সকলকেই মায়া ত্যাগ করিতে হইবে

আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০২২, ০২:৩৪

নশ্বর ধূলিধরার কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নহে। সীমাহীন বৈচিত্র্য-সম্ভারে সৃষ্ট পৃথিবীতে সকল কিছুকে জয় করিতে পারিলেও মৃত্যুর কাছে মানুষ নিতান্তই অসহায়। এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটাইবার সাধ্য নাই কাহারও—সকলকেই ওপারের ডাকে সাড়া দিয়া থামিয়া যাইতে হয়। জগতের এই অমোঘ নিয়মে ৮২-তে থামিয়া গেলেন ফুটবলের রাজা পেলে। শেষ খেলায় ফাইনাল বাঁশি বাজার মধ্য দিয়া মহাকালের পথ ধরিলেন ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধরত ফুটবল মহানায়ক।

ব্যক্তি হিসাবে অনেকেই ‘অমরত্বের’ আখ্যা লাভ করেন মৃত্যুর পর। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে জীবদ্দশাতেই ‘কিংবদন্তি’ উপাধিতে ভূষিত হন কেউ কেউ। পেলে ছিলেন এই তালিকার শীর্ষ পর্যায়ে। বিশ্ববাসীর কাছে তিনি অনুপ্রেরণার, অনুকরণীয়। পৃথিবীর সকল প্রান্তের মানুষের ভালোবাসায় কানায় কানায় পূর্ণ ছিল তাহার জীবন। ধরাধাম হইতে তিনি বিদায় নিয়েছেন যদিও, তথাপি মোহিত করিয়া গিয়াছেন গোটা বিশ্বকে। জীবনপথের বহু চড়াই-উতরাইয়ের স্বাদ আস্বাদন করা পেলে উপলব্ধি করিয়াছিলেন, ‘জীবন মানেই যুদ্ধ’। এই কারণে শুধু ফুটবল মাঠেই যুদ্ধ সীমাবদ্ধ রাখেন নাই তিনি। বিশ্বব্যাপী জনকল্যাণমূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখিয়া শান্তির বাণী ছড়াইয়া গেছেন আমৃত্যু। পেলেকে বলা হইত ‘সকল সমস্যার সমাধান’। বিশ্বকে অবাক করিয়া দিয়া যুদ্ধ পর্যন্ত থামাইয়া দিয়াছিলেন বিংশ শতাব্দীর এই বৈশ্বিক আইকন! ইন্টারন্যাশনাল অলিম্পিক কমিটি পেলেকে ‘অ্যাথলেট অব দ্য সেঞ্চুরি’ হিসাবে স্বীকৃতি দেয়। ফিফার কাছে তিনি ‘ফুটবল প্লেয়ার অব দ্য সেঞ্চুরি’। ব্রাজিল সরকারের কাছে তিনি ‘জাতীয় সম্পদ’। আর পেলেকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবলার গণ্য করেন আপামর বিশ্ব ফুটবল ভক্ত। আমরা পেলেকে বলিব—‘মানবিকতার দূত’। একদা পেলে বলিয়াছিলেন, ‘পৃথিবীর সব বাচ্চা—যাহারা ফুটবলার হইতে চায়, পেলের মতো হইতে চায়, তাহাদেরকে কেবল ফুটবলার হওয়ার ক্ষেত্রেই নহে, বরং কীভাবে প্রকৃত মানুষ হইতে হয় তাহা দেখানোও আমার বড় দায়িত্ব।’ সত্যিই, ফুটবল ও জীবনকে দারুণভাবে মিলাইয়াছিলেন এই কিংবদন্তি। হিসাব কষিয়া বলিয়াছিলেন, ‘পৃথিবীর উপর সংঘটিত সকল কিছুই এক-একটি খেলা। ইহা যেন ফুটবল পাসের মতোই ব্যাপার! আমরা সবাই একসময় চলিয়া যাইব। সবার অবস্থাই হবে একই রকম’। কী অসাধারণ উপলব্ধি! চিরসত্য হইল—মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ। শ্রেষ্ঠত্বের এই মহিমায় স্বীয় বুদ্ধি-বিবেক সহযোগে গৌরবের আসনে অধিষ্ঠিত হয় মানুষ। মহত সকল কর্মের মাধ্যমে লাভ করে অমরত্ব। তাই বলিতেই হয়, বয়সের ফ্রেম দিয়া যাহাদের আটকাইয়া রাখা যায় না, মানবিক কীর্তি গড়িয়া যাহারা মানুষের মনে স্থায়ী আসন পাতিয়া লয়, তাহাদের যথার্থভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায় কেবল মানবিকতার বিশেষণে।

মৃত্যু অনিবার্য, চূড়ান্ত বাস্তব। জন্মগ্রহণ করিলে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করিতেই হইবে। স্বয়ং মহান সৃষ্টিকর্তা  সুরা আল ইমরানের ১৮৫ নম্বর আয়াতে বলিয়াছেন,  ‘প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করিতে হইবে’। সুরা তাওবার ১১৬ নম্বর আয়াতে বলা হইয়াছে, ‘তিনিই জীবন দান করেন, মৃত্যু ঘটান।’ অর্থাৎ মৃত্যুকে এড়ানো অসাধ্য। তবে রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হইয়া মারা যাওয়া এবং অকস্মাৎ মৃত্যুবরণ করা লইয়া যুক্তি থাকিতে পারে। যুক্তিস্বরূপ, হঠাত মৃত্যু হইলে নিজের কৃতকর্ম, ভুলত্রুটির জন্য সৃষ্টিকর্তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনার সুযোগ থাকে না একেবারেই। অন্যদিকে, হাতে সময় থাকিলে কঠিন বাস্তবতায় পতিত হইয়া আত্মোপলব্ধির বোধ জাগ্রত হওয়া সাপেক্ষে—অনুশোচনা, আত্মসংশোধনের সুযোগের সদ্ব্যবহার করিতে পারা যায়। মানুষ যেই হেতু ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে নহে, ত্রুটিবিচ্যুতির বাহিরে নহে, সেই হেতু এই মহাসুযোগ স্রষ্টার আনুকূল্য, মার্জনা পাইবার রাস্তা কিছুটা হইলেও অবারিত করিয়া দেয়। যদিও মৃত্যু যুক্তির সীমানার বাহিরে। অথচ আজিকার বিশ্বে আমরা এই বাস্তবতাকে মাথায় রাখি বলিয়া মনে হয় না। যদি রাখিতাম, তাহা হইলে শান্তির পথে হাঁটিতাম—বারুদের গন্ধে বাতাস ভারী করিতাম না। প্রকৃতির নিয়মেই হউক কিংবা নিজেদের কর্মকাণ্ডের খেসারতের ফলাফলস্বরূপই হউক, প্রতিদিন হাজার হাজার প্রাণহানি ঘটিলেও আমাদের টনক নড়িতেছে না। যুদ্ধবাজ দেশ সংঘাত সৃষ্টি করিয়া নিজে তো লাশ ফেলিতেছেই, অন্য দেশ, শক্তিকে স্বার্থের জালে জড়াইয়া যুদ্ধ বৃহত ও দীর্ঘমেয়াদি করিবার ফন্দি আঁটিতেছে! দেশে দেশেও বিভিন্ন অঘটঘটনপটীয়সীদের পাঁয়তারা চলিতেছে! নিয়তি-প্রকৃতি-নিয়মের ধার ধারিতেছে না কেহই! ‘জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা রবে?’—সত্যিকার অর্থেই আমরা যেন ভুলিয়া গিয়াছি এই  চিরন্তন বাণী।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন