‘বাংলার স্বাধীনতা আমার কবিতা’ প্রতিপাদ্য করে আগামী ১ ও ২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ৩৫তম জাতীয় কবিতা উৎসব। ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের কবিরা এবারের উৎসবে অংশ নেবেন। আজ মঙ্গলবার (১৭ জানুয়ারি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) মুহাম্মদ সামাদ।
বরাবরের মতোই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারসংলগ্ন চত্বরে (হাকিম চত্বর) এবারের জাতীয় কবিতা উৎসবের আয়োজন করা হবে জাতীয় কবিতা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক তারিক সুজাত।
জাতীয় কবিতা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমিনুর রহমান সুলতানের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন ৩৫তম জাতীয় কবিতা উৎসবের আহ্বায়ক শিহাব সরকার, কবি আসলাম সানী, কবি নাসির আহমেদ, কবি কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়, কবি মুস্তাফা মজিদ, কবি হারিসুল হক, শিশুসাহিত্যিক আমীরুল ইসলাম প্রমুখ।
জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি মুহাম্মদ সামাদ কবিতা উৎসবের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, ‘আজকের প্রজন্মের পক্ষে কল্পনা করাও সম্ভব নয় যে কীভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কবিতা উৎস হয়েছে। আমরা পথে পথে মানুষের কাছে সহযোগিতা পেয়েছি। সাংবাদিক, সাহিত্যিক, লেখক, প্রকাশক সবাই যে যা পেরেছেন, আমাদের সহযোগিতা করেছেন। টিএসসির সড়কদ্বীপে আমরা মঞ্চ করেছিলাম। সেই উৎসব রোকেয়া হল ও শামসুন নাহার হল ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এর প্রধান কারণ ছিল সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিবাদ, দেশকে সামরিক স্বৈরাচার মুক্ত করে গণতন্ত্রের ধারায় ফিরিয়ে নেওয়া। তৎকালীন সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আমাদের কবিতা, বাঙালির জীবনধারা ও আবহমান বাংলার সংস্কৃতি—সবকিছু তছনছ করে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। সেসময় স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে একটা গতি সঞ্চার করে জাতীয় কবিতা পরিষদ। জাতীয় কবিতা উৎসবকে আমরা একটা পরম্পরায় বহন করে নিয়ে যাচ্ছি।’
মুহাম্মদ সামাদ আরও বলেন, ‘এই উৎসবের জন্য আমরা সরকার থেকে অর্থকরী নিইনি, আমাদের কোনো কার্যালয় নেই। আমরা কোনো রাজনৈতিক নেতাকে আমাদের মঞ্চে ওঠাইনি, তাঁদের সামনে বসিয়েছি। আপাসহ (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) রাজনৈতিক নেতাদের মঞ্চে ওঠাইনি। কবিতা উৎসবের রজতজয়ন্তীতে জাতিসংঘ থেকে ফেরার সময় প্লেনে বসে আমি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে বললাম, ‘আপা, আপনি কি যাবেন আমাদের উৎসব উদ্বোধন করতে?’ আপা বললেন, ‘না, সবকিছু আওয়ামী লীগ বানানোর দরকার নেই।’
উৎসবের প্রতিপাদ্য নিয়ে কবি মুহাম্মদ সামাদ বলেন, ‘আমরা মনে করি বাংলার যে স্বাধীনতা, সেটা একটা কবিতা। কবিদের কবিতা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় কী ভূমিকা পালন করেছে, আপনারা তা জানেন। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে গতবার আমরা উৎসব করার কথা ছিল। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে আমরা তা করতে পারি নাই। এবার আমাদের উৎসবের মর্মবাণী স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকে কেন্দ্র করে।’
লিখিত বক্তব্যে কবি তারিক সুজাত বলেন, ‘স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অগ্নিগর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া জাতীয় কবিতা উৎসব ও জাতীয় কবিতা পরিষদের নিরন্তর সংগ্রামের ইতিহাস কারও অজানা নয়। আমরা অব্যাহতভাবে স্বৈরাচার, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, যুদ্ধাপরাধের বিচার ও বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ব্যক্তিদের বিচারের কথা বলে এসেছি। কবিদের দ্রোহের স্ফুলিঙ্গ থেকে জন্ম নিয়ে এ উৎসব জাতীয় থেকে আন্তর্জাতিক উৎসবে রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশের কবিরা চিরকালই প্রগতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। প্রায় সাড়ে তিন দশক ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও ভাষার সংগ্রামী কবিরা এ উৎসবে আমাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মানুষের মুক্তির কথা বলেছেন। এ উৎসবকে আমরা কবিতার মিলনমেলায় পরিণত করতে পেরেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে, সেই সময় আমরা ২০২০–২১ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন করেছি। ২০২১ সালে পালিত হয়েছে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। এ বছর আমাদের কবিতা উৎসবের মর্মবাণী: বাংলার স্বাধীনতা আমার কবিতা। দুই দিনব্যাপী এ উৎসবে কবিতাপাঠ, নিবেদিত কবিতা, সেমিনার, আবৃত্তি ও সংগীতের মধ্য দিয়ে আমরা এ স্লোগানকে মূর্ত করে তুলব। এবারও বিভিন্ন দেশ ও ভাষার কবিদের উৎসবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ইতিমধ্যে ভারতের বিভিন্ন ভাষার বেশ কয়েকজন বরেণ্য কবি তাঁদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছেন।’
উল্লেখ্য করোনা পরিস্থিতির কারণে ২০২১ সাল এবং ২০২২ সালে জাতীয় কবিতা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে দুই বছর আবারও মঞ্চে ফিরছে কবিতা উৎসব । দু’দিনব্যাপী উৎসবে কবিতাপাঠ, নিবেদিত কবিতা, সেমিনার, আবৃত্তি ও সংগীত পরিবেশন হবে। উৎসবে দেশের কবিদের সাথে ভারত, নেপাল, মালদ্বীপসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের কবিরা অংশ নেবেন।
জাতীয় কবিতা উৎসব-স্লোগান ১৯৮৭-২০২৩
শৃঙ্খল মুক্তির জন্য কবিতা (১৯৮৭), স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কবিতা (১৯৮৮), সাম্পদায়িকতার বিরুদ্ধে কবিতা (১৯৮৯), কবিতা রুখবেই সন্ত্রাস (১৯৯০), গণতন্ত্রের পক্ষে কবিতা (১৯৯১), কবিতা রুখবেই মৌলবাদ (১৯৯২), জয় বাংলার জয় কবিতার (১৯৯৩), জনতার সংগ্রাম কবিতার সংগ্রাম (১৯৯৪), মানুষের অধিকার কবিতার অঙ্গীকার (১৯৯৫), মানবিকতার প্রত্যয়ে কবিতা (১৯৯৬), কবিতা মুক্তির শাশ্বত শক্তি (১৯৯৭), শান্তি-সম্প্রীতি আনবে কবিতা (১৯৯৮), কবিতা তিমির-বিনাশী (১৯৯৯), মাতৃভাষার আলোকধারায় কবিতার হোক জয় (২০০০), কবিতা উৎসব সত্য-সুন্দরের উৎসব (২০০১), কালের যাত্রায় কবিতার জয়ধ্বনি (২০০২), জয় কবিতার জয় মানবতার (২০০৩), কবিতা আনবেই সুসময় (২০০৪), কবিতা প্রতিরোধের হাতিয়ার (২০০৫), জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কবিতা (২০০৬), কবিতা বার বার ফিরে আসে আসে মিছিলে (২০০৭), কবিতার মন্ত্র জয় গণতন্ত্র (২০০৮), জয় জনতার জয় কবিতার (২০০৯), নতুন কবিতা নতুন সময় (২০১০), কবিতা উৎসব মুক্তির উৎসব (২০১১), কবিতা শোণিতে, স্বপ্নের ধ্বনিতে (২০১২), যুদ্ধাপরাধের বিচার দাবি আজ কবিতার (২০১৩), কবিতা সহে না দানব-যাতনা (২০১৪), জাগো সম্ভাবনায় জাগো কবিতায় (২০১৫), কবিতা মৈত্রীর কবিতা শান্তির (২০১৬), কবিতা মানে না বর্বরতা (২০১৭), দেশহারা মানুষের সংগ্রামে কবিতা (২০১৮), বাঙালির জয় কবিতার জয় (২০১৯), মুজিব আমার স্বাধীনতার অমর কাব্যের কবি (২০২০) ও বাংলার স্বাধীনতা আমার কবিতা (২০২৩)।
