শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীসংখ্যা হ্রাস প্রসঙ্গে

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২৩, ০০:১৮

দেশের জনসংখ্যা যে হারে বাড়িতেছে, তাহাতে বিশেষত উচ্চশিক্ষা শুধু সরকারি খাতের উপর নির্ভর করা উচিত নহে। এই কথা চিন্তা করিয়া গত নব্বই দশকে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রা শুরু হয়। সেই সময় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ভয়াবহ সেশনজটসহ বিবিধ সমস্যা বিদ্যমান ছিল। এই জন্য ১৯৯২ সালে যখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনা হয়, তখন ইহাকে অনেকেই স্বাগত জানান। ইহার মাধ্যমে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের হারও ক্রমান্বয়ে কমিয়া আসিতে থাকে।

নির্দিষ্ট সময়ে নির্বিবাদে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করিয়া দ্রুত কর্মমুখী হইতে পারিবার কারণে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত সমাজে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা জনপ্রিয়তা অর্জন করিতে থাকে; কিন্তু আমাদের দেশে দেখা যায়, যখনই একটি নূতন খাত ভালো করিতে শুরু করে, তখন সেইখানে অনেক ক্ষেত্রেই অযোগ্য, অমেধাবী ও দুষ্ট লোকের আনাগোনা বৃদ্ধি পাইতে থাকে। ইহাতে সেইখানে অস্থিরতা ও নৈরাজ্যময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বর্তমানে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় লইয়া যাহা চলিতেছে, তাহাতে উপর্যুক্ত চিত্রই পরিলক্ষিত হইতেছে। ইহার অর্থ এই নহে যে, দেশে ভালো ও আন্তর্জাতিক মানের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গড়িয়া উঠে নাই। ১৫-২০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অত্যন্ত সুনামের সহিত শিক্ষা কারিকুলাম পরিচালনা করিতেছে। আন্তর্জাতিক ভাবেও তাহারা সুনাম ও সুখ্যাতি অর্জন করিতেছে। গবেষণার মানের দিক হইতে তাহারা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহিত টেক্কা দিতেছে; কিন্তু সামগ্রিক বিবেচনায় তাহাদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। দেশে বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১০৯টি। ইহার মধ্যে কেবল ২০টি বিশ্ববিদ্যালয় ভালো করিতেছে বলিয়া আমরা আত্মসন্তুষ্টিতে ভুগিতে পারি না। প্রকৃতপক্ষে অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় অনীহা, সনদবাণিজ্য, অনুমোদনহীন শাখা ক্যাম্পাস পরিচালনা, ট্রাস্ট্রি বোর্ড লইয়া দ্বন্দ্ব, স্থায়ী শিক্ষকের অভাব, স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাইতে অনাগ্রহ, ভিসি-প্রো-ভিসির পদে শূন্যতাসহ নানা অনিয়ম ও সমস্যায় জর্জরিত। বৎসরের পর বৎসর আর্থিক প্রতিবেদন জমা না দেওয়াসহ খেয়ালখুশি মতো চলিবার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির শিক্ষার মানে অধোগতি হইতেছে। আর ইহারই প্রতিফলন দেখা যাইতেছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ ৪৮তম বার্ষিক প্রতিবেদনে। সেই প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে যে, মানহীন উচ্চশিক্ষার কারণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমিয়া যাইতেছে। যেমন—২০১২ সালে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ৬০টি। সেই সময় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৩ লক্ষ ১৪ হাজার ৬৪০ জন। ইহার প্রায় এক দশক পর ২০২১ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১০২টি হইলেও শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমিয়া দাঁড়ায় ৩ লক্ষ ১০ হাজার ১০৭ জনে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমিয়া আসাটা কোনো শুভ লক্ষণ নহে। ইহাতে উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের আবার বিদেশগামিতা বাড়িয়াছে বলিয়া প্রতীয়মান হয়। এখানে আস্থার সংকটও রহিয়াছে। লাগামহীন বাণিজ্য ও পড়ালেখার খারাপ মানের বিষয়টি অভিভাবকগণ মিডিয়ার কল্যাণে অবগত বিধায় এখন তাহারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হইতে মুখ ফিরাইয়া লইতেছেন। তাহা ছাড়া অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেটও আজ সেইভাবে মূল্যায়ন করা হইতেছে না। আবার এক দশকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৩৪টির স্থলে বৃদ্ধি পাইয়া দাঁড়াইয়াছে ৫০টিতে। সুতরাং যেইখানে খরচ তুলনামূলক কম, সেইখানেই শিক্ষার্থীরা ভর্তি হইবে, ইহাই স্বাভাবিক। এই অবস্থায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির শিক্ষার্থী ধরিয়া রাখাটাই আজ বড় চ্যালেঞ্জ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। করোনার সময় তাহারা বড় ধরনের ধাক্কা খাইয়াছে। 

এখন এই সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষার মানের সহিত তাহাদের কিছুতেই আপস করা সংগত হইবে না। শিক্ষা ও গবেষণার মান ভালো হইলে শুধু দেশি কেন বিদেশি শিক্ষার্থীরাও তখন ভর্তি হইবার জন্য হুমড়ি খাইয়া পড়িবে। অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানের অবনতিতে ইউজিসির কি দায় নাই? তাহারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অসহযোগিতার কথা বলিয়া সকল দায় এড়াইতে পারেন না। এই জন্য প্রয়োজনে ইউজিসির জনবল বৃদ্ধি করিতে হইবে, আইনি কাঠামো আরো সুবিন্যস্ত করিতে হইবে। সর্বোপরি সর্বত্র জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন সাধন করিতে হইবে।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন