দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র দলমতনির্বিশেষে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে। অসংখ্য মা-বোনের সম্ভ্রমহানি ও শহিদদের রক্তের বিনিময়ে দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধের পরে অর্জিত হয় আমাদের স্বাধীনতা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫১ বছর ইতিমধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছে। এই সময়কালে আমরা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হারিয়েছি। ’৭২-র অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সংবিধান কীভাবে সাম্প্রদায়িক সংবিধানে রূপান্তরিত হয়, তা দেখেছি। যদিও সংবিধানে সংখ্যালঘু বলে কোনো শব্দ নেই। নাগরিক হিসেবে সবাই সমান। অথচ রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে ঠিকই একশ্রেণির মানুষকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং তাদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে, যা কাম্য নয়। আমরা মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা থেকে অনেক দূরে ছিটকে পড়ছি।
আমাদের স্বাধীনতার ইশতেহারে (Proclamation of Independence) সমতা, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিতের কথা বলা হয়েছে। এই ইশতেহার আমাদের কাছে নিছক একটি দলিল নয়, এটি ছিল মুক্তিকামী মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের অঙ্গীকার। এখানে উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে সরকারি দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন, সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, বৈষম্য বিলোপ প্রণয়ন, পার্বত্য শান্তিচুক্তি, পার্বত্য ভূমি কমিশন এবং অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন, দেবোত্তর সম্পত্তি আইন প্রণয়ন এবং সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করার জন্য অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে আর মাত্র এক বছর বাকি। অথচ সরকারি দলের ২০১৮ সালের নির্বাচনি ইশতেহারের সংখ্যালঘু-জাতীয় নৃগোষ্ঠী স্বার্থবান্ধব প্রতিশ্রুতিসমূহ বাস্তবায়নে আজও কাঙ্ক্ষিত উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি— এটা খুবই হতাশাব্যঞ্জক। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ তাদের কিছু দাবি-দাওয়া নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে স্মারকলিপি পেশ করেছে। এগুলি এখন বিবেচনা ও আমলে নেওয়ার সময় এসেছে। আমাদের গুরুত্বপূর্ণ দাবিসমূহের মধ্যে রয়েছে, সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করা, সংখ্যালঘু কমিশন গঠন করা, বৈষম্য বিলোপ আইন প্রণয়ন করা, অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন বাস্তবায়ন করা, পার্বত্য শান্তি চুক্তির বাস্তবায়ন করা, সমতলের নৃগোষ্ঠীর জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করা, সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় গঠন করা ইত্যাদি।
আমরা জানি, ধর্মীয় জাতিগত সংখ্যালঘু ও নৃগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণে সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় সংবিধান ‘ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা’ রাষ্ট্রীয় মৌলনীতি হিসেবে সংবিধানে ফিরে এসেছে, পার্বত্য শান্তিচুক্তি সম্পাদন ও পার্বত্য ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তিতে আইন প্রণীত হয়েছে, গণবিরোধী শত্রু (অর্পিত) সম্পত্তি আইন বাতিলক্রমে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, নিবন্ধন আইনে বিরাজিত বৈষম্য দূরীভূত হয়েছে, হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইন প্রণীত হয়েছে, ধর্মশিক্ষায় স্ব স্ব ধর্মের শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তাছাড়া প্রশাসন, বিচার বিভাগে চাকরি-বাকরির নিয়োগ পদোন্নতি ও জনপ্রতিনিধিশীল সংস্থায় অতীতের বিরাজিত বৈষম্যের বেশ খানিকটা অবসান হয়েছে। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়েছে। কিন্তু এখনো আমরা নানাভাবে বৈষম্য, নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছি। দেশের স্বাভাবিক সময়ে তো বটেই, করোনা অতিমারি দুর্যোগময় পরবর্তী পরিস্থিতিতেও ধর্মীয় জাতিগত সংখ্যালঘু ও নৃগোষ্ঠীদের বাড়িঘরে হামলা ও জখম, তাদের জমিজমা এমনকি দেবোত্তর সম্পত্তিও জবরদখল ও জবরদখলের অপচেষ্টা, ধর্ম অবমাননার মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে বিগত কয়েক বছরে সাতক্ষীরা, পটুয়াখালী, মৌলভীবাজার, মাগুরা, জামালপুর, জয়পুরহাট, চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, কুড়িগ্রাম, কক্সবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, দিনাজপুর, আগৈলঝাড়া, যশোর, বরিশাল, ভোলা, সুনামগঞ্জের শাল্লাসহ নানা জায়গায় নিরীহ ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগণকে নানাভাবে হয়রানি, তাদের বাড়িঘর ও উপাসনালয়ে হামলার ঘটনা ঘটেছে। আমরা নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করি, কুচক্রীমহলের এ ধরনের হীনপ্রয়াস আইনের পরিপন্থী। এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত দুষ্কৃতকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দৃশ্যমান না হওয়াটা দুঃখজনক।
এখন ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী, সংখ্যালঘু ও অনগ্রসর সম্প্রদায়ের জন্য একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে দেওয়া নির্বাচনি অঙ্গীকার পূরণে নিম্নোক্ত কাজগুলি করা একান্ত প্রয়োজন : (১) দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করা ও জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন এবং বৈষম্য বিলোপ আইন প্রণয়ন করা। (২) অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে— (ক) অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ ট্রাইব্যুনাল ও আপিল ট্রাইব্যুনালের প্রদত্ত রায় ও ডিক্রি আইনে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে জরুরি নির্দেশনা জারি করা। (খ) ২০১৩ সালে বাতিলকৃত ‘খ’ তপশিলভুক্ত সম্পত্তির খাজনা নেওয়ার ক্ষেত্রে তহশিল অফিসের অস্বীকৃতি এবং নামজারিতে এসি (ল্যান্ড) অফিসের অহেতুক গড়িমসি ও দুর্নীতি বন্ধেরও নির্দেশনা প্রদান করা। (গ) জাতীয় পর্যায়ে এবং প্রতিটি জেলায় ভূমি প্রশাসন, সরকারি আইনজীবী, ভুক্তভোগী জনপ্রতিনিধি এবং ভুক্তভোগী আইনজীবী প্রতিনিধির সমন্বয়ে মনিটরিং সেল গঠন করে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন বাস্তবায়নের নিয়মিত পরিবীক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা। (৩) পার্বত্য শান্তিচুক্তি ও পার্বত্য ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের যথাযথ বাস্তবায়ন করা এবং সমতলের সংখ্যালঘু জাতিসত্তাসমূহের (যেমন— সাঁওতাল, মুন্ডা, ওঁরাও, মণিপুরি ইত্যাদি) ভূমি রক্ষায় স্বতন্ত্র ভূমি কমিশন এবং রাষ্ট্রীয় প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৭ ধারা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের নির্দেশ জারি করা। (৪) এতদ্ব্যতীত দ্রুত সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় গঠন করা হোক।
লেখক: সাংগঠনিক সম্পাদক, শ্রী শ্রী জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ, বাংলাদেশ

