মঙ্গলবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২৩, ১৭ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

পরিবেশ রক্ষা একটি পবিত্র দায়িত্ব

আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০২৩, ০১:৩০

মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনের মধ্যে পাঁচশত বার নানাভাবে পরিবেশ সংরক্ষণ ও পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখিবার ব্যাপারে উৎসাহিত করিয়াছেন। ইহা একটি পবিত্র দায়িত্ব এবং পবিত্রতা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ব্যতীত সুন্দর পরিবেশ কখনো কল্পনাই করা যায় না। এই জন্য প্রিয় নবী (স.) বলিয়াছেন যে, পবিত্রতা ইমানের অঙ্গ। আমরা এই সকল মহান বাণীকে আপ্তবাক্য হিসাবে লইয়াছি বটে; কিন্তু বাস্তবে আমরা চলিতেছি ইহার বিপরীত স্রোতে। এই বার কাতারে বিশ্বকাপ ফুটবল চলাকালে আমরা দেখিলাম, জাপানিরা স্টেডিয়ামে খেলা শেষ হওয়ামাত্রই নিজ নিজ আসন ও ইহার চারিপাশে যত্রতত্রভাবে ফেলিয়া রাখা বিভিন্ন প্লাস্টিক ও অন্যান্য ময়লা-আবর্জনা অপসারণ করিতেছেন। তাহাদের এই দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ ও পরিবেশ সচেতনতা হইতে আমাদের সকলেরই শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত।

আমাদের দেশের সেন্টমার্টিন ও কক্সবাজারসহ বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রগুলোতেও দেখা যায়, বিদেশিরা প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট হইতে শুরু করিয়া বিভিন্ন আবর্জনা পরিষ্কার করিতেছেন নিজ হস্তে। স্বেচ্ছাশ্রমের এই মহত উদ্যোগও প্রশংসনীয়। তবে ইহা দেখিয়া লজ্জায় আমাদের মাথা নত হইয়া যায়। কেননা আমরা চেতন-অচেতনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন করিয়া তুলিতেছি। যদিও আজকাল একশ্রেণির যুব ও তরুণসমাজ পরিবেশ উন্নয়নে নানাভাবে কাজ করিয়া যাইতেছে। এমনকি নৌকায় চড়িয়া নদনদীতে ভাসমান ময়লা-আবর্জনাও তাহাদের পরিষ্কার করিতে দেখা যায়। এই সকল উদ্যোগও নিঃসন্দেহে সাধুবাদযোগ্য। উল্লেখ্য, গতকাল ইত্তেফাকে একটি ছোট্ট খবর প্রকাশিত হইয়াছে। সেখান হইতেও আমরা অনুপ্রেরণা লাভ করিতে পারি। ভারতের যুবক বিশ্ব ভ্রমণকারী রোহান আগারওয়াল। তিনি পায়ে হাঁটিয়া বিশ্বভ্রমণ করিতেছেন। এই ভ্রমণের পাশাপাশি তিনি প্রকৃতি রক্ষা ও বিশেষত প্লাস্টিকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সচেতন করিবার কাজটি করিয়া যাইতেছেন আন্তরিকতার সহিত। তিনি বাংলাদেশে আসিয়া গত মঙ্গলবার হইতে দিনাজপুরের বিভিন্ন স্থানে পথসভা ও আলোচনাসভায় অংশগ্রহণ করেন। তাহার দিনাজপুরে অবস্থানের কথা জানিতে পারিয়া হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিন ভয়েজ তাহাকে লইয়া বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণায় নামিয়া পড়ে। আসলে পরিবেশ রক্ষার ব্যাপারে আমাদের প্রত্যেককেই সজাগ ও সচেতন হইতে হইবে। প্রথমে পরিবার হইতেই এই সচেতনতা গড়িয়া তুলিতে হইবে। ইহাছাড়া আমাদের এই ধরিত্রীকে ধ্বংসের হাত হইতে রক্ষা করা যাইবে না। আর পরিবেশ ও প্রকৃতি না বাঁচিলে আমাদের অস্তিত্ব রক্ষা করাও কঠিন হইবে।

আমরা জানি, সাধারণত প্লাস্টিক বর্জ্যে প্রচুর পরিমাণে রাসায়নিক রঞ্জক মেশানো হয়। এই সকল রঞ্জক কারসিনজেন হিসাবে কাজ করে ও অ্যান্ড্রোক্রিনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। গত বছর প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রথম বারের মতো মানুষের রক্তে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ শনাক্ত হইয়াছে। মায়ের দুধ, মৎস্যসহ বিভিন্ন খাদ্যচক্রে এখন মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব পাওয়া যাইতেছে—যাহা উদ্বেগজনক। ইহা আমাদের শরীর, উদ্ভিদকুল, স্থল ও জলজপ্রাণী তথা সার্বিকভাবে পরিবেশ-প্রতিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। শুধু আমেরিকায় প্রতি বছর ৫ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহৃত হয়। ইহা মাটিতে পচিতে সময় লাগে ৪০০ বছর। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, সমুদ্রের পানিতে ৫ ট্রিলিয়নের অধিক প্লাস্টিক ভাসিয়া থাকে। অথচ সৃষ্টিকর্তা এই পৃথিবীকে মানব বসবাসের উপযোগী করিয়াই সৃষ্টি করিয়াছেন। গাছপালা, পাহাড়-পর্বত, নদনদী, ফল-ফুল, পশুপাখি, জীবজন্তু, পোকা-মাকড় প্রভৃতি দ্বারা এই বিশ্বে তিনি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন। নৈসর্গিক এই পরিবেশের ব্যত্যয় ঘটাইলেই তাহা আমাদের জন্য বিপর্যয় ডাকিয়া আনিবে, ইহাই স্বাভাবিক। এই জন্য বলা হইয়াছে যে, পৃথিবীর জলে-স্থলে যে বিপর্যয় (মহামারি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ) ঘটে তাহা মানুষের হাতের কামাই (সুরা রুম, আয়াত-৪১)। অতএব, পানি, বাতাস, মাটিসহ কোনো কিছুই যাহাতে দূষিত না হয়, সেদিকে আমাদের সতর্ক থাকিতে হইবে। যথাসম্ভব প্লাস্টিক পণ্য বর্জনে যুগোপযোগী আইন প্রণয়নসহ সামাজিক আন্দোলন গড়িয়া তুলিতে হইবে। এই ব্যাপারে সরকারকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে লইতে হইবে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ।

 

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন