করোনা মহামারি বিশ্ববাসীকে কতটা ভুগাইয়াছে তাহা যেন আমরা ভুলিতে বসিয়াছি। মাস্ক পরা, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ইত্যাদি আমরা বলিতে গেলে ছাড়িয়াই দিয়াছি। লকডাউনের মতো করোনা ব্যবস্থাপনার কথাও এখন আর কেহ উচ্চারণও করিতে চাহে না। কেননা লকডাউন আমাদের অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংস করিতে উদ্যত হইয়াছিল। সকল কিছুই যখন স্বাভাবিক পর্যায়ে চলিয়া আসিতেছিল এবং বিশ্ব হইতে করোনার উপদ্রব ক্রমান্বয়ে কমিয়া আসিয়াছিল, ঠিক তখনই করোনার নূতন আরেক ভ্যারিয়েন্ট আবারও চোখ রাঙাইতেছে। আশঙ্কার কথা হইল, বৎসরের শেষ সময়ে চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফের করোনা ভাইরাস মাথা চাড়া দিয়া উঠিতেছে। চীনে হুহু করিয়া ইহার সংক্রমণ বাড়িতেছে বলিয়া খবর প্রকাশিত হইতেছে। আমাদের নিকট প্রতিবেশী দেশ ভারতেও ওমিক্রনের নূতন ধরন ‘বিএফ.৭’ শনাক্ত হইয়াছে, যদিও তাহা রহিয়াছে একেবারে সীমিত পর্যায়ে। কর্ণাটক রাজ্যসরকার এই জন্য আবার মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করিয়াছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি স্বয়ং আবার সবাইকে মাস্ক পরিবার পরামর্শ দিয়াছেন।
কথায় বলে, ‘ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ভয় পায়’। এবার কি আমরা আগেভাগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারিব? ২০১৯ সালের শেষ দিকে চীনে যখন প্রথম বারের মতো করোনা আঘাত হানিল, তখন আমরা এই রোগ সম্পর্কে তেমন কিছু জানিতাম না বলিয়া বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে পারি নাই। কিন্তু এখন আমরা সকল কিছু জানিবার পরও যদি অবহেলা প্রদর্শন করি, তাহা হইলে এই জন্য আমরাই দায়ী থাকিব। সরকারের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি প্রত্যেক নাগরিককে আবার এই সম্পর্কে সচেতন ও সজাগ হইতে হইবে। বলা হইতেছে, চীনে নূতন করিয়া ২৫ কোটিও অধিক মানুষ করোনায় আক্রান্ত হইয়াছেন। যে কোনো সময় বাংলাদেশেও ইহার ঢেউ আছড়াইয়া পড়িতে পারে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সরকারের কোভিড-বিষয়ক জাতীয় কারিগরি কমিটি চার দফা সুপারিশ করিয়াছে। একই সঙ্গে বিমান, নৌ ও স্থলবন্দরগুলিতে সন্দেহভাজন যাত্রীদের হেলথ স্ক্রিনিং জোরদার করিতে নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। আশঙ্কার বিষয় হইল, বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, বিএফ.৭ ওমিক্রনের চাইতে চার গুণ অধিক সংক্রামক। যাহারা টিকা গ্রহণ করিতে পারেন নাই, এই ক্ষেত্রে তাহারা অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। প্রকৃতপক্ষে বিএফ.৭ হইল বিএ.৫ ভাইরাসের পরিবর্তিত রূপ। ওমিক্রনের সাবভ্যারিয়েন্ট বিএ.৫ ইহার আগে পৃথিবী জুড়িয়া নানান সমস্যা তৈরি করিয়াছে। ইহা ছিল খুবই সংক্রামক। আর বিএফ.৭ তাহার চাইতেও ভয়াবহ। এক জন আক্রান্ত ব্যক্তি ১০ হইতে ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ জনের মধ্যে এই রোগ ছড়াইয়া দিতে পারেন। ইহার লক্ষণগুলি হইল—কাশি, গলাব্যথা, নাক বন্ধ হইয়া যাওয়া, ক্লান্তি ইত্যাদি। ইতিমধ্যে চীন, ভারত, জার্মানি, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়ায় এই ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়াছে।
আমরা বলিয়া থাকি, সাবধানের মার নাই। সবাই যদি সচেতন হই, তাহা হইলে এই ধরনের যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমরা সহজেই মোকাবিলা করিতে পারি। ইহাতে আতঙ্ক ছড়াইয়া যাওয়ার বা আতঙ্ক্ষিত হওয়ারও কোনো কারণ নাই। কোভিড হাসপাতালগুলি বা যেই সকল হাসপাতালে কোভিডের চিকিৎসা অবকাঠামো রহিয়াছে, সেগুলিকে এখন হইতে প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন। সীমান্তে সতর্কতা জারির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের ওপর এখন হইতে নজরদারি বৃদ্ধি করিতে হইবে। জাতীয়ভাবে টিকাদান কর্মসূচি আবার কীভাবে সচল ও বেগবান করা যায়, তাহার উপায় লইয়া ভাবিতে হইবে। বিশেষ করিয়া এখন চতুর্থ ডোজ টিকা গ্রহণের উপর গুরুত্বারোপ করিতে হইবে। যাহারা ফ্রন্টলাইন ওয়ার্কার, গর্ভবর্তী নারী ও ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তি, তাহাদের দ্বিতীয় বুস্টার ডোজ দ্রুত নেওয়া প্রয়োজন। আর যাহারা বিভিন্ন রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত তাহাদের অবশ্যই এখন হইতে প্রটেকটিভ কেয়ার নিতে হইবে।
