বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। পৌষ ও মাঘ এই দুই মাস শীতকাল। সাধারণত বেশির ভাগ বাঙালির পছন্দের ঋতু শীতকাল। অনেকের জন্য শীতকাল আনন্দের বিষয়। গ্রামের শীত মানেই কুয়াশামোড়ানো ভোরে চুলোর পাশে বসে পিঠা খাওয়া। ঝরা পাতা জড়ো করে জ্বালিয়ে আগুন পোহানো। গল্পের আসরে বসে ধূমায়িত চা-কফির উষ্ণ স্বাদ। দীর্ঘ রাতে লেপ-কম্বলের ওম লাভের আনন্দ। কিন্তু যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরোয়, তাদের জন্য শীত মানে ভয়াবহ দুঃসংবাদ। শীতের প্রকোপ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এক টুকরো শীতের কাপড় তাদের জন্য যেন শত আরাধনার ধন। দেশের বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের অনেক মানুষের প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্রও নেই শীতের প্রকোপ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য।
আমাদের আশপাশেও এমন মানুষের সংখ্যা কম নয়। ঢাকাসহ আশপাশের জেলাগুলোতেও কম নয় এই সংখ্যা। সড়কের পাশে, বাস ও ট্রেন স্টেশনে, বাজার-ঘাটে রাতের বেলা এমন অনেক অসহায় মানুষকে পড়ে থাকতে দেখা যায়। আমরা যখন লেপ-কম্বল গায়ে জড়িয়ে দীর্ঘ রাত সুখনিদ্রায় বিভোর, তখন তাদের রাত কাটে নির্ঘুম অবস্থায় শীতের প্রকোপে যবুথবু হয়ে। যার পেটে ভাত নেই, তার গায়ে গরম কাপড় জুটবে কোত্থেকে? আমরা কি পারি না তাদের সাহায্যে একটু এগিয়ে আসতে?
সমাজের অসহায় ও শীতার্ত মানুষদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের সবারই নৈতিক দায়িত্ব। অসহায়দের সাহায্যে এগিয়ে আসার মাধ্যমেই রচিত হবে মানবিক সেতুবন্ধ। আমাদের সামান্য সহযোগিতা তাদের জীবনে এনে দিতে পারে এক টুকরো সুখ। কনকনে শীতে ঠকঠক করে কাঁপা মানুষের গায়ে শীতবস্ত্র জড়িয়ে তার মুখে হাসি ফোটানোর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে? এর মাধ্যমে প্রকাশ পায় মানুষের প্রতি আমাদের মমত্ব ও ভালোবাসার। আমরা চাইলেই এসব দুখি মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসতে পারি। এর জন্য কি অঢেল বিত্ত-বৈভবের মালিক হওয়া প্রয়োজন?
মধ্যবিত্ত পরিবারের লোকেরাও করতে পারেন অনেক কিছু। এসব অসহায়ের প্রতি তাদেরও রয়েছে কিছু নৈতিক দায়িত্ব। আমাদের উপার্জিত অর্থের সামান্য পরিমাণও যদি এসব অসহায়ের জন্য আমরা বরাদ্দ করি, তাহলে বিন্দু বিন্দু সে দান শীতার্তদের কষ্ট লাঘবে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারে। বড় অঙ্কের অর্থ দান করা জরুরি নয়। আন্তরিকতা ও ভালোবাসার সঙ্গে অল্প দানও অনেক মূল্যবান। তাছাড়া আমাদের অতিরিক্ত সোয়েটার, জ্যাকেট, কম্বল ইত্যাদি শীতবস্ত্র দান করার মাধ্যমেও আমরা তাদের পাশে দাঁড়াতে পারি।
ইদানীং অসহায় ও শীতার্ত মানুষদের জন্য বিভিন্ন জায়গায় ‘মানবতার দেওয়াল’ নামে একটি উদ্যোগ সবার নজর কেড়েছে। এসব দেওয়ালে মানুষের প্রয়োজনীয় কাপড় ও শীতবস্ত্র থাকে। যাদের অতিরিক্ত কাপড় আছে, তারা সে দেয়ালে তা রেখে যায়। সেখান থেকে যে কেউ তার প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে যেতে পারে। এটা ইতিবাচক একটি উদ্যোগ। সামাজিক উদ্যোগে এ ব্যবস্থাটি আরো সুন্দর করা যেতে পারে। কিছু মানুষের একটি ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগও ভালো লেগেছে। শীতবস্ত্র বিতরণের ক্ষেত্রে দিনের বেলায় বিতরণ করলে তুলনামূলক সচ্ছল মানুষও শীতবস্ত্র নিয়ে যায়। এতে প্রকৃত অসহায়রা বঞ্চিত হয়ে যায়। তাই তারা রাতে ১১টা-১২টার দিকে বিভিন্ন স্টেশনে অসহায় মানুষদের থাকার জায়গায় ঘুরে ঘুরে শীতে কষ্ট করা মানুষদের শীতবস্ত্র বিতরণ করেন। যেন প্রকৃত হকদাররাই এ দানে উপকৃত হন। তাদেরকে আল্লাহ উত্তম প্রতিদান দিন। এ জাতীয় উদ্যোগ ব্যক্তিগতভাবেও গ্রহণ করা যেতে পারে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান থেকেও এ ধরনের মহতি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। সাধ্য ও সামর্থ্য অনুসারে আমরা তাদের সঙ্গেও শরিক হতে পারি।
ব্যক্তি একজন মানুষকে খাওয়াবে, পানি পান করাবে, বিপদ আপদে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসবে, তার সঙ্গে আল্লাহ্তায়ালা কীরূপ আচরণ করবেন! তাই আসুন, অসহায়দের সাহায্যে আমরা এগিয়ে আসি। শীতার্ত মানুষগুলো উষ্ণ হয়ে উঠুক আমাদের ভালোবাসায়। অপ্রয়োজনীয় কাপড় না ফেলে দিয়ে পাশে থাকা দুস্থদের দান করুন। তাতে সৃষ্টিকর্তা যেমন খুশি হবে, তেমনি পাশের মানুষটাও আনন্দিত হবে। মানুষ তো মানুষের জন্যই।
সাধারণত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে বেশি শীত থাকে। যার ফলে শীতে দুস্থদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয় এবং কষ্ট সহ্য করতে হয়। দুস্থদের এই শীতে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়। বিশেষ করে, শিশু ও বৃদ্ধদের শীতে অনেক কষ্ট করতে হয়। এই শীতের মধ্যে গায়ে শীতের কাপড় নেই, তাদের সাহায্য করা উচিত। আপনার সামান্য একটি শীতের কাপড় দিলেই তাদের কষ্ট লাঘব হবে। তাই আমাদের উচিত এই শীতে গরিব ও দুস্থদের পাশে দাঁড়ানো। নিজে সাহায্য করব এবং অন্যকে সাহায্য করতে উত্সাহিত করি। শীত যেমন বাঙালির পছন্দের ঋতু তেমনি আনন্দেরও। তাই শীতার্ত মানুষদের সঙ্গেও আনন্দ ভাগাভাগি করা উচিত।
লেখক : শিক্ষার্থী, আইডিয়াল কলেজ, ধানমন্ডি, ঢাকা
