পরিবারই হোক বার্ধক্য জীবনের আমৃত্যু আশ্রয় 

আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০২৩, ০০:০৮

পৃথিবীতে সব মিলিয়ে প্রায় ৩ কোটি প্রাণীর মধ্যে কেউই রিজিক ছাড়া নেই। অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, জীবিকার জন্য আমরা প্রত্যেকেই প্রত্যেকের ওপর প্রত্যক্ষ বা প্ররোক্ষভাবে নির্ভরশীল। তবে মানুষের মতো এত অসহায় দুর্বল জীব পৃথিবীতে আর নেই। গরুর বাছুর জন্ম নেওয়ার কয়েক সেকেন্ড পরে পড়িমরি করে ওঠে দাঁড়ায়। মায়ের স্তন খুঁজে দুধ পান করে। তিড়িংবিড়িং করে, দৌড়ায়। মানুষ কিন্তু এটা পারে না। ফলে মানবশিশুকে খাইয়ে দিতে হয়। শুয়ে দিতে হয়। মূলত সবকিছুই তাকে করে দিতে হয়, প্রায় দুই-আড়াই বছর পর্যন্ত। 

মানুষ মূলত দুই বার পুরোপুরিভাবে পরনির্ভরশীল হয়। প্রথমত শিশুকালে, শেষমেশ বার্ধক্যে। বার্ধক্য মানবজীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো পথ খোলা নেই। বার্ধক্যে পৌঁছার আগেই মৃত্যুবরণ করেন যারা, তাদের কথা আলাদা। যারা বার্ধক্যে উপনীত হয়ে কালাতিপাত করছেন, তারা কিছু না-কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। কারণ, বার্ধক্য তাদের রূপযৌবন কেড়ে নেয়। তাদের দেহের শক্তিসামর্থ্য কেড়ে নেয়। তাছাড়া বার্ধক্যে মানুষ একদম নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। তখন অধিকাংশ পরিবারের সচল ব্যক্তিদের অবহেলায়, অনাদরে তাদের দিন কাটে। 

শেকসপিয়ার তার ‘অ্যাজ ইউ লাইক ইট’-এ মানুষের জীবনে সাতটা অধ্যায় নিয়ে লিখেছেন—মানুষ বৃদ্ধ বয়সে এমন একটা অবস্থায় পৌঁছে যায়, যখন দাঁত থাকে না। স্বাদ থাকে না, একটা পর্যায়ে কিছুই থাকে না। স্মৃতি শক্তি তেমন কাজ করে না। একেবারে বেখেয়াল হয়ে পড়ে। সে শিশুর মতো হয়ে যায়। আজ কষ্টের সঙ্গে বলতে হচ্ছে,  বর্তমানে বার্ধক্যে উপনীত ব্যক্তিরা আতঙ্কে ভুগছেন। আতঙ্কিত হয়ে মুষড়ে পড়েছেন নিঃসন্তান দম্পতিরাও। কারণ, তাদের মধ্যে একজন মারা গেলে অন্যের ভোগান্তির সীমাপরিসীমা থাকে না। স্বামীর  বাড়িতে ঠাঁই হয় না নিঃসন্তান বিধবা স্ত্রীর। অনেক সময় তাকে ন্যায্য হক থেকেও বঞ্চিত করা হয়। নিজ সন্তানরাই পিতামাতাকে দেখছে না। নিঃসন্তান দম্পতিদের নিদানকালে কে দেবে ঠাঁই? সাম্প্রতিককালে গণমাধ্যমে বৃদ্ধ মা-বাবার প্রতি সন্তানদের নির্মমতার যে খবর আসছে, তা শঙ্কিত হওয়ার মতোই। মূলত যে কোনো বিবেকবান মানুষের পক্ষে এমন বর্বরোচিত নৃশংসতার খবর মেনে নেওয়া কঠিন বটে। কোথায় আছি আমরা? কোথায় আমাদের মানবিক মূল্যবোধ? 
 
সম্পদলোভী সন্তানেরা হেন অপরাধ নেই যে, তারা করছে না। বৃদ্ধ মা-বাবাকে পিটিয়ে বাড়ি ছাড়া করছে। জবরদস্তি করে সম্পত্তি লিখে নিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার মতো ঘটনা এখন নিত্যকার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পিতার মৃত লাশ ফেলে রেখে সম্পত্তি ভাগবাটোয়ারা দ্বন্দ্বে সন্তানেরা পরস্পর সহিংসতার মুখোমুখি। সন্তানের হাতে মা গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর খবর আসছে। সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে প্রতিষ্ঠিত এক অধ্যাপক পিতার শেষ  আশ্রয় বৃদ্ধাশ্রম। উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত পরিবারে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের প্রতিও পারিবারিক সহিংসতা ও নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনা বাড়ছে দিনদিন। 

আবহমান বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্য একসময় সামাজিক অটুট বন্ধনে যৌথপরিবার ছিল নিউক্লিয়াসের মতো। ফলে প্রচলিত সভ্যতায় মা-বাবার ভরণপোষণ ও লালনপালনের দায়দায়িত্ব সন্তানদের ওপরই ন্যস্ত ছিল। মা-বাবা এবং পরিবারের সদস্যরাও সন্তানদের সেভাবেই গড়ে তুলতেন। সন্তানের যাবতীয় বিকাশ, মননগত উন্মেষ ব্যক্তিত্ব গঠিত হতো যৌথপরিবারের অবকাঠামোর আদলেই। সভ্যতার উন্নতির ছোঁয়ায় আজকাল পরিবারগুলো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। এ ভাঙনে মূল্যবোধেও আঘাত হেনেছে চরমভাবে। আধুনিকতা, সভ্যতায় দ্রুত নগরায়ণ হচ্ছে, শিল্পায়ন হচ্ছে। ঈর্ষণীয় উন্নতির ডামাডোলও চোখে পড়ার মতোই। লোকসংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু মানুষের সংখ্যা বাড়েনি। তাই হারিয়ে যাচ্ছে পরিবারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা মানুষের স্বাভাবিক মূল্যবোধ। এক হাঁড়িতে রান্না, একই উঠোনে হাসিকান্না, আনন্দবেদনা ভাগাভাগি করার রেওয়াজও বিলুপ্তির পথে। পরিবারে পরস্পরের প্রতি নেই শেয়ারিং, নেই কেয়ারিং। 

আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভরতা আমাদের বেগ দিয়েছে; কিন্তু কেড়ে নিয়েছে আবেগ। আমাদের বহিরাঙ্গ যতই ফিটফাট চকমকে দেখাচ্ছে, ভেতরটা ততই দৈন্য ও কৃত্রিমতায় ভরা। শংকর তার ‘জানা দেশ অজানা কথা’ গ্রন্থে লিখেছেন, আধুনিকতার চরম শিখরে উঠে মার্কিনিরা এত কর্মব্যস্ত যে, মাবাপ মরে গেলে কান্নার সময় নেই বলে সেখানে টাকা দিয়ে কান্নার লোকও ভাড়া করা হয়। তাও ভালো! কিন্তু আমাদের দেশে যে, নিজের সন্তানের দ্বারা বৃদ্ধ বয়সে নিঃগৃহীত হওয়া শুধু নয়, খুন হওয়ার ঘটনাও ঘটছে।  
 
প্রযুক্তির ঔৎকর্ষ ও আধুনিকতার কাছ থেকে আমরা এত বেশি পেয়েছি যে,এই অতি পাওয়া আমাদের বদহজমি করে তুলেছে। আমরা শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির উচ্চতম শিখরে যতই বেগবান হচ্ছি, ততই যেন অবক্ষয়, বিকৃতি, বিচ্যুতি ও শূন্যতার  ফাটল দীর্ঘতর হচ্ছে। আমরা দিনদিন যেন অন্তঃসারশূন্যতায় নিক্ষিপ্ত হচ্ছি। ভাবছি, এমন অনাকাঙ্ক্ষিত অবক্ষয়ের তোড়ে যেন ভেসে না যায় মানবিকতা বোধের আবেদনীয় অংশটুকু। 

বর্তমানে পেরেন্টিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হচ্ছে, মা-বাবা যা বলেন, সন্তানরা তা করে না। বরং মা-বাবাকে সন্তানরা যা করতে দেখে, তা-ই তারা করে এবং তা দীর্ঘস্থায়ীও হয়। সুতরাং মা-বাবাকে যদি নৈতিক ও মানবিক কায়দায় অভ্যস্ত হতে দেখে, তবে সন্তানরাও সে আদলেই গড়ে ওঠবে। মা-বাবাকে যদি বয়োজ্যেষ্ঠদের যথাযথ মর্যাদা ও সম্মান প্রদর্শন করতে দেখেন, তবে সন্তানরাও বৃদ্ধ বয়সে তাদের পিতা-মাতাকে যথার্থ মর্যাদা দেবে। কারণ, কৃতজ্ঞ সন্তান চাইলে পিতা-মাতাকেই কৃতজ্ঞ হওয়ার শিক্ষা দিতে হবে। কাউকে ত্যাগ শেখাতে গেলে যে, আগে নিজেকে ত্যাগ করতে হবে। আসলে, মানবিকতার ঔদার্য, ধন্যবাদের ঔদার্য, কৃতজ্ঞতাবোধের ঔদার্য হলো শিক্ষাসাপেক্ষ। আর এই শিক্ষাটা শুরু করতে হবে পরিবার থেকেই।

বার্ধক্যে সন্তান কর্তৃক নিগ্রহ-নিপীড়ন মূলত অমানবিক ও অগ্রহণযোগ্য। এসব অমার্জনীয় অপরাধ শুধু আইনের যথাযথ প্রয়োগ দ্বারা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সামগ্রিকভাবে সম্মিলিত প্রচেষ্টা। তাই, আসুন, বার্ধক্য আতঙ্কমুক্ত সমাজ গড়ায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হই। আমাদের অতীত ঐতিহ্যের প্রথাগত মূল্যবোধে দীপিত হোক আমাদের সন্তানেরা।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক

 

 

ইত্তেফাক/ইআ