সাধনার আশ্রমে বেড়ে ওঠা কবি এনামূল হক পলাশের জীবন ও কর্ম

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১১:৫৯

কবি এনামূল হক পলাশের জন্ম ২৬ জুন। ১৯৭৭ সালে নেত্রকোণায়। বাংলা ভাষার সহজিয়া ধারার একজন প্রতিশ্রুতিশীল কবি, লেখক, প্রাবন্ধিক, শিশু সাহিত্যিক ও গীতিকার। তিনি বামপন্থী বিপ্লবী রাজনৈতিক ধারার একজন কর্মী ছিলেন।

তিনি ‘অন্তরাশ্রম’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন এবং একই নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন পরিচালনা করেন। তার স্বপ্ন ‘অন্তরাশ্রম’ একদিন শান্তি নিকেতনের মতো আন্তর্জাতিক আনন্দশিক্ষালয় হিসেবে গড়ে উঠবে।

নিজের প্রতিষ্ঠিত স্বপ্নের ‘ভূমি জাদুঘর’ এর সামনে কবি এনামূল হক পলাশ

তিনি নেত্রকোণা জেলার বারহাট্টা উপজেলার বাদেচিরাম গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈত্রিক নিবাস একই উপজেলার বামনগাঁও গ্রামে। পিতা মরহুম এমদাদুল হক। এবং মাতা নুরুন্নাহার হক। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে কবি সবার বড়। 

স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত ও প্রগতিবাদী লেখক যতীন সরকারের সঙ্গে কবি এনামূল হক পলাশ

শিশুকাল নিজ গ্রামে কাটালেও পিতার ব্যবসাজনিত কারণে তার শৈশব কেটেছে বারহাট্টার গোপালপুর বাজারে। প্রথমে তিনি বারহাট্টার গোপালপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশু শ্রেনীতে ভর্তি হন এবং এক বছর পরে বারহাট্টা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেনীতে ভর্তি হয়ে একই স্কুল থেকে ১৯৮৮ সালে ট্যালেন্টপুল বৃত্তি পেয়ে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। 

কবি এনামূল হক পলাশ। ছবি: ছবি: আলী মোকাদ্দেস পাঠান

বারহাট্টা সি.কে.পি. পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে তিনি মাধ্যমিক শিক্ষা শুরু করে অস্টম শ্রেনীতে সাধারণ বৃত্তি পান এবং পরের বছর ড. ইন্নাছ আলী বৃত্তি প্রাপ্ত হয়ে ১৯৯৪ সালে বিজ্ঞান শাখায় প্রথম বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বারহাট্টা পাবলিক লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এর নিয়মিত পাঠক হিসেবে ব্রপক অধ্যয়ন করেন। ১৯৯৪ সালে উপজাতীয় কালচারাল একাডেমী থেকে প্রকাশিত মাটির সুবাস নামক একটি পত্রিকায় তাঁর একটি কবিতা প্রকাশিত হয় যা ছিল ছাপার অক্ষরে তাঁর প্রথম কবিতা। প্রকাশিত কবিতার জন্য তিনি মনি অর্ডার যোগে চল্লিশ টাকা সন্মানী প্রাপ্ত হয়েছিলেন। উক্ত চল্লিশ টাকার খরচ বাদে সাতত্রিশ টাকা পঁচিশ পয়সা হাতে পেয়েছিলেন তিনি।

৪৫তম জন্মদিনের আড্ডায় কবি এনামূল হক পলাশ

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ব বিদ্যালয় ইন্টারমিডিয়েট কলেজে তিনি উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা শুরু করে ১৯৯৬ সালে প্রথম বিভাগে এইচ এস সি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এ সময় তিনি ময়মনসিংহ শহরের কেওয়াটখালী এলাকায় রেলওয়ে কলোনীকে বসবাস করতেন। সাপ্তাহিক যায়যায়দিন পত্রিকার বিশেষ সংখ্যায় নিয়মিত লেখা পাঠাতেন। প্রায় সংখ্যায়ই তাঁর লেখা ছাপা হতো এবং তিনি মনি অর্ডার যোগে সন্মানী পেতেন।

নির্মলেন্দু গুণ প্রতিষ্ঠিত ‘কবিতাকুঞ্জ’র নির্মাণের সূচনা কাজে কবি এনামূল হক পলাশ

১৯৯৭ সালে পিতার অংশীদারী ব্যবসার সুবাদে তিনি ঢাকায় চলে যান এবং সেখানে দৈনিক ২০০ টাকা বেতনে চাকরি নিয়ে সরকারী তিতুমীর কলেজে উদ্ভিদ বিজ্ঞানে অনার্স ভর্তি হন। ১৯৯৮ সালে বন্যা জনিত কারনে পিতার ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ায় পারিবারিক সংকট এড়াতে নেত্রকোণা সরকারী কলেজে চলে আসেন এবং একই কলেজ থেকে ২০০২ সালে দ্বিতীয় শ্রেনীতে স্মাতক (সন্মান) উত্তীর্ণ হন। নেত্রকোনা সরকারী কলেজে উদ্ভিদ বিজ্ঞানে মাস্টার্স পড়ার সুযোগ না থাকায় তিনি গুরু দয়াল সরকারী কলেজে মাস্টার্স ভর্তি হয়ে ২০০৪ সালে উদ্ভিদ বিদ্যায় দ্বিতীয় শ্রেনীতে মাস্টার্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৯৮ সালে একটি প্রগতিশীল বাম সংগঠনের সাথে তাঁর যোগাযোগ স্থাপন হয় এবং তিনি প্রগতিশীল বিপ্লবী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। এ সময় রাজনৈতিক বিষয়ে ব্যপক অনুশীলন ও পড়াশোনা করেন। এই সময়টা তিনি অনেক পড়াশোনা এবং কবিতা লেখার ভেতর দিয়ে কাটিয়েছেন। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন সময় কয়েকটি জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকার সাথে যুক্ত থেকে সাংবাদিকতা করেছেন।

এটিএন নিউজের ‘ইয়াংনাইট’ প্রোগ্রামে অতিথি হিসেবে কথা বলছেন কবি এনামূল হক পলাশ

২০০৩ সালে তিনি রাজনীতি ছেড়ে ভূমি কর্মকর্তার সরকারী চাকুরিতে যোগদান করেন। জমি- দলিল দস্তাবেজ নিয়ে প্রচন্ড ব্যস্ত থাকার পরও তিনি লিখে যাচ্ছেন অবিরাম। 

২০০৫ সালে পারিবারিক সম্মতিতে নেত্রকোনা শহরে মাহবুবা আক্তার সুমার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তার স্ত্রী  পেশায় একজন প্রাইমারী শিক্ষক।

নিজ গ্রামে কবি এনামূল হক পলাশের প্রতিষ্ঠিত ‘কূপিবাতি’ ভাস্কর্য। ছবি: আহমেদ তোফায়েল
২০০৬ সালে অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় পিজি হাসপাতালে থাকাকালীন সময়ে মৃত কন্যা সন্তানের জন্ম হয় এবং নিজ হাতে কন্যাকে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করেন যা তার জীবনের বেদনাদায়ক এক অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করেন কবি।

২০০৭ সালে কোরবানী ঈদের দিন নামাজে যাওয়ার রাস্তায় কবির পিতা স্ট্রোক করেন। পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সংসারের সকল দায়িত্ব তখন থেকে কবির উপর বর্তায়। ২০০৯ সালে তিনি পুত্র সন্তানের জনক হন এবং একই সালে কবির প্রথম বই ‘অস্তিত্বের জন্য যুদ্ধ চাই’ প্রকাশিত হয়। 

মরমি কবি এনামূল হক পলাশের কাব্যগ্রন্থ ‘অন্ধ সময়ের ডানা’

