মঙ্গলবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২৩, ১৭ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২৩, ০৪:৩০

প্রখ্যাত কবি শঙ্খ ঘোষ কয়েক যুগ পূর্বে লিখিয়াছিলেন ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’। ইহা এখন আরও প্রকটভাবে সত্য। আসলে পোস্টার-ব্যানার-ফেস্টুন ছাপানো এখন এত সস্তা ও সহজ যে, একজন নিম্নবিত্ত ব্যক্তিও চাহিলে নিজের মুখচ্ছবি দিয়া শখ করিয়া কয়েকটা পোস্টার ছাপাইয়া লইতে পারেন। সস্তা বিষয়টির ভিতরে একধরনের বাড়াবাড়ি থাকে। আর আমাদের বোধবিবেচনা ও রুচিবোধ সস্তা বলিয়া আমরা সকল কিছুতেই বাড়াবাড়ি করিতে পছন্দ করি। আমরা প্রতিযোগিতা করি, কে কাহার চাইতে অধিক তোষামোদ করিতে পারি, ভক্তি দেখাইতে পারি। এই জন্য দেশের প্রতিটি অংশে এক দৃষ্টিকটু ‘ব্যানার কালচার’ চালু হইয়াছে। কোনো একটা উৎসব বা রাজনৈতিক কর্মসূচি পাইলেই চারিদিকে ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুনে ভরিয়া যায়। ফুটপাত, আইল্যান্ডসহ, বিভিন্ন ভবনের দেওয়াল কিংবা যে কোনো সহজদৃষ্ট জায়গায়, এমনকি গাছে গাছে বড় বড় পেরেক পুঁতিয়াও সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার-ফেস্টুন লাগাইয়া দেওয়া হয়। বহু বৎসর পূর্বে গাছের প্রাণের অস্তিত্বের কথা প্রমাণ করা বাঙালি বিজ্ঞানীর কথা আমরা বাঙালিরাই পাত্তা দেই না। সুতরাং পেরেক পুঁতিয়া ব্যানার টাঙাইলে গাছেরও কষ্ট হয়, আলো-বাতাস না পাইয়া মুমূর্ষু হয়—তাহা আমরা আমলেই লই না।

সবচাইতে বড় পরিহাস হইল—যেইখানে-সেইখানে পোস্টার ব্যানার না লাগাইবার ব্যাপারে আমাদের প্রায় এক দশকের পুরাতন একটি আইন রহিয়াছে। ‘দেওয়াল-লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১২’-এর  ধারা ৪ অনুযায়ী নির্ধারিত স্থান ব্যতীত অন্য কোনো স্থানে দেওয়াল লিখন বা পোস্টার লাগাইলে তাহা অবৈধ হইবে। কোনো ব্যক্তি এই আইন বা বিধান লঙ্ঘন করিয়া দেওয়াল লিখন বা পোস্টার লাগাইলে উক্ত অপরাধের জন্য উক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অন্যূন ৫ হাজার টাকা এবং অনূর্ধ্ব ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড আরোপ করা যাইবে, অনাদায়ে অনধিক ১৫ দিন পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা যাইবে। বস্তুত, সারা দেশে এত বিপুলসংখ্যক অবৈধ পোস্টার-ব্যানার রহিয়াছে যে, যদি সংশ্লিষ্ট অবৈধ কর্মকাণ্ডকারীদের উপর কোনো একটি দিন একসঙ্গে এই আইনের প্রয়োগ করা হয়, দেখা যাইবে সারা দেশে ১৫ দিনের জন্য কোনো হাজতখানায় তিল ধারণের জায়গা নাই। স্পষ্টতই আইন থাকিলেও তাহার প্রয়োগ দশমিক ১ শতাংশ ক্ষেত্রেও হয় কি না সন্দেহ। ইহাই বাস্তবতা। এই বাস্তবতার মূলে রহিয়াছে আমাদের হিপোক্রেট মনোভাব। প্রবাদের ভাষায় ইহাকে বলা হয়—‘নিজের বেলায় আঁটিআঁটি, পরের বেলায় চিমটি কাটি।’ আরেকটি বিষয় মনে রাখিতে হইবে, কোনো কোনো ব্যানার-ফেস্টুনে এমন কিছু দেশবরেণ্য ও অত্যন্ত সম্মানীয় ব্যক্তি-মহোদয়ের ছবি থাকে, যাহাদের ছবি অত্যন্ত সম্মানের সহিত টানানোর পর অনুষ্ঠান শেষে সম্মানের সহিত নামাইতে হয়। কিন্তু আমরা তাহা না করিয়া এই সকল অত্যন্ত সম্মানী ব্যক্তির ছবি-সংবলিত ব্যানার-ফেস্টুন দিনের পর দিন অযত্নে অবহেলায় রোদ-বৃষ্টিতে বিবর্ণ, ম্রিয়মাণ ও নষ্ট হইবার জন্য ফেলিয়া রাখি। ইহাও অত্যন্ত গর্হিত কাজ। সুতরাং কর্তৃপক্ষের একটি সিদ্ধান্ত থাকা উচিত, যাহারা নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানের জন্য ব্যানার-ফেস্টুন-পোস্টার টানাইবেন, তাহারা অবশ্যই অনুষ্ঠান শেষে সম্মানী ব্যক্তির ছবি-সংবলিত ব্যানার-ফেস্টুন পুনরায় সম্মানের সহিত সরাইয়া ফেলিবেন। নচেৎ সম্মানীদের উলটো অসম্মান ও অশ্রদ্ধা করিবার ঘটনা ঘটিতে থাকিবে। দিনের পর দিন এইভাবে চালিতে পারে না।

সম্প্রতি দেওয়াল-লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১২ বাস্তবায়নে গণবিজ্ঞপ্তি দিয়াছে সংশ্লিষ্ট একটি সিটি করপোরেশন। গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হইয়াছে, সকলে মিলিয়া সকলের ঢাকা, সুস্থ, সচল ও আধুনিক ঢাকা গড়িয়া তুলিবার প্রত্যয়ে জনস্বার্থে তাহারা বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করিয়াছে। উত্তম কথা। দীর্ঘ সময় পর কুম্ভকর্ণের নিদ্রাভঙ্গ হইলেও তাহা গুরুত্বপূর্ণ। বেটার লেট দেন নেভার। কিন্তু এই ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করিয়া পুনরায় কুম্ভকর্ণের ন্যায় ঘুমাইয়া পড়িলে উহা যেই লাউ সেই কদুই হইয়া থাকিবে।

 

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন