পবিত্র কোরআন শরিফের সুরা বাকারার ১৮ নম্বর আয়াতটির তাত্পর্য অপরিসীম। সেখানে বলা হইয়াছে, ‘সুম্মুম বুকমুন উময়ুন ফাহুম লা ইয়ারজিউন।’ অর্থাৎ তাহারা বধির, অন্ধ ও বোবা। অতএব তাহারা সঠিক পথে ফিরিয়া আসিবে না। আমরা ভাবিয়া দেখিলাম, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির ক্ষেত্রে এই কথার আলাদা একটি দ্যোতনা রহিয়াছে। সেই দেশগুলির সরকারপ্রধান অনেক সময় আক্ষেপ করিয়া বলেন যে, এত কাজ করিবার পরও কিছু লোকের মন ভরে না। তাহারা চক্ষু থাকিতেও অন্ধ। তাহারা সরকারের উন্নয়ন দেখিতে পায় না। তাহাদের মাথার ভিতরে কেবলই ‘নাই’ শব্দ। তাহাদের অন্তরে যেন মোহর মারা হইয়াছে।
এই সকল উন্নয়নশীল দেশের সরকারপ্রধানের হতাশাটা আমরা বুঝিতে পারি। তাহাদের এই আক্ষেপের পিছনে যুক্তিসংগত কারণ রহিয়াছে। তবে বিষয়টির গভীরে যাওয়া প্রয়োজন। সরকারপ্রধান দিবারাত্রি জনগণের জন্য কাজ করিয়া গেলেও কেন তিনি তাহাদের অ্যাপ্রিসিয়েশন বা প্রশংসা পাইবেন না? সমস্যাটা কোথায়? এই সকল দেশে যতটুকু সম্পদ রহিয়াছে, তাহা একশ্রেণির দলীয় লোক হরিলুট করিয়া খাইতেছে। তবে ইহার সহিত দলীয় লোক যতটা জড়িত, তাহার চাইতে অধিক জড়িত যাহারা দলে অনুপ্রবেশকারী ও ‘সুসময়ের মাছি’। দল বিপদে পড়িলে যাহারা তৎক্ষণাৎ কাটিয়া পড়ে। তাহারা সরকারি কাজ লইয়া ফেলিয়া রাখে। কাজ না করিয়াই বিল উঠাইয়া নেয়। এই জন্য রাজধানীতে গিয়া তদবিরে ব্যস্ত থাকে। তাহারা ক্যাপিটালিস্ট নহে। রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাটের মাধ্যমে ক্যাপিটাল বা মূলধন গড়িয়া তুলিতে চেষ্টা করে। তাহারা হইল লুম্পেন অর্থনীতির সহায়ক শক্তি; কিন্তু এই লুণ্ঠনের দায় শেষ পর্যন্ত সেই দল ও সরকারের ঘাড়ে চাপিয়া বসে। আশ্চর্যের বিষয় হইল, যাহারা এই সকল অপকর্ম করে তাহারা আসলে দলের লোক কি না, তাহা অনেক সময় তলাইয়া দেখিবার প্রয়োজন বোধটুকুও আমলে নেওয়া হয় না। তাহারা আসলে ভিন্ন মতাবলম্বী, ভিন্ন আদর্শধারী। এইভাবে সেই দলটাকেই একসময় তাহারা গ্রাস করিয়া ফেলে। এই জন্য দেখা যায়, ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য হইলেও অনেক সরকারপ্রধান শেষ পর্যন্ত ধন্যবাদ ও প্রশংসা পান না।
পত্রপত্রিকায় দেখা যায়, সরকার হাসপাতাল নির্মাণে প্রকল্প গ্রহণ করিয়াছেন; কিন্তু তাহার কাজ শুরু হয় নাই, শুরু হইলেও শেষ হয় নাই। আবার শেষ হইলেও লোকবলের অভাবে চালু হয় নাই। অন্যান্য জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনার ক্ষেত্রেও এই কথা প্রযোজ্য। কাজের মান খারাপ বা প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয়বৃদ্ধি এবং তাহাতে দুর্নীতি লইয়া মানুষের মধ্যে চলে কানাঘুষা। ফলে ভালো কাজের প্রশংসা পাইবার কথা থাকিলেও উলটা বদনাম শুনিতে হয়। এই জন্য কোনো তর্কবিতর্কে না গিয়াও আমরা বলিতে চাই, পূর্বে নিজের দলটাকে ঠিক করা প্রয়োজন। অন্যদিকে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে আইন ও নিয়মকানুন কি তাহার নিজস্ব গতিতে চলিতেছে? তাহা হইলে ঠিকাদার ও ঐ শ্রেণির দলীয় লোকদের সহিত তাহারা যোগসাজশ রক্ষা বা আপস করিয়া চলিতেছে কীভাবে? আবার তৃণমূল পর্যায়ে ঠিকমতো অর্থবরাদ্দ না দেওয়া হইলে সরকারি কাজটি কীভাবে যথাসময়ে সম্পন্ন হইবে? ছোটখাটো বরাদ্দের ক্ষেত্রেও কেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন লইতে হইবে?
সুরা আল ইমরানের ১৩৯ নম্বর আয়াতে বলা হইয়াছে, ‘তোমরা হতাশ হইও না ও দুঃখ কোরিও না, যদি তোমরা মুমিন হও, তবে বিজয়ী হইবেই।’ আমরা হতাশ হইতে চাহি না। তবে নিয়মকানুন তো মানিয়া চলিতে হইবে। প্রশাসনে যাহারা আছেন, তাহারা নির্বাচনি এলাকায় গিয়া নানা আদেশ-নির্দেশ দিতেছেন। অনেক সময় কোনো একটি বিষয় সম্পর্কে জ্ঞাত না হইয়াও। তাহা হইলে একজন সংসদ সদস্যের কাজটা কী? ইহা কতটা আইনসম্মত? তৃণমূল পর্যায়ে সরকারিভাবে ঘরবাড়ি দেওয়া হইতেছে; কিন্তু ইহার দায়িত্ব দেওয়া হইতেছে আমলাদের উপর। ইহাতে সংঘাত তো হইবেই। উন্নয়নশীল বিশ্বে এই পরিস্থিতি দেখিয়া আমাদের দুঃখ লাগে। ইহার কারণে কাজ করিলেও তাহার ফল পাওয়া যায় না। মানুষের জন্য কাজ করিয়াও মানুষের মন জয় করা যায় না।
