মঙ্গলবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২৩, ১৭ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

‘সময় গেলে সাধন হবে না’ 

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২৩, ০০:৩২

জগতে চিরকালই সমস্যা ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও নূতন নূতন সমস্যা আসিবে; কিন্তু সেই সমস্যাগুলিকে সঠিক ও সর্বোচ্চ সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় সমাধান না করিয়া অনেক ক্ষেত্রেই তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে অকারণ আত্মতৃপ্তির ফানুস উড়ানো হয়। ফানুস তো ফানুসই। উহা ফাটিয়া যাইতে সময় লাগে না। অকারণ আত্মতৃপ্তি আমাদের বাচাল করিয়া তোলে; কিন্তু বেশি কথা বলিবার যে বিপদও অনেক, তাহা দায়িত্বশীল পদের ব্যক্তিরা অনেক ক্ষেত্রে ভুলিয়া যান। 

পুলিত্জার জয়ী আমেরিকান সাংবাদিক মেগ গ্রিনফিল্ড বলিয়াছিলেন যে, খুব বেশি কথা বলা, খুব তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা এবং খুব বেশি আত্মসন্তুষ্টি লইয়া চলিলে উহা দুর্যোগ ডাকিয়া আনে; কিন্তু বিপদ আসিলেও বাঙালি জাতির মজ্জায় রহিয়াছে বেশি কথা বলা। ইহার সহিত অতি দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং অল্পতেই আত্মতৃপ্তি লাভ করিবার বিশেষ বৈশিষ্ট্য রহিয়াছে। যদিও আত্মতৃপ্তির প্রয়োজন রহিয়াছে বটে। কারণ, আত্মতৃপ্তির মাধ্যমে আমাদের শরীরে অক্সিটোসিন হরমোনের নিঃসারণ ঘটে। ফলে আমরা সুখানুভূতি লাভ করি; কিন্তু আমরা যাহা লইয়া আত্মসুখ অনুভব করি, তাহার নেপথ্যে শক্ত ভিত্তি রহিয়াছে কি না—তাহা তো তলাইয়া দেখিতে হইবে। 

মনে রাখিতে হইবে, গর্ব-অহংকার ও আত্মসন্তুষ্টির রহিয়াছে তাৎপর্যপূর্ণ কিছু নেতিবাচক দিক। যাহার লক্ষ যত ছোট, তাহারই সন্তুষ্টি অধিক। এই জন্য মনোবিশ্লেষকরা বলিয়া থাকেন—অসন্তুষ্টির মধ্যেই রহিয়াছে উত্তুঙ্গ সাফল্যের বীজ। তৃপ্তিলাভ মানে যবনিকা পতন। দ্য এন্ড। বিখ্যাত অণুজীববিজ্ঞানী জ্যাক মনোডও বলিয়াছেন, বিজ্ঞানে আত্মতৃপ্তি হইল মৃত্যু। ব্যক্তিগত আত্মতৃপ্তি হইল বিজ্ঞানীর মৃত্যু। যৌথ আত্মতৃপ্তি হইতেছে গবেষণার মৃত্যু। বলা যায়, অস্থিরতা, উদ্বেগ, অসন্তুষ্টি, মনের যন্ত্রণা বিজ্ঞানকে নূতন পথ দেখায়। যত নূতন সমস্যা ততই নূতন নূতন সমাধান। সুতরাং ‘সমস্যা’ লইয়া ভয় পাইবার কিছু নাই। বরং ভয় হইল ‘আত্মতৃপ্তি’ লইয়া। আত্মতৃপ্তি আমাদের দুর্বল করে, ক্ষীণ ও ক্ষুদ্র করে। তৃতীয় বিশ্বের যেই সকল দেশ আত্মতৃপ্তির আনন্দে আতশবাজি ফোটায়, তাহারা নিশ্চয়ই জানেন, জনগণের মৌলিক জিনিস সকলের পূর্বে দিতে হইবে; কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশই জনগণের ন্যূনতম মৌলিক অধিকার মোটামুটিভাবে নিশ্চিত না করিয়াই আত্মতৃপ্তির গড্ডালিকায় গা ভাসায়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, মৌলিক প্রয়োজনের জিনিস না দিয়া এমন সকল খাতে উন্নয়ন বরাদ্দ দেওয়া হয়, যাহা সাধারণ জনগণের জীবনমানের মৌলিক সমস্যা দূর করিতে সহায়তা করে না। যদি কোনো এলাকার পানির লবণাক্ততা বাড়িয়া যায় এবং নিরাপদ খাবার পানির অভাব দেখা দেয়, যেই সমস্যাটি দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ব্যাপক, সেই সকল এলাকায় উন্নয়নের প্রধান মৌলিক দিকগুলির একটি হইবে নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা। কারণ, নিরাপদ পানি ব্যতীত মানুষ সুস্থভাবে বাঁচিতে পারে না। ইহা ছোট্ট উদাহরণ মাত্র। আরো অনেক ধরনের দৃষ্টান্তই উল্লেখ করা যাইতে পারে। 

জগতে সমস্যার অন্ত নাই। এই উপমহাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষকে একত্রিত করিলে তাহারা পুরা ইউরোপের (প্রায় ৪৪ কোটি) মানুষের চাইতে অধিক হইবে। এই যখন অবস্থা, তখন গত সাত দশকে কোটি কোটি অসহায়-দরিদ্র মানুষের দুঃখ-কষ্ট মানবেতর জীবনের তাৎপর্যপূর্ণ উন্নয়ন ঘটিতে পারিত। চোখে পড়িবার মতো কিছু উন্নয়ন হইয়াছে। তাহা হইয়াছে বটে; কিন্তু ইহার সহিত তৈরি হইয়াছে তাৎপর্যপূর্ণ মাত্রায় লুটেরা ও দুর্নীতিবাজ একটি শ্রেণি। এই লুটেরাদের অর্থ-অহমিকা আর জৌলুস চমকাইয়া দেওয়ার মতো। 

এই অবস্থায় ইমান ও ধৈর্যের সহিত আমাদের প্রত্যেকের স্ব স্ব দায়িত্ব পালন করিতে হইবে। কথা বলিতে হইবে পরিমিত। ভিত্তিহীন আত্মসন্তুষ্টি আমাদের সাময়িকভাবে আনন্দ দিতে পারে; কিন্তু উহা বিদ্যমান বিপুল সমস্যার সমাধান আনিবে না কিছুতেই। অন্ধ থাকিলে তো প্রলয় বন্ধ হইবে না। সুতরাং চোখ খোলা রাখিয়াই আমাদের সকল ধরনের সমস্যাকে মোকাবিলা করিতে হইবে। এখনো সময় আছে। লালনের ভাষায় বলিতে হয়—‘সময় গেলে সাধন হবে না।’

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন