রংপুরে বাড়ছে অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেওয়া শিশুদের চোখের ব্যাধি রেটিনোপ্যাথি অব প্রিম্যাচিউরিটি বা আরওপি। জন্মের ৩০ দিনের মধ্যে এ রোগের চিকিৎসা না হলে শিশু চিরতরে অন্ধ হয়ে যেতে পারে। নির্দিষ্ট সময়ের আগে এবং কম ওজন নিয়ে জন্মালে ঐ শিশুর ‘আরওপি’ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। আরওপিজনিত অন্ধত্ব প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই বলে জানান রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের বর্হি বিভাগের ডা. মাহামুদুর রহমান।
তিনি বলছেন, আগের তুলনায় এ রোগের প্রকোপ ২৩ থেকে ৩৫ শতাংশে বেড়েছে। তবে সব জায়গায় রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকায় জরিপ সঠিক হচ্ছে না। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এক জরিপে দেখা যায়, ৩৪ সপ্তাহের আগে জন্ম নেওয়া বা ১ কেজি ৮০০ গ্রামের কম ওজনের যেসব নবজাতক ২০১৩ সালের জুলাই থেকে ২০১৪ সালের জুলাই পর্যন্ত রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন ক্লিনিকে ভর্তি হয়েছিল, তার ৩৫ শতাংশই আরওপিতে আক্রান্ত। বাংলাদেশে আরওপিজনিত শিশু অন্ধত্ব প্রতিরোধ ও চিকিৎসাসেবার সুযোগ সৃষ্টি ও জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য চক্ষু রংপুর মেডিক্যাল হাসপাতাল ও নবজাতক সেবাদানকারী হাসপাতালগুলোর সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের ডা. মাহামুদুর রহমান বলেন, আমরা সত্যিকার অর্থে যদি ইউনিভার্সেল আই হেলথ কাভারেজ অর্জন করতে চাই, তাহলে শিশুদের মা-বাবা, সেবা প্রদানকারী ও নবজাতক-সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীসহ সব অংশীজনের সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। জেলা পর্যায়ে যেসব নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা ইউনিট, নবজাতক বিশেষ পরিচর্যা ইউনিট এবং মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল রয়েছে, সেগুলোকে যদি আমরা প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও মানবসম্পদ এবং অক্সিজেন পরিচালনা পদ্ধতি সঠিকভাবে দিতে পারি, তাহলে আমাদের আরওপিজনিত অন্ধত্ব প্রতিরোধ করা সহজ হবে। মায়ের গর্ভে একটি শিশু ১০ মাস থাকে। কিন্তু কোন শিশু যদি ৮-৭ মাস বা ৬ মাসে জন্ম নেয়। ঐসব অপরিণত শিশুর ওজন যদি হয় এক কেজি বা তারও কম, যেমন ১২০০ গ্রাম বা ১৫০০ গ্রাম। এক কথায় যেসব নবজাতক অপরিণত। স্বল্প ওজন নিয়ে জন্মানো সেইসব শিশুর রেটিনা ঠিকমতো তৈরি হয় না। এছাড়া কম ওজনের বাচ্চাদের বাঁচাতে এনআইসিইউতে ভর্তি থাকতে হয়, তাদের ফুসফুস ঠিকমতো তৈরি হয় না, ফলে তাদের অক্সিজেন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। তাদের শ্বাসকষ্ট হয়, বিভিন্ন ধরনের ইনফেকশনের ঝুঁকিতে থাকে। সে কারণে দেখা যায় অনেক সময় যেটুকু রেটিনা তৈরি হয়েছিল, তাও নষ্ট হয়ে যায়। এ ধরনের শিশুরা সারা জীবনের জন্যে অন্ধ হয়ে যায়।এটাই হচ্ছে রেটিনোট্যাথি অব প্রিম্যাচুরিটি। সঠিক সময় চিকিৎসা নিলে শিশুর অন্ধত্ব প্রতিরোধ করা সম্ভব। চিকিৎসার মধ্যে আছে লেজার ও ইনজেকশন। অনেক ক্ষেত্রে জটিলতা থাকলে লেজারের বদলে ইনজেকশন দিয়ে থাকি, এটাও খুব কার্যকরী চিকিৎসা।
রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. শরিফুল হাসান জানান, শিশুর জন্ম যদি হয় ৩৫ সপ্তাহ বা তার আগে এবং জন্মের সময় শিশুর ওজন হয় ২০০০ গ্রাম বা তারও কম, তাহলে ৩০ দিন বয়সে শিশুর চোখের মনি ড্রপ দিয়ে বড় করে রেটিনা পরীক্ষা করাতে হবে। শিশুর জন্ম যদি হয় ১২৩০ গ্রাম বা কম তাহলে ২০ দিন বয়সে শিশুর চোখের মনি ড্রপ দিয়ে বড় করে পরীক্ষা করাতে হবে। এছাড়া যদি শিশুর জন্মের পর নিউনেটাল আইসিইউতে অনেক ঝড়-ঝাপটা পার করে, অনেক খারাপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়।শিশুর ওজন যদি ২০০০ গ্রামের বেশিও হয়, ওই শিশুর রেটিনা পরীক্ষা ৩০ দিন আগেই করাতে হবে বলে জানান এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। (এই প্রতিবেদনটি বিএনএন আরসি’র তত্বাবধানে স্বাস্থ্য সাংবাদিকতায় মিডিয়া ফেলোশিপ এর আওতায় প্রস্তুতকৃত।)
