বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন

আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০২৩, ০৪:০২

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের মৃত্যু গহ্বর থেকে রক্তস্নাত স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামক স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র পূর্ণতা লাভ করে। বাঙালি জাতিরাষ্ট্রের ভিত্তি হচ্ছে বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে ধর্মীয় ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র পাকিস্তানের বৈষম্য, শোষণ, বঞ্চনা, নিপীড়ন এবং নির্যাতনের বিরুদ্ধে বাঙালিদের মধ্যে ঐক্য চেতনা জাগ্রত করা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই চেতনায় বাঙালিদের সংগঠিত করেন। বাংলার হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান প্রভৃতি ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সমগ্র বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে তার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হন। ফলে চূড়ান্ত পর্যায়ে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে (পূর্ব) বাঙালি বঙ্গবন্ধুর প্রতি নিরঙ্কুশ (প্রায় ৭৪ শতাংশের বেশি) সমর্থন ব্যক্ত করেন। কিন্তু নির্বাচিত বৈধ বাঙালি প্রতিনিধিদের কাছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্তান্তর না করে পাকিস্তানি সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান এবং পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো বাঙালিদের দমন ও নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্র করতে থাকেন।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু প্রথমে ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে ‘অসহযোগ আন্দোলনের’ ডাক দেন, তারপরে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিশাল জনসমুদ্রে তার ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে অত্যন্ত সংক্ষেপে বাঙালি জাতির বিরুদ্ধে শোষণ-বঞ্চনা ও অত্যাচার-নিপীড়নের ইতিহাস তুলে ধরে সংগ্রামের আহ্বান জানান। এজন্য তিনি ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলা এবং যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম...।’ এরপর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ শেষ রাতে ২৬ মার্চের শুরুতে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, ‘আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন’। এর পরই পাকিস্তানি সেনারা তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। এভাবে গ্রেফতার হয়ে পাকিস্তানের বন্দিশিবিরে মৃত্যুর মুখোমুখি অবস্থা অতিবাহিত করতে থাকেন। তাকে যেখানে রাখা হয়েছিল, সেই কারাকক্ষের পেছনে ‘কবর খনন’ করে রাখা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পরে কবরস্থ করার জন্য। বঙ্গবন্ধু এ সময় তার মরদেহ বাংলার মাটিতে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য বলেছিলেন।

এদিকে গণহত্যা শুরু হলে পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ থেকে প্রাণ রক্ষার জন্য এ সময় ১ কোটি বাঙালি প্রতিবেশী গণতান্ত্রিক ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। অবশেষে ৩০ লাখেরও বেশি বাঙালির প্রাণ, প্রায় ৪ লাখেরও বেশি বাঙালি মা-বোনের সম্ভ্রম, কয়েক হাজার ভারতীয় সেনার প্রাণের বিনিময়ে চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রায় ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সেনা ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (বর্তমানে যেখানে শিখা চিরন্তন সর্বদা প্রজ্বালিত) আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। বিজয়ের আনন্দে উদ্বেলিত বাঙালি জাতি তখন প্রিয় নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাদের মাঝে ফিরে পেতে অধীর অপেক্ষায় ছিল। অতঃপর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের মৃত্যুগহ্বর থেকে তার প্রিয় মাতৃভূমি স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। পাকিস্তানের কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুকে প্রথমে লন্ডনে নেওয়া হয়। সেখান থেকে দিল্লি হয়ে তিনি স্বাধীন স্বদেশে ফিরে আসেন। তিনি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। যেসব কাজ বঙ্গবন্ধুর স্বল্পতম মাত্র সাড়ে তিন বছরের সরকারের সময় সাধিত হয়েছে, সেগুলো হচ্ছে—মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রতিবেশী ভারতে আশ্রয় গ্রহণকারী ১ কোটি বাঙালি শরণার্থীকে দেশে নিয়ে আসা; ভারতীয় সৈন্য ফিরে যাওয়া; ধ্বংসপ্রাপ্ত সড়ক, রেল, নৌযোগাযোগ পুনঃস্থাপন করা; উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিদেশি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি আদায়; জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ প্রভৃতি। এছাড়া মানুষের জন্য অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা প্রভৃতি নিশ্চিতের কাজেও বঙ্গবন্ধুর সরকার সফল হয়। এই সবকিছুর পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর সরকার স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য একটি সংবিধান প্রণয়ন করতে সক্ষম হয়। পাকিস্তানের বেসামরিক-সামরিক সরকার যা দীর্ঘ ২৩ বছরেও করতে পারেনি, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি তা এক বছরের মধ্যেই সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়। এই সংবিধানের অধীনেই ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ ষংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। এভাবে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পরই কেবল বাঙালির জাতিরাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়া পূর্ণতা লাভ করে, যা সেই সময়ের অন্য কোন নেতার পক্ষে সম্ভব ছিল না। এভাবে জাতিরাষ্ট্রের কাঠামো সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খল ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর পর দেশ যখন ভালোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে ঘাতকেরা হত্যা করে বাঙালি জাতিরাষ্ট্রের ভিত্তির ওপর চরম আঘাত হানে।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের ওপর যে চরম আঘাত হানা হয়েছে, বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তা কাটিয়ে উঠে দেশকে আবার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অনুসারে পরিচালিত করছেন। বাংলাদেশ এখন সমগ্র বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে গণ্য হচ্ছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রভৃতি বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প এখন বাস্তায়িত হয়েছে। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এখন প্রায় ২ হাজার ৮২৪ মার্কিন ডলার; মানুষের গড় আয়ু ৭২ বছর; বাংলাদেশের সাক্ষরতার হার ৭৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ। এভাবে ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বে এই অগ্রযাত্রা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে আশা করি।

লেখক : সেন্টার ফর সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের পরিচালক, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান

 

ইত্তেফাক/ইআ