শিক্ষাই পারে সব বৈষম্য দূর করতে

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২৩, ০৫:০০

একটা সমাজ, একটা দেশ বা রাষ্ট্র কিংবা বৃহত অর্থে একটা পৃথিবী দিনে দিনেই যে অনুর্বর হয়ে চলেছে—তার প্রধানতম কারণই মনে হয় মাতৃপ্রকৃতির প্রতি অসম্মান-অবমাননা। ধরিত্রী মাতা যেমন, দেশ মাতা যেমন, জন্মদাত্রী কিংবা তাবৎ নারীকুলই মায়ের জাত। নারী-পুরুষের সমান তালে তাল মিলিয়ে চলার মধ্যেই সৃষ্টির সার্থকতা। প্রকৃতির নিহিত শক্তি কিংবা অন্তর্নিহিত বার্তা সে রকমই। তাবৎ প্রাণিকুলেরই এই যে ধর্ম, পুরুষে-নারীতে সমানে-সহাবস্থানে এগিয়ে চলে জীবপ্রজাতি। মানুষের ক্ষেত্রেও আলাদা কিছু নয়। এভাবেই এগিয়ে চলে মনুষ্যত্ব, মানবিকতা। এই রকমই যেখানে বার্তা প্রকৃতির, সেখানে সৃষ্টির সেরা মানব প্রজাতিতেই যত গড়বড়। নারীতে পুরুষে লিঙ্গের ভেদাভেদ সমাজ-দেশ-রাষ্ট্রের তথা গোটা মানব জাতির অগ্রগতির অন্তরায়। নারী-পুরুষের সমতার বিসদৃশ বিরাট ব্যবধান ‘নারীর অধিকার আদায়ের’ স্লোগানে পরিণত আজ। সমতার পৃথিবী—মানব প্রজাতির সমতা-সহাবস্থানে উর্বর ধরিত্রীমাতার প্রকৃতি আজ অধিকার আদায়ের কর্কশতায় মুখরিত। কিন্তু এমন তো হওয়ার কথা ছিল না।

ঊনবিংশ শতকের রেনেসাঁর পথ পেরিয়ে এই যে সময়ে এসে উপনীত দেশ-কাল-সমাজ, মনে কি হয় যে, জন্মের আদিমতা পেরিয়ে সৃষ্টির সর্বোৎকৃষ্ট মস্তিষ্কের জীব তার আদিম প্রবৃত্তি থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে? হত্যা-খুন, ধর্ষণ—এসব যেমন মানুষের একপ্রকার বিকৃত মস্তিষ্ক-মানসিকতার পরিচায়ক, নারীকে তার যোগ্যতার প্রাপ্য থেকে টেনে পিছিয়ে রাখার প্রবণতাও কম বিকৃত মানসিকতা নয়। একাডেমিক সাক্ষরধারী শিক্ষিতের একটা বিরাট অংশের রক্ত-মজ্জায় গাঁট বেঁধে আছে নারীর প্রতি বিদ্বেষ। আশ্চর্য লাগে যখন ভাবী, জন্মদাত্রী মায়ের ত্যাগ-সক্ষমতা-শক্তি—এসবের কি কোনো অনুমানই তাদের নেই? মায়ের শক্তি-সামর্থ্য-তার মর্যাদার কোনো উপলব্ধি তারা করতে অপারগ? একটি বারের জন্যও কি চোখ দিয়ে দেখেন না কন্যা, জায়া, জননী ভগ্নীকে? যদি তাই হবে, অফিসে-আদালতে এক জন সহকর্মী, এক জন নারী, যে তারই পরিবারের মতোই একজন—তার প্রতি কেন এই বিদ্বেষ-বিরূপতা। সৃষ্টির আদি শক্তি যিনি, কোন উদাসীনতা বা মূর্খতায় তার থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকেন পুরুষপ্রবর? নারীকে তার প্রাপ্যতা থেকে বঞ্চিত করে মাড়িয়ে যেতে চায়, অপমানে-অপমানে বিদ্ধ করেন ? এ কি কেবলই লিঙ্গগত বিভেদ-চেতনা, নাকি আরও কিছুও ক্রিয়া করে মূলে? ব্যক্তিগত বা বস্তুগত লোভ-লালসা, আয়-উন্নতির হিসাবও তো কম ক্রিয়াশীল নয়। প্রতিকূলতার সঙ্গে সংগ্রাম করে করে যেভাবে প্রতিদিনই এগিয়ে আসছে নারী, প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রমাণ করছে নিজেকে, আত্মশক্তিতে দুর্বল পুরুষের মনে শঙ্কা তো জাগতেই পারে!। তবে মানুষ হিসেবে- ‘হিউম্যান বিয়িং’ হিসেবে মৌলিক চেতনা-বোধের বিকাশ ঘটানো দরকার। যুগে যুগে, কালে কালে মানবেরা এই নিয়ে ভেবেছেন। রবীন্দ্রনাথ ভেবেছেন, বঙ্কিম, শরত্চন্দ্র, নজরুল ভেবেছেন। পরিবার, সমাজ-রাষ্ট্রে মেয়ের প্রতি সমান দৃষ্টির চর্চা প্রয়োজন। সমাজে রাষ্ট্রে সুন্দর আচার-ব্যবহারের চর্চা প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় এই বিষয়গুলোকে দীর্ঘ মেয়াদে চর্চা-পরিচর্যার নিঃসীমতা থেকে বের করে আইন দিয়ে সিদ্ধ করার চেষ্টা অবশ্য হয়েছে। প্রয়োজন এসব আইনের জোর বাস্তবায়ন। আমাদের সংবিধানেও নারী-পুরুষের সমতার নির্দেশ আছে।

আধুনিক সময়ে নারীর অধিকার নিয়ে প্রথম কণ্ঠস্বর দেখা যায় ১৬৪৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে। ঐ সময় মার্গারেট ব্রেন্ট নামক এক নারী ম্যারিল্যান্ডের অ্যাসেম্বলিতে প্রবেশের দাবি করেন। কিন্তু, পুরুষরা তা সঙ্গে সঙ্গে নাকচ করে দেয়। ১৭৯৩ সালে ফরাসি নাট্যকার ও বিপ্লবী অলিম্পে দ্য গগসকে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হয়। কারণ এই মহীয়সী নারী ১৭৯১ সালে ফ্রান্সে নারী অধিকারের ব্যাপারে বলেছিলেন, ‘নারী জেগে ওঠো; তোমার অধিকারকে আবিষ্কার করো।’ মৃত্যুর আগে গগস বলে গেছেন একটি ঐতিহাসিক কথা—‘নারীর যদি ফাঁসি কাষ্ঠে যাবার অধিকার থাকে, তবে কেন থাকবে না পার্লামেন্টে যাবার অধিকার?’

পশ্চিমা বিশ্ব নারী অধিকারে আজ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। কিন্তু আমরা এখনো তিমির রাত কাটিয়ে উঠতে পারিনি। এখনো দেখা যায় ঘরে ঘরে বধূ নির্যাতন। নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ আজ সময়ের দাবি। পরিবারে, সমাজে, ঘরে-বাইরে, কর্মক্ষেত্রে অফিসে-আদালতে নারী যেন তার যোগ্যতার প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত না হয়, নারী যেন মর্যাদার সঙ্গে অনুকূল পরিবেশে মনোসংযোগ করতে পারে তার কাজে—সে দায়িত্ব রাষ্ট্রের এবং সমাজের প্রতিটি মানুষেরও। তাই বলব, দয়া করে বধূ নির্যাতন করবেন না—এর ভেতরে কোনো পুরুষত্ব নেই। জগতটাকে দেখুন মায়ের চোখ দিয়ে। নিজেকে মানবিক হিসেবে গড়ে তুলুন। সুস্থ-সুন্দর দম্পত্যের মাধ্যমেই গড়ে ওঠে ভালো প্রজন্ম। আর ভালো প্রজন্মই উপহার দেয় একটি উন্নত ও সুন্দর রাষ্ট্র। ভালো দাম্পত্য মানেই স্বাভাবিক পরিবার। স্বাভাবিক পরিবারে যদি শিক্ষিত মা থাকে তবে তার সন্তানও শিক্ষিত হয়ে উঠবে। একটি জাতি গঠনে নারীশিক্ষার গুরুত্বও সীমাহীন। শিক্ষাই পারে সব বৈষম্য দূর করতে। 

লেখক: চিকিৎসক ও সাহিত্যিক

ইত্তেফাক/এমএএম