আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জনের পর একজন সিনিয়রের অধীনে শিক্ষানবিশকাল অতিক্রম করতে হয় আইনজীবীদের। সিনিয়রের মামলার নথিসংক্রান্ত চাক্ষুষ কার্যক্রম দেখা, পরিচালনা ও সহায়তা ছাড়াও বিভিন্নভাবে চলে শিক্ষানবিশকাল। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের বিধিমালা অনুযায়ী পাঁচটি সিভিল ও পাঁচটি ক্রিমিনাল মামলা সিনিয়রের সঙ্গে পরিচালনার বিবরণ দিতে হয় বার কাউন্সিল তালিকাভুক্তির দরখাস্তে।
একজন আইনের ছাত্রকে ডিগ্রি অর্জনের পরও আইনজীবীর তালিকাভুক্তির জন্য শিক্ষানবিশ থাকাকালীন বর্তমানে তিন ধাপের কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পূর্ণাঙ্গ একজন তালিকাভুক্ত আইনজীবী হতে হয়। প্রথমে এমসিকিউ (প্রিলি), লিখিত ও সর্বশেষ ভাইভায় উত্তীর্ণ হতে হয়। ১০০ মার্কের প্রিলিতে উত্তীর্ণ হলেও লিখিত ও ভাইভায় উপযোগী হতে না পারলে আবার অপেক্ষা করতে হয়। প্রতি বছর হাজার হাজার আইনের ছাত্র তাদের পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে বসে থাকলেও সময়মতো তালিকাভুক্তির পরীক্ষা না নেওয়ায় ক্যারিয়ার শুরু করতে পারেন না তারা। দিনে দিনে যেন পরীক্ষাজট বেড়ে যাচ্ছে। প্রতি বছর দুটি করে পরীক্ষা নেওয়ার বিধান থাকলেও দেখা যায়, বার কাউন্সিল কর্তৃক এক বছর পর পর পরীক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়, যা গড়িমসিতে মূলত দুই বছরই পার হয়। কঠিন পদ্ধতি আর তিন ধাপের পরীক্ষা পদ্ধতির কারণে প্রতি পরীক্ষায় সারা দেশে স্বল্প শতাংশও পাশ করতে পারে না। প্রতি বছর পাশ করা নতুন ছাত্র তো আছেই। এতে করে নতুন-পুরোনো মিলে বেড়েই চলেছে শিক্ষানবিশ আইনজীবীর সংখ্যা। তালিকাভুক্ত না হওয়ায় শিক্ষানবিশ একজন আইনজীবীকে পারিবারিকভাবেও বেশ পিছিয়েই থাকতে হচ্ছে।
কর্মজীবনের শুরুটা দেরি হওয়ায় সাংসারিক জীবনেও পদার্পণে বাধাপ্রাপ্ত হতে হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন আদালতে শিক্ষানবিশ এমন আইনজীবীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এক বার, দুই বার, এমনকি পাঁচ, সাত বার এই জটিল তিন ধাপের পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে আজ আদালতের বারান্দায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন এমন অসংখ্য ভুক্তভোগী। কেউ প্রিলিতে কৃতকার্য হলেও লিখিততে আটকে যাচ্ছেন। আবার কেউ দুটিতে ভালো করেও আটকে যাচ্ছেন ভাইভাতে। এলএলবি ছাড়াও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে মাস্টার্স পাশ করা মেধাবী ছাত্ররাও প্রিলি পরীক্ষায় শুধু কৌশলের কাছে হেরে গিয়ে আইনজীবীর তালিকায় নাম লেখাতে সক্ষম হচ্ছেন না। আইনের সব খুঁটিনাটি জেনেও তাদের পড়ে থাকতে হচ্ছে তালিকাভুক্তির গ্যাঁড়াকলে। এতসবের মাঝে আবার পরীক্ষা সময়মতো না নিয়ে দুই বছর অন্তরও খোঁজ-খবর না থাকাটা বেশ বেদনাদায়ক তাদের কাছে। এসবের মাঝে অনেকেই যারা শিক্ষানবিশ সময়েই সংসারজীবন শুরু করছেন, তারা আছেন অনেকটা অথৈ সাগরের অজানা গন্তব্যে। দ্রব্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতির দোলাচালের সময়ে অনেক যন্ত্রণা নিয়ে এমনইভাবে চলছে তাদের সংসার। খেয়ে না খেয়ে সময় পার করছেন তারা। দির্ঘদিনেও তালিকাভুক্তি নামক সোনার হরিণ হাতে না পেয়ে উচ্চশিক্ষিত হয়েও অনেক শিক্ষানবিশ বিভিন্ন বেসরকারি চাকরি জুটিয়ে কোনোমতে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তাদের একটিমাত্র বক্তব্য, তা হলো—পাশ-ফেল পরের কথা, সময়মতো পরীক্ষার সুযোগটা অন্তত হোক। বিধিমালা মোতাবেক প্রতি বছর দুই বার পরীক্ষা নিলে তালিকাভুক্তির এই অনাকাঙ্ক্ষিত জট কিছুটা হলেও কমে যেত বলে তাদের দাবি।
বাংলাদেশ বার কাউন্সিল নিয়ন্ত্রিত আইনজীবী তালিকাভুক্তি পরীক্ষাব্যবস্থার কারণে হাজার হাজার আইনের গ্র্যাজুয়েটের আইনজীবী হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্নটা এই তালিকাভুক্তির গ্যাঁড়াকলে পড়ে শেষ হচ্ছে। আইন পেশা ছাড়া আর কোনো বিশেষায়িত পেশায় এই ‘তালিকাভুক্তি পরিক্ষা’ নামক পদ্ধতির কোনো অস্তিত্ব নেই। আইন সাবজেক্টটাও কিন্তু এমবিবিএস, বিডিএস, ইঞ্জিনিয়ারিং, ফার্মাসি ইত্যাদি বিষয়ের মতো একটি হাইলি স্পেশালাইজড ও প্রফেশনাল সাবজেক্ট। একাডেমিক ডিগ্রি অর্জন শেষে বাংলাদেশে এমবিবিএস বা বিডিএস গ্র্যাজুয়েটরা কোনো ‘তালিকাভুক্তি পরিক্ষা’ ছাড়াই বিএমডিসির অধীনে রেজিস্ট্রেশন ফরম পূরণ করে নিবন্ধিত হয়ে রেজিস্টার্ড ডাক্তার বা ডেন্টিস্ট হিসেবে পেশাজীবন শুরু করেন। একইভাবে যারা ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সায়েন্সের ওপর ডিগ্রি অর্জন করেন, তাদের কোনো ‘তালিকাভুক্তি পরীক্ষা’র সম্মুখীন হতে হয় না। বাংলাদেশ ভেটেরিনারি কাউন্সিলে আবেদন করে ভেটেরিনারি প্র্যাকটিশনার হিসেবে নিবন্ধিত হয়ে পেশাজীবন শুরু করে। ফার্মাসি বিষয়ে ডিগ্রিধারীরা একাডেমিক ডিগ্রি নিয়ে ফার্মাসিস্ট হিসেবে পেশা শুরু করেন। তাদেরও কোনো ‘তালিকাভুক্তি পরীক্ষা’ দিতে হয় না। অথচ এলএলবিসহ আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জনের পর আইনজীবী তালিকাভুক্তির পরীক্ষা পদ্ধতি রয়ে গেছে। পূর্বোক্ত সমস্ত পদ্ধতি বা নিয়মে ইন্টার্নশিপ তাদের একাডেমিক ডিগ্রির শর্ত। পেশায় তালিকাভুক্তি পরীক্ষার শর্ত নয়।
লেখক : শিক্ষানবিশ আইনজীবী
