মঙ্গলবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২৩, ১৭ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কালিমা লেপন

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২৩, ০০:২৯

উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলিতে রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নূতন নহে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ পাকিস্তানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে ২৮টি মামলা চলমান বলিয়া জানা যায়। এমনকি তাহার বিরুদ্ধে দুর্নীতির দায়ে তাহাকে পাঁচ বৎসরের জন্য নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয় পাকিস্তান নির্বাচন কমিশনের এক আদেশে। ইহার বিরুদ্ধে পরে তিনি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। তাহার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালনকালে বিদেশ হইতে পাওয়া রাষ্ট্রীয় উপহারের তথ্য গোপন করিয়াছেন এবং কিছু উপহার বিক্রয়ও করিয়া দিয়াছেন। তবে ইমরান খানের অভিযোগ হইল, পাকিস্তানের দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিবিলিটি ব্যুরোর (এনএবি) ওপর প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করিয়াছেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল বাজওয়া। তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া সত্ত্বেও বাজওয়া দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্তদের রেহাই দিতে চাহিয়াছিলেন। আবার ইমরান খান ক্ষমতাচ্যুত হইবার আগে ও পরে তাহার প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান মুসলিম লীগ ও পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা যেমন—নওয়াজ শরিফ ও আসিফ আলি জারদারিসহ অনেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনিতে থাকেন। সেই অভিযোগের তিরে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফও বিদ্ধ। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনকে পিটিআই চেয়ারম্যান ইমরান খান ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখিবার অনুমতি প্রদান করিয়াছে। আগামী ১৭ জানুয়ারি এই ব্যাপারে শুনানি রহিয়াছে। 

তৃতীয় বিশ্বে ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতার সুযোগে এইভাবে রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে মামলা-হামলা ইত্যাদি অস্ত্রের প্রয়োগ চলিতেই থাকে। যাহারা সামরিক শাসন বা বিরাজনীতিকরণে বিশ্বাসী, তাহারা সুযোগ পাইলেই রাজনীতিবিদদের ঘাড় মটকাইতে কসুর করেন না। তাহাদের ঘায়েল করিতে তাহারা তাহাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগকে ব্যবহার করেন প্রধান অস্ত্র হিসাবে। কিন্তু তাহারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করিয়া ক্ষমতায় আসিলেও একসময় নিজেরাই দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হইয়া পড়েন। দেশ শাসনের জন্য তখন আবার রাজনীতিবিদদেরই ডাক পড়ে। তবে শুধু রাজনীতিবিদদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ মহলই নহে, এমনকি রাজনীতিবিদরাও প্রতিপক্ষ রাজনীতিবিদদের দমাইয়া রাখিতে একই অস্ত্রে শান দেন। ইহা অতীতকাল হইতেই চলিয়া আসিতেছে। মামলার কারণে প্রতিপক্ষ পলায়ন অবস্থায় বা জেলে থাকিলে একপ্রকার রাজনৈতিক সুবিধা হাসিল করা যায় বটে, তবে এই অপসংস্কৃতি রাজনৈতিক পরিবেশকে বিষাইয়া তোলে। বিরাজনীতিতে বিশ্বাসীরা যখন রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে অসৎ উদ্দেশ্যে মামলা দায়ের করেন, তখন আমরা তাহার মর্ম উপলব্ধি করিতে পারি। কিন্তু রাজনীতিবিদরা যখন ক্ষমতার জোরে প্রতিপক্ষ দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অযৌক্তিক মামলা দিতেই থাকেন, তখন বিষয়টি লইয়া প্রশ্ন না উঠিয়া পারে না। রাজনীতিবিদরা অনেক সময় একে অপরকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে চোর বলিতেছেন, চোর বানাইতেছেন। ইহাতে কি কোর্টের সময় নষ্ট এবং গণতান্ত্রিক ও মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হয় না? আজিকার দিনে উন্নয়নশীল দেশে রাজনীতিবিদদের ভাবমূর্তি এই দাঁড়াইয়া গিয়াছে যে, তাহারা যেন চোর, ডাকাত, খুনি, মদ্যপ ইত্যাদি। কেননা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাহাদের চরিত্র হননের জন্যই এমন সব অভিযোগ দায়ের করা হয়। সেই সকল রাজনীতিবিদ যখন আবার জনসমর্থন লইয়া দেশ পরিচালনায় আসেন, তখন জনমনে কী প্রশ্ন দেখা দিতে পারে তাহা সহজেই অনুমেয়। রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে অনেক সময় অর্থ চুরি বা আয়ব্যয়ের সঙ্গে হিসাবের সামঞ্জস্য না থাকাসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা দেওয়া হয়। বাসার পেইন্টিং, ময়না পাখি, পোষা কুকুর ইত্যাদির দাম ধরিয়াও এই আয়ব্যয় হিসাব করা হয়। 

মোদ্দা কথা, রাজনীতিবিদরাই যখন দেশ পরিচালনা করিবেন, তাহা হইলে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে কেন এত সাজাইয়া-গুছাইয়া তাহাদের দুর্নীতিবাজ বানানো হয়? ইহাতে শেষ পর্যন্ত কাহারা উপকৃত হন, তাহা কি আমরা একবারও গভীরভাবে ভাবিয়া দেখিব না?

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন