মঙ্গলবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২৩, ১৭ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

প্রয়োজন তো হইবে মাত্র সাড়ে তিন হাত জমি

আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০২৩, ০০:২৫

সভ্য হইবার ‘নিয়ম’ রহিয়াছে। সভ্যতার সৌন্দর্য লুক্কায়িত থাকে নিয়ম-শৃঙ্খলার ভিতরে; কিন্তু সভ্যতার সেই নিয়ম-শৃঙ্খলার সৌন্দর্যের মুখে এই একবিংশ শতাব্দীতে আসিয়াও কালিমা লেপন করা হইতেছে। বাংলায় প্রবাদ রহিয়াছে—জোর যাহার মুল্লুক তাহার। প্রবাদটি সভ্যতাপরিপন্থি। নিয়ম-শৃঙ্খলাপরিপন্থি; কিন্তু বিদ্যমান পরাশক্তি ও উদীয়মান পরাশক্তিদের খেলা যুগ যুগ ধরিয়া চলিয়া আসিতেছে এবং সেইখানে তাহারা কোনো নিয়ম-শৃঙ্খলারই তোয়াক্কা করেন না। ভয় এবং পালটা ভয়ের সংস্কৃতি টুঁটি চাপিয়া ধরিতেছে পৃথিবীর মানুষের শান্তির মানস-জগতের। তাহাতে কী ঘটিতেছে? দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, অর্থনীতিতে অস্থিরতা, মন্দার অভিঘাত, বেকারত্ব বৃদ্ধি—এইগুলি ছিল তৃতীয় বিশ্বের সাধারণ ঘটনা; কিন্তু এইগুলি এখন তৃতীয় বিশ্বের পাশাপাশি শিল্পোন্নত দেশগুলিতে আঘাত হানিতেছে। 

আমরা দেখিতে পাইতেছি, এক দিকে বিশ্ব জুড়িয়া অর্থনৈতিক অস্থিরতা অন্যদিকে রাজনৈতিক সংঘাত বিশ্বকে ভয়াবহ বিবাদবিসংবাদে জড়াইয়া ফেলিতেছে। পুবের একটি উন্নত দেশ তাহার সামরিক খাতের বাজেট বাড়াইতে বাধ্য হইতেছে। তাহার নিকটবর্তী উদীয়মান বৃহত্শক্তির দেশটি ভয় দেখাইতেছে। অন্যদিকে সন্নিকটেই রহিয়াছে পরমাণু শক্তিতে আস্ফাালনকারী আরেকটা দেশ। সেইখানকার সমুদ্র অঞ্চলের প্রভাব-প্রতিপত্তি লইয়া টানাপড়েন কমিবার লক্ষণ নাই। আবার মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক যুগ ধরিয়া চলিতেছে নূতন নূতন ভাঙাগড়া। এককালে যাহাদের অঢেল প্রাচুর্য ও সমৃদ্ধ জীবন ছিল, তাহাদের আজ পথের ভিখারি আর উদ্বাস্তু বানাইয়া সহানুভূতি দেখানো হইতেছে। কথায় আছে—‘ভিক্ষা চাহি না, কুত্তা ঠেকাও।’ সেই যে ঈশপের বিখ্যাত একটি রূপকথা আছে—সিংহের হরিণ খাইতে সাধ হইল, তখন শিয়াল সিংহকে বলিল, হরিণকে সিংহাসনে বসাইবার লোভ দেখাইলে শিয়াল আপনার নিকট আসিবে আর তখন আপনি তাহার ঘাড় মটকাইয়া খাইবেন। শিয়ালের বুদ্ধিমতো হরিণ সিংহাসনে বসিবার লোভে দুরুদুরু বুকে সিংহের কাছে গেল। নিকটে আসিবামাত্র সিংহ হরিণের ঘাড় মটকাইয়া খাইল। এই পৃথিবীর কিছু সিংহ নিজেদের মতো করিয়া শান্তিতে বসবাস করা হরিণদের নিকট গণতান্ত্রিক-রাজজ্ঞান প্রদান করিতে চাহিল। এইভাবে সেই সিংহরা নিরীহ হরিণ নেতাদের হত্যা করিল, আর বাকি হরিণরা যখন কথিত গণতান্ত্রিক ঘূর্ণিঝড়ে এইদিক-ঐদিক ছিটকাইয়া পড়িল তখন তাহাদের বলা হইল উদ্বাস্তু, ভিখারি; কিন্তু কেহ স্পষ্ট করিয়া বলিতেছে না—কেন তাহাদের উদ্বাস্তু হইতে হইল? কেন তাহাদের অন্যদেশের সীমান্তে সীমাহীন দুর্ভোগের মধ্যে পড়িতে হইল? কেন যুদ্ধবিমান উড়িতেছে? 

পরাশক্তিরা তো পায়ে পাড়া দিয়া ঝগড়া বাঁধাইয়া পানি ঘোলা করিয়া মাছ ধরিতে ব্যস্ত। তাহারা বিশ্বব্যাপী তৈরি করিয়াছে ‘ভয়ের সংস্কৃতি’। সেই যে ঈশপের আরেক গল্পে রহিয়াছে—দুষ্টু কিছু বালক জলাশয়ের ব্যাংগুলির দিকে ঢিল ছুড়িয়া খেলিতে ছিল, ব্যাঙেদের গায়ে ঢিল লাগাইতে পারিলে হাততালি দিতেছিল। তখন ঐ ব্যাংদের মধ্যে একজন ঐ বালকদের বলিল, ‘তোমরা বন্ধ কর এই খেলা। যাহা তোমাদের জন্য খেলা, তাহা আমাদের মৃত্যুর কারণ।’ পৃথিবীর মানুষের অবস্থাও ঐ ব্যাঙের মতো। প্রস্তুর, লৌহ, তাম্র প্রভৃতি যুগ পার করিয়া আমরা আধুনিক যুগে আসিয়াছি ও হালনাগাদ অস্ত্রের ঝনঝনানি দেখিতেছি। অস্ত্রের জন্য এই পৃথিবীতে যত শত-সহস্র-অযুত কোটি অর্থ প্রতি বত্সর দেশে দেশে ব্যয় করা হয়, অস্ত্র কেনার জন্য পরিবেশ তৈরি করা হয় গরিব দেশগুলোর জন্য। অস্ত্র ক্রয় করিতে উদ্বুদ্ধ করা হয়; কিন্তু এই সকল হানাহানি অস্ত্রের আস্ফাালন না করিয়া যদি এই বিপুল অর্থ দিয়া বিশ্বের মানুষের মঙ্গলের কাজে ব্যয় করা হইত—তাহা হইলে এই পৃথিবীর চেহারা নিঃসন্দেহে অন্যরকম হইত। মোড়লদেরও মনে রাখিতে হইবে, অন্যকে ধ্বংসের আগুন ঝলসাইলে সেই আগুনের আঁচ একটি পর্যায়ে নিজেদের গায়েও পড়িতে বাধ্য। মোড়ল নেতারাও তো চিরকাল বাঁচিবেন না। প্রয়োজন তো হইবে মাত্র সাড়ে তিন হাত জমি। তাহা হইলে কেন এত যুদ্ধবিগ্রহ, হানাহানি, অশান্তি?

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন