‘আশার আলোকে/ জ্বলুক প্রাণের তারা’

আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০২৩, ০৫:২২

আরো একটি বৎসর মহাকালের গর্ভে হারাইয়া গেল। কেমন ছিল শেষ বৎসরটি, তাহা এখন অতীত। কেমন বৎসর সামনে রাখিয়া আজ শুরু হইল নতুন বৎসর, ইহাই এখন বড় আকারে প্রশ্নবোধক চিহ্ন আঁকিয়া আমাদের সম্মুখে উপস্থিত। এই মুহূর্তে আমাদের মনে হইতেছে একটি যুদ্ধের মুখে আমরা দাঁড়াইয়া আছি। ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার মধ্য দিয়া সমগ্র বিশ্বই অনেকটা জিম্মি হইয়া পড়িয়াছে। উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য ইহা আরো কঠিন সত্য হইয়া উঠিয়াছে। কবি শুকান্ত ভট্টাচার্যের ভাষায় বলিতে হয়, ‘হিসাবের খাতা যখনি নিয়েছি হাতে/ দেখেছি লিখিত-‘রক্ত খরচ’ তাতে।’

মানুষের জন্যই এই পৃথিবী; কিন্তু সেই মানুষ নির্বিচারে হত্যা চলিতেছে, জিম্মি হইয়া পড়িয়াছে অর্থনৈতিকভাবে। ইউক্রেনে মানুষের সরাসরি মৃত্যু ছাড়াও ভাতে-কাপড়ে মরিতে হইতেছে বিশ্বব্যাপী মানুষকে। বহু দেশের বহু কলকারখানা বন্ধ হইয়া গিয়াছে, খাদ্য উৎপাদন ও আমদানি বন্ধ হইবার উপক্রম হইয়া পড়িয়াছে। এমনকি কোনো কোনো দেশ জ্বালানি ক্রয় করিতে না পারিয়া স্থবির হইয়া যাইবার উপক্রম হইয়াছে। প্রায় এক বৎসর হইতে চলিল, এখন পর্যন্ত কোনো সমাধান তো আসেই নাই, বরং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তাহার আক্রমণের ধার প্রতিনিয়ত বাড়াইতেছেন। ইহা হয়তো-বা তাহার হতাশা ও ব্যর্থতারই বহিঃপ্রকাশ। হতাশাই তাহাকে হয়তো মরিয়া (ডেসপারেট) করিয়া তুলিয়াছে। কারণ মানুষের স্বভাব হইল সে হতাশ হইলে আরো ক্ষিপ্ত হইয়া উঠে। তাহার এই হতাশার কতটা যুক্তিহীন তাহা ভাবিয়া দেখার বিষয়। রাশিয়ার তুলনায় প্রায় নিরস্ত্র একটি দেশের উপর ঝাঁপাইয়া পড়িল রুশ বাহিনী; কিন্তু জর্জিয়া যুদ্ধের মতো ইউক্রেনকে কাবু করিতে না পারিয়া ধ্বংস করিতে শুরু করিলেন বেসামরিক অবকাঠামো, এই তীব্র শীতে যেন ইউক্রেনবাসী ঘরে উষ্ণ থাকিতে না পারে, তাই পাওয়ার প্ল্যান্টগুলি ভাঙিয়া দিতে শুরু করিলেন। হিমাংকের নিচের তাপমাত্রায় এখন ইউক্রেনের বহু শহর। রাজধানী কিয়েভে আসিয়া আছড়াইয়া পড়িতেছে গোলা, ধ্বংস হইতেছে বাড়িঘর। এমনকি বিশ্লেষকেরা বলিতেছেন, রাশিয়া এইভাবে সফল না হইলে পরমাণু অস্ত্রও ব্যবহার করিতে পারে! আমরা বলিব, এই সমস্যার সম্মুখে দাঁড়াইতে হইবে বিশ্বনেতৃবৃন্দকে। হয় মোকাবিলা করিতে হইবে, অথবা ইহার সম্মুখে দাঁড়াইতে হইবে। ইহার কোনো বিকল্প নাই। দেখিতে হইবে, যাহারা ইউক্রেনকে রক্ষা করিবার জন্য বিভিন্ন সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়াছিল, তাহারা সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করিতেছে কি না। 

আগামী দিনগুলি কেমন হইবে তাহা লইয়া আমরা কেহই নিশ্চিত নহি। হয়তো পৃথিবী সুস্থ হইয়া উঠিবে, হয়তো আরো অধিক জাতি মারণাস্ত্রের সম্মুখীন হইয়া পড়িবে। তাহার পরও আমরা আশাবাদী। মানুষ নতুন বৎসর আসিলে তাহা উদযাপন করিতে চাহে। ইহার প্রধান কারণ, সে তাহার চেতনে-অবচেতনে ভাবে, মরি নাই! এত কিছুর মধ্যেও আমি জীবিত আছি। এই মানুষই আবার স্বপ্ন দেখিতে ভালোবাসে। আগামীর স্বপ্ন তাহাকে আশাবাদী করিয়া তোলে। তাই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা প্রাসঙ্গিক হইয়া উঠে, ‘আশার আলোকে/ জ্বলুক প্রাণের তারা,/ আগামী কালের/ প্রদোষে-আঁধারে/ ফেলুক কিরণ ধারা’।

নূতন বৎসর শুধু দিন পরিবর্তন করিতে আসে না। নূতন করিয়া ভাবিবার, নিজেকে নূতন করিয়া সাজাইবার সুযোগও লইয়া আসে। তাই আমরা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বেনিয়ামিন ফ্রাংকলিনের সেই কথাকেই স্মরণ করিলে সার্থক হইব; তিনি বলিয়াছিলেন, ‘যুদ্ধ করো তোমার নিজের কুপ্রবৃত্তির সহিত, শান্তি গড়িয়া তোলো প্রতিবেশীর সহিত এবং প্রত্যেক নূতন বৎসরে নিজেকে আরেকটু উন্নত বলিয়া আবিষ্কার করো।’ সকলকে ইংরেজি নূতন বৎসরের শুভেচ্ছা।

 

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন