক্ষুদ্র দেশ কাতারের বর্ণাঢ্য এই আয়োজনে নানা দেশ থেকে আগত ফুটবলপ্রেমী অতিথিরা অভিভূত। যারা পৃথিবীর বিভিন্ন কোণে বসে টেলিভিশনের পর্দায় খেলা উপভোগ করেছেন, তারাও অনেকটা বিস্মিত। 

স্বাগতিক কাতার প্রথম রাউন্ডের সব খেলায় একটি গোল দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। শেষ রক্ষার জন্য ফুটবল নিয়ে মাঠে প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়াই করে গেছে ওরা। তার পরও তিনটি ম্যাচেই তারা হেরেছে। এজন্য কোনো আক্ষেপ নেই কারো মধ্যে। তারা কোনো খেলায় না জিতলেও তাদের জয় হয়েছে। আয়োজনের দিক থেকে তারা সফল হয়েছে। কোনো সমালোচনাই কাতারকে হতাশায় নিমজ্জিত হতে দেয়নি। ২০১৪ সালে ব্রাজিল বা ২০১৮ সালে রাশিয়ার আয়োজনের চেয়ে কোনো অংশেই পিছিয়ে ছিল না দেশটি। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশ কাতারের মানুষের পাথাপিছু আয় অন্যান্য দেশ থেকে বেশি। আয়োজন সার্থক করে তুলতে প্রয়োজনীয় অর্থ ব্যয়ে কোনো কার্পণ্য ছিল না তাদের। এর প্রমাণ, ফুটবল আয়োজন আকর্ষণীয় করতে চোখধাঁধানো সব নিত্যনতুন কাঠামোর আটটি স্টেডিয়াম, হোটেল, রাস্তা, অত্যাধুনিক সুবিধার সঙ্গে এক স্পট থেকে অন্য স্পটে যাতায়ত ও দ্রুত যোগাযোগের জন্য বিলাসবহুল যানবাহন, রেস্তোরাঁ, শপিং মল, চিকিৎসাকেন্দ্র, নিরাপত্তাব্যবস্থা ইত্যাদি দ্রুত তৈরি করে ফেলা। এজন্য তারা ২০০ বিলিয়ন ইউএস ডলার ব্যয় করেছে। এবার ফুটবল ফ্যানদের জন্য ‘ফ্যানফেস্টিভ্যাল’ উদযাপনের আধুনিক সুবিধাদিসহ আরামদায়ক বিশেষ বিনোদনের ব্যবস্থা সবার নজর কাড়ে। বসে বা শুয়ে শুয়ে খেলা দেখা, খাদ্য, পাণীয়, বিশ্রাম করার পাশাপাশি নিজে ফুটবল খেলায় অংশগ্রহণের জন্য সেগুলোতে ইনডোর ফুটবলের সুযোগ ছিল। বহুল আলোচিত নতুন স্টেডিয়াম ‘৯৪৭’ ব্যবহৃত কনটেইনার দিয়ে তৈরি করা হয়েছে, যা বিশ্বের সর্বপ্রথম পরিবহনযোগ্য স্টেডিয়াম। খেলা শেষে এই গোটা স্টেডিয়াম খুলে নিয়ে কোনো দরিদ্র দেশকে ফুটবলের উন্নয়নে দান করা হবে বলে জানানো হয়েছে। স্টেডিয়াম ৯৪৭ বাংলাদেশে পাঠানো হবে বলে জানা গেছে। 

বিশ্বকাপ ফুটবলের মতো এত নিষ্কলুষ বিনোদনের কোনো তুলনা হয় না। পৃথিবীতে এর মতো আর কোনো বড় বিনোদন দ্বিতীয়টি কোথাও আছে কি? ক্রিকেট বা বেসবল সময়ক্ষেপণকারী খেলা হওয়ায় জনপ্রিয়তা পেলেও এখনো অনেকের কাছে বিরক্তির উদ্রেককারী। একটি খেলা দেখার জন্য দিনরাত একসঙ্গে কাটানোর মতো সময় কোথায় সবার?

বিশ্বকাপ ফুটবল একটি সামাজিক খেলা। পরিবারের সব সদস্য নিয়ে ঘরে বসে যেমন এই খেলা উপভোগ করা যায়, আবার মাঠে, ঘাটে, বাজারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, অফিসে বসেও এটা উপভোগ্য। এত বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধ, সহনশীলতা, শ্রদ্ধাবোধ ও মার্জিত আচরণ প্রদর্শন করার ফুরসত থাকে। সবাই একসঙ্গে গোল নিয়ে মাতোয়ারা করতে কোনো সমস্যা হয় না। কারণ মুহূর্তেই এর প্রতিপক্ষ সমর্থকদের মধ্যে পরিবর্তন ঘটার অবকাশ থাকে। এতে প্রতিপক্ষ সমর্থকদের মধ্যে পরস্পরের ক্ষোভ বা অভিমান দ্রুত দূর হয়ে পরিবেশ শান্ত হয়ে ওঠে। 

করোনা-উত্তর পৃথিবীতে যুদ্ধের ডামাডোলের পর দ্রব্যমূল্যের যে ঊর্ধ্বগতি এবং সামাজিক ও ব্যক্তিগত হতাশা শুরু হয়েছে, তাতে কাতারে আয়োজিত বিশ্বকাপ ফুটবল স্নিগ্ধ, পরিচ্ছন্ন ও অনুপম সুধার মতো চারদিকে শান্তির পরশ বুলিয়ে দিয়েছে। অন্তত একটি মাস বিশ্ববাসী এই সুধার মধ্যে নিজেদের ডুবিয়ে সেই দুর্ভিক্ষের ভয় ও অজানা হতাশা থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছে। এই সংকটময় সময়ে এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে?

এই কদিনে চারদিকে আলোর ঝলকানি, ছোট্ট ঘরের গোটা দেওয়ালটা যেন মিনি স্টেডিয়াম, সোফটা যেন গ্যালারি, রান্নাঘরের সুস্বাদু রান্নার ঘ্রাণের সঙ্গে চা-কফির পাত্রগুলো যেন দিনরাত টুংটাং আওয়াজ করে একটা প্রাণ ফিরিয়ে এনেছিল—এটাই বড় পাওয়া।

ঘরের ছাদে, রাস্তার খুঁটিতে নানা দেশের পতাকা, গোলের হইহুল্লোড় শব্দ, বড় পর্দায় মোড়ে মোড়ে আলোর ঝিলিক, উলকি, জার্সি, তর্ক, আলোচনা, সমালোচনা মিলে কাতারের খেলা আমাদের সবার ঘরবাড়ি থেকে মনের মধ্যে আলোড়ন তৈরি করেছিল। সাদা, কালো, লাল, হলুদ, সবুজ, নীল, বেগুনি, খয়েরি সব রং সবার মধ্যে মিশে একাকার হয়ে যায় মানবতার খেলার মধ্যে। এটাই বিশ্বকাপ ফুটবল। বিশ্ব ফুটবলের এই মহামিলন কাতারকে নিয়ে গেছে সম্মানের উচ্চ কাতারে আর বিশ্বমানবতাকে বন্দি করে ফেলেছে এক মোহনীয় জাদুর মধ্যে। এই ফুটবল উন্মাদনার মোহনীয়তার আবেশে পৃথিবীর সব মানুষ যদি ফাইনাল খেলার পর আরো দীর্ঘদিন জড়িয়ে থাকার সুযোগ পেত, তাহলে সব দুঃখ-কষ্ট ভুলে হয়তো আরো কিছুদিনের জন্য ভালো থাকার সুযোগ পেত। আগামী চার বছর পূর্ণ হওয়ার আগে তা কী করে আবার হবে? যদিও এরই মধ্যে দুই বছর অন্তর বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজনের দাবি উঠেছে।

লেখক :রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন

 

ইত্তেফাক/ইআ