প্রবীণদের শুধু শরীর নয়, খোঁজ নিন মনেরও 

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০২৩, ২১:৩২

বার্ধক্য, বৃদ্ধাবস্থা, বৃদ্ধ বয়স বা জরা মানব জীবনের শেষ ধাপ। বার্ধক্যে পৌঁছোবার বয়স জনে জনে ভিন্ন হতে পারে। মানুষের জীবনের শৈশব, কৈশোর ও যৌবনকাল পার করে বার্ধক্য আসে। এ বয়সে বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা দেখা যায়, যা সাধারণ দৃষ্টিতে বাইরে থেকে দেখলেই বোঝা যায়।  তাই প্রবীণদের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেয়ার হিড়িক পরে যায়। তবে এ বয়সের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পরে তাদের মানসিকতার ওপর। শারীরিক বিভিন্ন জটিলতার পাশাপাশি বিভিন্ন মানসিক জটিলতায়ও ভোগেন তারা। 

আজম খান বয়স ৭০ এর কেটা পেরোলো গেলো বছর। একসময়ের নাম করা ব্যবসায়ী ছিলেন তিনি।  বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ঘুরে বেরিয়েছেন এক সময়ে। এখানে ঘুরে বেড়াতে হয় বিভিন্ন দেশে, তবে তা চিকিৎসার জন্য। আজকাল তার জীবন যেন আটকে আছে বিশাল আকৃতির ঔষধের বাক্স আর খবরের কাগজের মধ্যে।  ছেলেমেয়ে নাতি নাতনি সবাই দেশের বাইরে মাঝেমধ্যে দেশে আসেন আবার বাবাকেও নিয়ে যান দেশের বাইরে। অসুস্থ হলে ছেলেমেয়েরা হুমড়ি খেয়ে শরীরের খোঁজ নেন।  কিন্তু বছর জুরে মনের খোঁজ নেন না কেউ। দিনের পর দিন যেন বিষণ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে আজম খানের। 

আজম খানের মতো এমন অনেকেই আছেন যারা অনেক ধনসম্পদের মালিক হয়েও বৃদ্ধ বয়সে একাকীত্বে ভুগছেন।  আবার অনেকেই আছেন যাদের আর্থিক অবস্থার পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক অবস্থাও নড়বড়ে। বৃদ্ধাশ্রমের চিত্র কেমন তা তো সবার জানাই আছে। 

৬০ বৎসর বয়সের ঊর্ধ্বে ১৫% মানুষ কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। বার্ধক্যজনিত অক্ষমতার কারণগুলোর মাঝে ৬.৬% মানসিক এবং স্নায়ুবিক কারণে হয়ে থাকে।

২০১৫-৫০ সালের মধ্যে ৬০ বৎসর এর বেশি বয়সের মানুষের সংখ্যা হবে দ্বিগুণ (অর্থাৎ, বর্তমানে আছে ১২%, তা বেড়ে হবে ২২%)।

৬০ বৎসর বয়সের ঊর্ধ্বে ১৫% মানুষ কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। বার্ধক্যজনিত অক্ষমতার কারণগুলোর মাঝে ৬.৬% মানসিক এবং স্নায়ুবিক কারণে হয়ে থাকে।

বার্ধক্যে মানসিক রোগের কারণ

  • বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সার্বিক কর্মক্ষমতা লোপ পেতে থাকে; চুলে পাক ধরে, দাঁত পড়ে, ত্বকে ভাঁজ পড়ে, হাড় ক্ষয় হতে থাকে, প্রজনন ক্ষমতা থাকে না বা কমতে থাকে।
  • কর্মজীবন থেকে অবসরে যায়। সন্তানরা বড় হয়, তাদের নিজস্ব জগৎ তৈরি হয়, অনেক সময় জীবিকা অর্জনের জন্য দূরে চলে যায় বা কর্মব্যস্ত হয়ে পড়ে ইত্যাদি নানাবিধ কারণে বৃদ্ধ হলে আত্মবিশ্বাস কমে যায়, একাকীত্বের অনুভূতি শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা তৈরি করে।
  • মধ্যবয়স থেকেই মানুষ জীবনের হিসাব নিকাশের খাতা খুলে বসে; কি পেলাম, কি পেলাম না এসব ভেবে ভেবে অস্থির থাকে, মানসিক চাপ তৈরি হয়।

  • বয়স হলে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, বিভিন্ন প্রকার দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক রোগ যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, হৃদরোগ ও হাড়ক্ষয়রোগ ইত্যাদি দেখা দেয়। যেহেতু, মন আর শরীর অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত, তাই একটি খারাপ থাকলে অন্যটিও খারাপ থাকে। যেমন হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মাঝে বিষণ্ণতার হার শারীরিকভাবে সুস্থ ব্যক্তিদের চেয়ে বেশি। আবার যাদের হৃদরোগ ও বিষণ্ণতা রোগ আছে তারা যদি বিষণ্ণতা রোগ এর চিকিৎসা না নেন, তাহলে তা হৃদরোগের পরিণতিকে খারাপের দিকে নিয়ে যাবে।
  • দ্রুত নগরায়ন, ভৌগোলিক পরিবর্তন, শিল্পায়ন, সংস্কৃতিতে পাশ্চাত্যের প্রভাব, যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার গঠন ইত্যাদি বৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ।
  • বার্ধক্যজনিত মানসিক রোগের মাঝে বিষণ্ণতা রোগ, উদ্বেগজনিত রোগ, ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশ রোগ, দেরিতে শুরু হওয়া সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার মুড ডিসঅর্ডার বা দ্বি-প্রান্তিক আবেগীয় রোগ, ঘুমের সমস্যা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

বার্ধক্যে মানসিক রোগের কিছু লক্ষণও দেখা যায়।  যেমন: 

  • এক টানা হতাশা, বিষণ্ণতায় ভোগা।
  • ইতিবাচক আবেগ অনুভব না করা। 
  • অতিরিক্ত ঘুমানোর অথবা ঘুম না হওয়ার সমস্যা থাকা।
  • আত্মঘাতী চিন্তা করা।
  • ক্ষুধা, শক্তি স্তর এবং মেজাজে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।
  • মনোযোগে সমস্যা হওয়া, অস্থির থাকা
  • অতিরিক্ত চাপ বা উদ্বেগ অনুভূতি তৈরি হওয়া।
  • স্বল্পমেয়াদি-সাম্প্রতিক স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া বা লোপ পাওয়া।
  • রাগ, আন্দোলন বা আগ্রাসন বৃদ্ধি পাওয়া।
  • অবাধ্যতামূলক আচরণ প্রবণতা বা করা। 
  • অস্বাভাবিক আচরণ বা চিন্তা করা।

প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে কিছু জিনিস মাথায় রাখা যেতে পারে- 

  • বৃদ্ধদের সেবা-শুশ্রূষার জন্য স্বাস্থ্যকর্মী, চিকিৎসকদের মানসম্মত প্রশিক্ষণ প্রদান করা যেতে পারে। বয়সজনিত দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ও শারীরিক রোগ, মাদকাসক্তি ইত্যাদির সুব্যবস্থাপনা ও প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।
  • বয়সবান্ধব সেবা এবং সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা উচিত। বয়স্কদের স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতকরা উচিত।
  • মানসিক ও শারীরিক রোগ দ্রুত শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসা প্রদান অপরিহার্য। মনোসামাজিক সহায়তা, কাউন্সেলিং এবং ওষুধ এর সমন্বয়ে চিকিৎসা প্রদান করতে হবে। যেহেতু ডিমেনশিয়া সম্পূর্ণ ভালো করার কোনো ওষুধ আবিষ্কার হয়নি, সেহেতু ডিমেনশিয়া রোগী এবং তাদের পরিচর্যাকারীদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।
  • বৃদ্ধদের নির্যাতন বন্ধে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা। কমিউনিটিতে বিভিন্ন উন্নয়নমুখী কার্যক্রম গ্রহণ করা উচিত। বয়স্কদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ শনাক্তকরণ এবং তার ব্যবস্থাপনা করা উচিত।

প্রবীণদের শুধু শারীরিক অবস্থার খবর রেখেই সবাই দায়সারা হওয়ার চেষ্টা করি। তবে শুধু শারীরিক নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের খেয়ালও রাখা উচিত আমাদের।

ইত্তেফাক/এআই