২০১৫ সালে দ্বিতীয় কাব্য গ্রন্থ ‘জীবন এক মায়াবী ভ্রমণ’ প্রকাশিত হয়। ২০১৬ সালে তৃতীয় কাব্য গ্রন্থ ‘অন্ধ সময়ের ডানা’ প্রকাশিত হয় ও ‘লেখা প্রকাশ সাহিত্য সন্মাননা- ২০১৬’ এবং বাংলাদেশ শিক্ষা পর্যবেক্ষক সোসাইটি কর্তৃক ‘অমর একুশে স্মৃতি পদক- ২০১৬’ প্রাপ্ত হন।

নির্মলেন্দু গুণ প্রতিষ্ঠিত কবিতাকুঞ্জ’র নির্মাণের দায়িত্ব পালনকালে কবি এনামূল হক পলাশ
২০১৬ সালে কবি নির্মলেন্দু গুণ প্রতিষ্ঠিত নেত্রকোণার মালনী এলাকায় বিশ্ব কবিতার আবাসস্থল বা হোম অব ওয়ার্লড পয়েট্রি খ্যাত ‘কবিতাকুঞ্জ’ প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্ন থেকে অবকাঠামো গঠনের কাজে যুক্ত থেকেছেন এবং একই প্রতিষ্ঠানের প্রথম পরিচালক হিসেবে কবি কর্তৃক নিযুক্ত আছেন।

২০১৭ সালে কবি, লেখক ও সংস্কৃতি কর্মীদের ব্যবহারের জন্য তিনি নেত্রকোণা শহরের মালনী এলাকায় গড়ে তুলেছেন ‘অন্তরাশ্রম’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। তিনি এর প্রতিষ্ঠাতা। ও আচার্য।

মরমি কবি এনামূল হক পলাশের কাব্যগ্রন্থ ‘অন্তরাশ্রম’
২০১৭ সালে চতুর্থ কাব্য গ্রন্থ ‘অন্তরাশ্রম’ ও পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ ‘মেঘের সন্ন্যাস’ প্রকাশিত হয় এবং নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার চর্চা সাহিত্য আড্ডা কর্তৃক তাদের শততম আসরে অন্যান্যদের সাথে ‘চর্চা শুভেচ্ছা সন্মাননা- ২০১৭’ প্রাপ্ত হন।

২০১৮ সালে ষষ্ঠ কাব্য গ্রন্থ ‘পাপের শহরে’ প্রকাশ হয় এবং কবির চল্লিশ পূর্তি উপলক্ষে কবির জীবন ও কর্ম নিয়ে ‘আশ্রম পাখির মায়াপথ’ নামে একটি প্রকাশনা গ্রন্থ বের হয়।

মরমি কবি এনামূল হক পলাশের কাব্যগ্রন্থ ‘পাপের শহরে’
২০১৯ সালে সপ্তম কাব্য গ্রন্থ ‘জল ও হিজল’ প্রকাশিত হয়। একই সালের ১ ফেব্রুয়ারি নিজ গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে কূপিবাতি নামক একটি ভাষ্কর্য স্থাপন করেন।

২০২০ সালে একটি শিশুতোষ বই ‘বইয়ের পাতায় ফুলঝুরি’ এবং ‘ভূমি ব্যবস্থাপনার সরল পাঠ’ নামে একটি গবেষণাধর্মী বই প্রকাশিত হয়। একই বছর তিনি ভারত ভ্রমণ করেন।

ভারত ভ্রমণে কলকাতায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে কবি এনামূল হক পলাশ। ছবি: পলিয়ার ওয়াহিদ

২০২১ সালে অষ্টম কাব্যগ্রন্থ ‘তামাশা বাতাসে পৃথিবী’, শিশুতোষ বই ‘কলমি লতার ফুল’ এবং ‘ধর্মবিশ্বাস আখ্যানের মতো সুন্দর’ নামে একটি প্রাচীন আরবী সাহিত্যের কবিতা অনুবাদ বই প্রকাশিত হয়।

দুই হাজার বছর পূর্বের আরবি কবিতা অনুবাদ করেন কবি এনামূল হক পলাশ

তিনি ২০২১ সালে নেত্রকোণায় একটি ‘ভূমি জাদুঘর’ (ভূমি ও কৃষি উপকরণ প্রদর্শনশালা) প্রতিষ্ঠার ধারণাপত্র তৈরি করেন এবং পরবর্তীতে তার ধারণার উপর ভিত্তি করে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নেত্রকোণার মেছুয়া বাজার সংলগ্ন পুরাতন সদর কাচারিকে ভূমি জাদুঘর হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

কবির কাব্যগ্রন্থ লাবণ্য দাশ এন্ড কোং। প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী আল নোমান
২০২২ সালে নবম কাব্যগ্রন্থ ‘অখন্ড জীবনের পাঠ’, দশম কাব্যগ্রন্থ ‘লাবণ্য দাশ এন্ড কোং’ ও শিশুতোষ বই ‘মগড়া নদীর বাঁকে’ এবং ‘মু-আল্লাক্বা’ নামে প্রাচীন আরবী সাহিত্যের কবি ইমরুল কায়েসের কবিতার অনুবাদ প্রকাশিত হয়।

সর্বকালের শ্রেষ্ঠ কবি ইমরুল কায়েসের কবিতা অনুবাদ করেন এনামূল হক পলাশ

একই বছর তার কিছু কবিতা নিয়ে ইংরেজিতে ভাষান্তরিত বই CROSSING FORTY NIGHTS প্রকাশিত হয়।

ভারতে প্রকাশিত হয়েছে এনামূল হক পলাশের ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ

এই ডিসেম্বরে বাবুই প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে পাখপাখালির ছড়া নামে একটি শিশুতোষ বই।

এছাড়া তিনি ‘গণতন্ত্রের গান’ ও ‘রাত্রির গান’ নামক দুটি গানের গীতিকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

তার এ দুটি গানসহ ‘বাউলজন্মের গান’ নামক আরেকটি গান দেশে খুবই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।

বইমেলা ২০২৩ এ প্রকাশিত হয়েছে এনামূল হক পলাশের পাখপাখালির ছড়া

তিনি ছাদ বাগান করেন। তিনি মনে করেন নিজের গাছ থেকে নিজের অক্সিজেন সংগ্রহ করবেন। তাঁর ছাদ ঘুরে দেখা গেছে ছোট ছোট চৌবাচ্চায় শাপলা- পদ্ম ফুটে আছে। ছাদে পদ্ম ফুটিয়েছেন বলে কবি নির্মলেন্দু গুণ তার বাসস্থানের নাম দিয়েছেন স্থলপদ্ম।  বর্তমানে তিনি বসবাস করেন সেখানে।

প্রকৃতিপ্রেমী কবি এনামূল হক পলাশের ছাদ বাগানে ফোটা পদ্মফুল। নিচে দেশটিভির প্রতিবেদনের লিংক..

তার সাথে কথা বললে তিনি জানান, জীবনের বিচিত্রতা আমাকে দিন দিন সহজ হওয়ার সাধনার দিকে নিয়ে গেছে। তাই সহজের সাধনা করি। আমি সাধু নই। সাধু হতেও চাইনা। সহজ হতে চাই। অন্তরাশ্রমের পথ বেয়ে পৃথিবীর পথে পথে ছড়িয়ে দিতে চাই ভালোবাসা ফুল।

প্রগতিবাদী প্রাবন্ধিক ও লেখক অধ্যাপক যতীন সরকার বলেন, “একবারে নিজস্ব ব্যক্তিগত বোধ থেকে শুরু করে সামাজিক সমস্যা-সংকট পর্যন্ত সবকিছুর মর্মানুধাবনে পলাশ অনন্যতার প্রকাশ ঘটাতে পেরেছ- ‘স্টাইল ইজ দি ম্যান’ কথাটির জীবন্ত উদাহরণ হয়ে উঠেছে তার প্রতিটি কবিতা। পলাশের কাব্যগ্রন্থের যে কোন পাঠকই কবিতার নতুন স্বাদ উপভোগ করে তৃপ্ত হতে পারেন বলে আমি মনে করি।”

কলকাতায় জোড়াসাঁকো রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে কবি এনামূল হক পলাশ। ছবি: পলিয়ার ওয়াহিদ

কবি নির্মলেন্দু গুণ লিখেছেন, ‘কবি এনামূল হক পলাশ তাঁর প্রকাশিতব্য চতুর্থ কাব্যগ্রন্থের নাম রেখেছেন– ‘অন্তরাশ্রম’। বাংলা অভিধানে আশ্রম ও আশ্রয় শব্দ দুটির পাশাপাশি অবস্থান তাৎপর্যপূর্ণ। কবির অন্তর তো মানব জাতির জন্য আশ্রমই বটে। কবির অন্তর হচ্ছে সকল প্রাণের অভয়ারণ্য।’

কবি এনামূল হক পলাশের কাব্যগুন্থ ‘মেঘের সন্ন্যাস’

এনামূল হক পলাশের কবিতা পাঠ করে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও অধ্যাপক মতীন্দ্র সরকার লিখেছেন, ‘যথার্থ কবিতার ভাব ও অর্থ একদিকে যেমন কলান্তরে অস্তিত্ব বজায় রাখে তেমনি নতুন থেকে নতুনতর অর্থ ও ভাব সে ধারণ করে ও প্রকাশ করে। প্রতিটি পাঠকের ভাব ও চিন্তাকে ধারণ করেই কবিতা কালান্তরের পথে সঞ্জীবিত থাকে। এনামূল হক পলাশের কবিতাও কবির নিজের কাছে যে ভাব ও অর্থ ধারণ করছে, আমাদের মত পাঠকের কাছে তা কালান্তরে নতুন অর্থ ধারণ করেই মূর্ত হবে।’

বামপন্থি আন্দোলন করা এনামূল হক পলাশের গবেষণাগ্রন্থ ‘ভূমি ব্যবস্থপনার সরল পাঠ’

নেত্রকোণা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর শীতাংশু কুমার ভদ্র বলেছেন, ‘জ্ঞান ও কর্মে ছাত্রের নিকট পরাস্ত হওয়াই শিক্ষকের অহংকার। আমি সেই অর্থে অহংকারী। সাহিত্য ও সাংগঠনিক কর্মকান্ড, সাধারণ মানুষের প্রতি সহানুভূতি, প্রকৃতি প্রেমী, পরিবেশ বান্ধব-কর্মসূচীতে স্বকিয়তা, সত্যকথা অকপটে বলা, বন্ধু বাৎসল্য, পরিবার পরিজনের সংগে সদ্ভাব, সন্তানের প্রতি অকৃত্রিম স্নেহ ও সুশিক্ষার প্রয়াস, প্রকৃতির প্রতি মায়া, বিরল প্রজাতি উদ্ভিদ ও প্রাণী সংরক্ষণে তৎপরতা, নিজ আবাসে জীবের সমাহার ঘটানো এবং সুবিধা বঞ্চিত সরল গণমানুষের জন্য সহযোগিতার হাত তার প্রসারিত। মানুষকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করে তার আত্মতৃপ্তি জেনে আমি খুবই খুশী হই এবং গর্ববোধ করি।’

কবি এনামূল হক পলাশ। ছবি: কবির সোহাগ

কবি মিজান মল্লিক বলেন, ‘কাব্যখ্যাতি-যশ তাঁকে ধরা দিয়েছে। সৌন্দর্যের সান্নিধ্যে আছেন পলাশ। কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি তাঁর ছাদবাগানে আরও আরও পদ্ম ও দোলনচাঁপা ফুটুক।’

একপাশে বাংলা অন্যপাশে ইংরেজি অনুবাদে প্রকাশিত কবি এনামূল হক পলাশের কাব্যগ্রন্থ

গল্পকার মোর্শেদ শেখ বলেন, ‘পলাশের মানবিক বোধ, বিশ্লেষণ ক্ষমতা আমাকে সবসময়ই মুগ্ধ করে রেখেছে। কিন্তু আজকে এই চল্লিশে এসে বোধ হয় বলতেই হচ্ছে পলাশ তার কোন ক্ষমতারই পরিপূর্ণ ব্যবহার করেনি।’

কবি যুবা রহমান বলেন, ‘পলাশের কবিতাও অনেকে পছন্দ করেন। কবিতার সঙ্গে অনেক দিন লেগে থাকার কারণে হোক, সামাজিক কারণে হোক, পলাশের একধরনের প্রভাববলয় তৈরি হইছে।’

কবি এনামূল হক পলাশের ৪০তম জন্মদিনে বন্ধুদের করা স্মারকগ্রন্থ

কবি মামুন খান বলেন, ‘এনামুল হক পলাশ। আমাদের ভাই ও বন্ধু। আপাদমস্তক একজন কবি। স্বাপ্নিক, বিপ্লবী, বন্ধুপ্রাণ, চঞ্চল এবং কর্মবীর একজন মানুষ। বহুরৈখিক এই মানুষটি থেমে থাকতে জানেন না। এক সঙ্গে বহু পথে হাটতে এবং বহুজনকে নিয়ে চলতে ভালবাসেন। একাধিক গন্তব্যে ধাবিত হওয়াটা তাঁর নেশা ও আনন্দ। এক্ষেত্রে ব্যর্থতা নিয়ে তাঁকে ভাবতে দেখিনি। ব্যর্থ হলেও কোনো কালিমায় তার মুখ কালো বা করুণ হতে দেখিনি। যখন লেখেন দুহাত ভরে লেখেন। কি হলো না হলো- না ভেবে প্রাণের পংক্তিগুলোকে মর্যাদার সাথে সাজিয়ে রাখেন কবিতার উদ্যানে। নিমগ্ন অনুধ্যানে যখন ফুল ফোটান ছাদবাগান বা বারান্দায়- তিনি নিজেও পুষ্প হয়ে যান। নিজের ফোটানো ফুলের মতই তাঁর মুখ হাসতে থাকে জগতের হাওয়ায়। যখন পাখি পোষেন, এমন এক কিচিরমিচির ঘোর তাঁর চোখে মুখে- যেন পৃথিবীর সমস্ত পাখি তাঁর জন্মসহোদর। যেনো তিনি নিজেও এক বন্দীপাখি এই জীবন-সংসার খাঁচায়।’

কবি এনামূল হক পলাশ। ছবি: বারীণ ঘোষ

কবি সজল অনিরুদ্ধ বলেন, ‘অন্তরাশ্রমে বেদনায় ক্লিষ্ট কবি সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করেছেন। কিন্তু, না। এই সন্ন্যাসে গিয়ে কবি যেন আরও বেশি সমাজ সচেতন হয়ে উঠেছেন।  ভুলে যাননি তার হাড় জিরজিরে কৃষকের কথা।  ভুলে যাননি বিপন্ন মানুষের কথা।  মানুষের জন্যই, মানবতার জন্যই কবির এই সন্ন্যাস গ্রহণ।  আমিত্বকে ছেড়ে মানুষ যখন সর্বজনীন হয়ে উঠে তখন তার শক্তির প্রতাপ আরো বাড়ে। আমাদের মেঘের সন্ন্যসী সেই শক্তি অর্জন করেছেন।’ 

কবি পলিয়ার ওয়াহিদ বলেন, ‘তিনি নিজস্ব জনপদের মুখের ভাষাকে কবিতায় স্থান দিয়েছেন বুক উঁচু করে। গোয়ো আর আঞ্চলিক তকমাকে গায়ে না মাখিয়ে উল্লাসে প্রকাশ করেছেন কবিতার আপন বৈভব। কি অসাধারণ উপমায় আধুনিক সংসারকে ইঙ্গিত করলেন। সত্যি বিস্মিত না হয়ে পারি না। এনামূল হক পলাশ ভাইয়ের কবিতা মূলত পাঠের, তা লিখে বোঝানো সত্যিই বোকামী। প্রতিটি কবিতা তিনি দর্শনরসে চুবায়ে পরিবেশন করেন সাদামাঠাভাবে। আর এখানেই তার মুন্সিয়ানা ধরা পড়ে ষোলআনা। এতো সহজ ভাষায় প্রকাশ করেন যে, পাঠের পর রয়না মাছের মতো ফাঁদে হা হয়ে পড়ে থাকা ছাড়া উপায় থাকে না!’

কবি এনামূল হক পলাশ। ছবি: বারীণ ঘোষ

প্রাবন্ধিক ও লেখক অধ্যাপক বিধান মিত্র বলেন, ‘এনামূল হক পলাশ, আপাদমস্তক কবি-মাটির কবি, মানুষের কবি; জীবনের কবি, মরমের কবি। এনামূল হক পলাশ বঙ্কিম-কথিত উৎকর্ষ আদর্শ সামগ্রীর কাব্যিক-শরীর দানকারী সৃষ্টিশীল কবি। আমাদের বোধ ও বিদ্যায় জনসনতত্ত্বকে স্থাপন করে আমরা যদি এনামূল হক পলাশরচিত কবিতাগুলো পড়ি, তাহলে দেখবো-তিনি যা লিখেছেন, সবই পলাশ-রাঙানো কবিতা, রূপ-রস-বর্ণ-গন্ধময় কবিতা, ‘কবিতা নয়’ (বা কবিতা হয়ে ওঠেনি) এমন একটা লেখাকেও তিনি ‘কবিতা’ হিসেবে চালিয়ে নেবার দুশ্চেষ্টা করেননি।বর্তমান আধুনিক কবিতার হরেক রকম ‘তত্ত্ব’ ও ‘বাদ’ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তিনি তাঁর ভাবনাপূঞ্জকে পাঠক-বোধাতীত জগতে নিয়ে যাননি, কবিতার ভাব-লয়-দেহকে তিনি বরাবরই মাটি ও মানুষ সংলগ্ন রেখেছেন, ভাবের জগতকে চোরাবালির ফাঁকে নিয়ে যাননি, সাধারণ পাঠকের মেধা ও বোধকে‘পরীক্ষার’ আসনে বসাননি।’

কবি এনামূল হক পলাশ। ছবি: আলী মোকাদ্দেস পাঠান

কবি কানিজ মাহমুদ বলেন, ‘একটি নতুন দিনের স্বপ্ন দেখি আমরা সবাই। দেখতে দেখতে স্বপ্নটাই পুরানো হলো,তবু স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেলো, বাস্তবায়নের কিছুই হলো না। স্বাপ্নিকরা ও ক্লান্ত এখন কেউ বা নিরাশ হয়ে ফিরে গেছেন। কেউ বা সিঁড়ি ডিঙিয়ে স্বপ্ন ছোঁয়ার আহবানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম প্রলুদ্ধ করছেন।যাদের স্বপ্ন দেখা বা দেখানো শেষ হয় না তারাই কবি,আজন্ম স্বপ্নদ্রষ্টা। পরিবার, সমাজ ,রাষ্ট্রের নানা অসংগতির বিরুদ্ধে দাড়িয়ে থাকেন আপোষহীন। এমন'ই এক আপাদমস্তক কবি এনামূল হক পলাশ।’

ইত্তেফাক/পিও