মহামারির ক্রমহ্রাসমান প্রাদুর্ভাব আর ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের প্রকোপে দোদুল্যমান অবস্থায় গতো হলো ২০২২। সেই সঙ্গে নানান সম্ভাবনার দুয়ার খুলে প্রবেশ করল ২০২৩, যেসময় পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিরাজ করছে তীব্রসংকট। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজব্যবস্থা কিংবা জলবায়ু কোনোটাই এই প্রভাবের আওতামুক্ত নয়। ইউক্রেন-রাশিয়ার মুখোমুখি অবস্থান, চীন-তাইওয়ান দ্বন্দ্ব, জাপান-মার্কিন সম্পর্কের উন্নয়ন, রাশিয়া-চীন-ইরানের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র, জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক অচলাবস্থাসহ নানান অনিশ্চয়তা নিয়ে কেমন হবে নতুন বছর তা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার অন্ত নেই। বিশ্বের নামজাদা গবেষক, রাজনীতিবিদ ও অর্থনীতিবিদেরা এই অচলাবস্থা নিয়ে ভিন্ন-ভিন্ন প্রেক্ষাপটে তাদের বিশ্লেষণকে দাঁড় করিয়েছেন।
বিগত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের মাধ্যমে সৃষ্ট অচলাবস্থা আদৌ স্বাভাবিক হয়নি। এই বছরেই ইউক্রেনে রাশিয়ার বিজয় নিশ্চিত হতে পারে বলে উল্লেখ করেছেন বিভিন্ন রাজনীতি বিশ্লেষকেরা। বিগত বছরের শেষদিকে মস্কো কঠোর ভাষায় বলেন ‘নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আমরা একবিন্দুও ছাড় দিবোনা। প্রয়োজনে আমরা সর্বোচ্চ শক্তির প্রয়োগ করতেও দ্বিধান্বিত হবো না।’ এই বক্তব্য থেকেই পুতিনের পারমাণবিক শক্তি প্রয়োগের স্পষ্ট হুশিয়ারি পরিলক্ষিত হয়।
রুশ-ইউক্রেন সংকটকে ঘিরে যখন সারাবিশ্ব একমুখী, ঠিক সেসময় দক্ষিণ চীন সাগরের দ্বীপরাষ্ট্র তাইওয়ানের সঙ্গে দ্বান্দ্বিক অবস্থানে আছে বেইজিং। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্রেটেজিক এন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) এর মতে ২০২৬ সাল নাগাদ তাইওয়ানে সামরিক হামলা চালাতে পারে
চীন। তাইওয়ানকে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হতে যুক্তরাষ্ট্র মদত জুগিয়ে গেলেও চীন তাকে নিজেদের একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। তাইওয়ান রিলেশন অ্যাক্ট (টিআরএ) এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও তাইওয়ানের মধ্যকার এই সহযোগিতা সমপর্ক চলমান রয়েছে। উল্লেখ করা হয়, চীন যদি তাইওয়ানে কোনোরূপ আগ্রাসন চালায় তবে যুক্তরাষ্ট্র তা শক্ত হাতে প্রতিহত করবে। এসময় যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী হিসেবে জাপানও তার সমস্ত শক্তি দিয়ে তাইওয়ানের পাশে দাঁড়াতে পারে।
চলমান বৈশ্বিক সংকটের অন্যতম ট্রায়াম কার্ড পারস্য উপসাগর, কাস্পিয়ান হ্রদ ও ওমান সাগরের সীমান্তবর্তী রাষ্ট্র ইরান। তিন দিকে পাহাড় ও একদিকে সমুদ্র পরিবেষ্টিত এই রাষ্ট্র তার ভূরাজনৈতিক সমীকরণ ও ভৌগোলিক অবস্থান উভয় বিবেচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে আছে। বিভিন্ন সময়ে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ফলে আমদানি বন্ধ থাকলেও, নিরাপত্তার স্বার্থে অস্ত্র তৈরি করে যাচ্ছে ইরান। নিজেদের তৈরি অস্ত্র, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে প্রতিরক্ষায় বিশ্বের চৌদ্দতম অবস্থান ধরে আছে ইরান।
পর্যটননির্ভর অর্থনীতির দেশ শ্রীলঙ্কার ভরাডুবি আমরা ইতিমধ্যেই লক্ষ্য করেছি। একই পথে যাত্রা করতে চলেছে এশিয়ার অন্য এক রাষ্ট্র পাকিস্তান। তীব্র জ্বালানিসংকটের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাসের অপ্রতুলতা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে করে তুলেছে দুর্বিষহ।
এভাবে বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট তীব্রভাবে জনজীবনে স্থবিরতা নিয়ে আসছে। পৃথিবী জুড়ে তৈরি হচ্ছে জলবায়ু শরণার্থী, বিপর্যস্ত হচ্ছে তাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা। যুদ্ধের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে দেশগুলোর অবকাঠামো চরমভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হচ্ছে। মানবাধিকারের লঙ্ঘন হলেও এর দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে আদৌ কোনো জোরালো প্রতিরোধ পরিলক্ষিত হয়নি। নারী, শিশু ও বয়স্কদের মৃত্যুমুখে পতিত হতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সমাজ কাঠামো ভেঙে পড়েছে, স্বাস্থ্যসেবা বিনষ্ট হচ্ছে, অবকাঠামো ধ্বংস হচ্ছে, প্রকৃতি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে এই অচলাবস্থার ফলে। দেশের সার্বভৌমত্বের রক্ষায় যে যুদ্ধ, তা মানুষকে করে দিচ্ছে দেশান্তর; ভূখণ্ডের নিরাপত্তায় যে যুদ্ধ, সেখানে তৈরি হচ্ছে শরণার্থী; রাজনৈতিক স্বার্থে যে যুদ্ধ, তা কলুষিত করছে রাজনীতি; শ্রেষ্ঠত্বের জন্য যে যুদ্ধ, তা ধ্বংস করে দিচ্ছে মনুষ্যত্ব। সর্বোপরি, নতুন বছরে এসব যুদ্ধ-বিগ্রহের শেষ হোক, সম্ভাব্য অচলাবস্থার অবসান হোক, দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের ঊর্ধ্বে গিয়ে পৃথিবীটা মানুষের হোক।
লেখক : গবেষক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
