বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৮ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বৈশ্বিক সংকটে আমদানি কেন নিরুৎসাহিত করা প্রয়োজন

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২৩, ০১:২১

পৃথিবীর কোনো দেশই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। কোনো একক দেশের পক্ষে তার সব প্রয়োজনীয় দ্রব্য উৎপাদন করা সম্ভব নয়। একটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের প্রধান খাত আমদানি। বাংলাদেশে ফল, খাদ্যদ্রব্য, যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে বেশির ভাগ পণ্য বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়ে থাকে। আপেল, আঙুর, কলা, আম, কমলাসহ বিদেশি ফল, বিদেশি ফুল, বিদেশি আসবাবপত্র, সুগন্ধি, প্রসাধনী বা রূপসজ্জার পণ্যসহ অপরিশোধিত সরিষার তেল, পেঁয়াজ, চিনি, গাড়ি, গাড়ির সরঞ্জাম ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য আমদানিকৃত পণ্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো কর্তৃক প্রকাশিত ‘বৈদেশিক বাণিজ্য পরিসংখ্যান’ শীর্ষক বার্ষিক প্রকাশনায় দেখা যায়, ২০২০-২১ সালে বাংলাদেশের মোট আমদানি মূল্য ছিল ৭৮ হাজার ২১১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। উক্ত অর্থবছরে বাংলাদেশে আমদানিকৃত পণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতিসহ যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম, পেট্রোলিয়াম পণ্য, কাঁচা তুলা, লোহা ও ইস্পাত, প্লাস্টিকসামগ্রী ইত্যাদি। অন্যদিকে, ২০২০-২১ সালে রপ্তানির মোট মূল্য ছিল ৪১ হাজার ৩২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার যা ২০১৯-২০ সালের তুলনায় ২৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তৈরি পোশাক, বিশেষ বোনা কাপড়, কাঁচা চামড়া, জুতা, তৈরি টেক্সটাইল সামগ্রী বাবদ রপ্তানি বেড়েছে। 

চট্টগ্রাম, মোংলাসহ ২৯টি কাস্টমস ও শুল্ক স্টেশনের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত ২০২১-২২ অর্থবছরে আমদানি ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৭৮৭ কোটি ডলার। তার আগের অর্থবছরের এসব স্টেশন দিয়ে পণ্য আমদানি ব্যয় ছিল ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পণ্য আমদানিতে ব্যয় ৩৩ শতাংশ বা ২ হাজার ২৩২ কোটি ডলার বাড়তি ব্যয় হয়েছে। এসব শুল্ক স্টেশন দিয়ে ৯৮ শতাংশ পণ্য আমদানি হয়। তবে আমদানি ব্যয় বাড়লেও পরিমাণের দিক থেকে সার্বিকভাবে আমদানি কমেছে। রাজস্ব বোর্ডের প্রাথমিক হিসাবে, ২০২১-২২ অর্থবছরে পণ্য আমদানি হয়েছে ১৩ কোটি ৯৪ লাখ টন। ২০২০-২১ অর্থবছরে পণ্য আমদানির পরিমাণ ছিল ১৪ কোটি ৫০ লাখ। অর্থাৎ পণ্য আমদানি ৫৬ লাখ টন বা ৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ কমেছে। পরিমাণ ও আমদানি ব্যয়ের তুলনা করে দেখা গেছে, কোনো কোনো পণ্যের আমদানি কমলেও ব্যয় বেড়েছে। আবার অনেক পণ্যে আমদানি যেমন বেড়েছে, তেমনি পাল্লা দিয়ে ব্যয়ও বেড়েছে। যেমন সিমেন্টশিল্পের কাঁচামাল ক্লিংকারের আমদানি কমলেও ব্যয় বেড়েছে। একই অবস্থা গম, সয়াবিন বীজ, অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের ক্ষেত্রেও। আবার পুরোনো লোহার টুকরো, তুলা, এলপিজি, সার, পাম তেলের মতো পণ্যের আমদানি বেড়ে যাওয়ায় ব্যয়ও বেড়েছে।

অন্যদিকে, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান খাত রপ্তানি ও প্রবাসী আয়। গত অর্থবছরে দেশে রপ্তানি আয় বাড়লেও প্রবাসী আয় কমেছে। এই দুটি মিলিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের চেয়ে ব্যয়ের পরিমাণ বেড়ে গেছে। ফলে ডলার নিয়ে অস্বস্তিকর অবস্থা চলছে। এছাড়া বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এর ফলে বাড়তি দামে পণ্য আমদানি করতে হচ্ছে। এতে রিজার্ভে চাপ পড়ার পাশাপাশি ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নও করতে হচ্ছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির উত্তরণ এবং ভবিষ্যতের যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সক্ষমতার জন্য দেশকে উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে হবে। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যার মাধ্যমে বেশ কিছু পণ্যের স্বনির্ভরতা আশা করা হচ্ছে। আমদানি ব্যয়ের চাপ কমাতে ও দেশীয় পণ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিদেশি ফল, বিদেশি ফুল, ফার্নিচার ও কসমেটিকস-জাতীয় প্রায় ১৩৫টি পণ্যের ওপর আমদানি পর্যায়ে বাড়তি নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক বা রেগুলেটরি ডিউটি (আরডি) আরোপ করেছে। এসব পণ্যের ওপর সর্বনিম্ন ৩ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ হারে বাড়তি নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এমনকি সরকার বিলাসদ্রব্যের আমদানি সীমিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দেওয়া তথ্যমতে, ফুল ও ফল চাষে বাংলাদেশ যথেষ্ট সমৃদ্ধ হয়েছে। বাংলাদেশ মূলত বিভিন্ন ধরনের কমলা, আপেল, আঙুর, খেজুর, মালটা বেশি আমদানি হয়। এর বাইরেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন নতুন ফল আমদানি হচ্ছে। উক্ত নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপের ফলে দেশীয় ফুল ও ফলচাষিরা ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং ফুল ও ফল চাষে উত্সাহিত হবে। এতে করে দেশের প্রান্তিক চাষিরা লাভবান হবেন এবং আমদানিনির্ভরতা কমবে। 

বাংলাদেশে প্রতি বছর ভোজ্য তেলের চাহিদা প্রায় ২০ লাখ টন। চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশ আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানি করতে হয়। অথচ রাইস ব্র্যান অয়েল কিংবা সরিষার তেলের উৎপাদন বাড়াতে পারলে এ নির্ভরতা ৫০ ভাগ কমিয়ে আনা সম্ভব। সে লক্ষ্যে ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে  সরকার। সরিষা চাষ ও রাইস ব্র্যান ওয়েলের কাঁচামাল ধানের তুষ বা কুঁড়া এগুলো সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আসে। তবে দেশীয় হলেও এর উৎপাদন খরচ অনেক বেশি। ফলে বাজারে এর দাম সয়াবিনের তুলনায় বেশি। এ কারণে রাইস ব্র্যান অয়েল এখনো জনপ্রিয়তা পায়নি। দাম বেশি হওয়ায় অনেক উৎপাদক প্রতিষ্ঠান তা রপ্তানির দিকে ঝুঁকছে। তাই এই তেলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে এবং উৎপাদন খরচ কমাতে সরকার উদ্যোগ নিতে পারে।

আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব উৎপাদনের মাধ্যমে চাহিদা মেটানো ও রপ্তানিযোগ্য পণ্য উৎপাদন এবং বিশ্বে নতুন নতুন বাজার তৈরির বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করা উচিত। এছাড়া শুধু গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানির ওপর নির্ভর না করে সম্ভাবনাময় আরো বড় বড় রপ্তানির খাত তৈরি করতে হবে। রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে রপ্তানিকে বহুমুখীকরণ করতে প্রয়োজনীয় শিল্প গড়ে তোলা এবং সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিতে হবে। রপ্তানি ক্ষমতা বাড়ানো ও আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে অধিক শিল্পায়ন এবং উৎপাদনের ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারও সম্প্রসারিত হবে, কর্মসংস্থানও বাড়বে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সরকার শিল্পায়নের কাজ শুরু করেছে। ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হচ্ছে। এভাবে অব্যাহত থাকলে দেশকে শিল্পনির্ভর দেশে পরিণত করা সম্ভব হবে।

আশার কথা হলো, বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম সংশোধন হচ্ছে। বিশ্ববাজারে ভোগ্যপণ্য ও শিল্পের কাঁচামালের দাম কমতে শুরু করেছে। দাম কমার এই তালিকায় আছে সয়াবিন তেল, পাম তেল, সয়াবিন বীজ, গমের মতো ভোগ্যপণ্য। আবার শিল্পের কাঁচামাল তুলা, পুরোনো লোহার টুকরো ও সারের দাম কমেছে। এটি একটি ইতিবাচক দিক। তবে প্রাকৃতিক গ্যাস ও জ্বালানি পণ্যের দাম সেভাবে সংশোধন করা হয়নি। জ্বালানি পণ্যের দাম ঘিরে সবকিছুর দাম ওঠানামা করে। তাই জ্বালানির দামে বড় ধরনের সংশোধন হলে স্বস্তিদায়ক অবস্থায় যেতে পারবে বাংলাদেশ। 

বাংলাদেশ প্রায় ২২৯ প্রজাতির পণ্য আমদানি করে সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে। আমদানি পণ্যের মধ্যে এক-পঞ্চমাংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী। এর মধ্যে সর্বোচ্চ আমদানি হয় চীন থেকে, মোট আমদানির ২৬ শতাংশের বেশি। তালিকায় এর পরেই রয়েছে ভারত, যে দেশটি থেকে মোট আমদানির প্রায় ১৫ শতাংশ আমদানি হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী জুলাই মাসে যে খাদ্যসামগ্রী আমদানি করা হয়েছে, তার শীর্ষ দশটি পণ্যের মধ্যে রয়েছে যথাক্রমে অপরিশোধিত চিনি, পাম তেল, সয়াবিন তেল, দুধ ও দুগ্ধজাতপণ্য, আদা, মরিচ, গম, চাল, মসুর ডাল এবং পেঁয়াজ। এছাড়া রসুন, চা, তেলবীজ এবং হলুদ রয়েছে শীর্ষ খাদ্যসামগ্রী আমদানির মধ্যে। সরকারের দেশীয় চাহিদা অনুযায়ী বছরের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয় না। ফলে প্রতিবছর দেশে উৎপাদনের পরেও চালের মতো আবশ্যিক খাদ্যশস্যের একটি অংশ আমদানি করতে হয়। পদ্মা সেতু, বঙ্গবন্ধু টানেল, মেট্রোরেলসহ বড় বড় প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলেছে। এসব প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আমদানিতে মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয় হচ্ছে। এ ছাড়া বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, খাদ্যসহ অন্যান্য পণ্যের দামও বেড়েছে। এসব কারণেই গত অর্থবছরে আমদানি খাতে খরচ প্রথম বারের মতো ৬৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

এক দশক আগেও দেশে বিলিয়ন ডলার বা শতকোটি মার্কিন ডলার খরচ করে আনা আমদানি পণ্য ছিল তিনটি। বছর ঘুরতেই এখন এই তালিকায় যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন পণ্য। তাতে গত অর্থবছর শেষে এই তালিকায় আমদানি পণ্যের সংখ্যা বেড়ে ১০টিতে উন্নীত হয়েছে। যুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় আছে আরো চার-পাঁচটি। এই ১০ পণ্যের বেশির ভাগই শিল্পের কাঁচামাল। এক দশক আগে তালিকায় ছিল তুলা, ডিজেল ও পুরোনো জাহাজ। এক দশকের ব্যবধানে এই তালিকায় নতুন যুক্ত হয়েছে সিমেন্টশিল্পের কাঁচামাল ক্লিংকার, ইস্পাতশিল্পের কাঁচামাল স্ক্র্যাপ ও পুরোনো জাহাজ, প্রাণিখাদ্যশিল্পের কাঁচামাল সয়াবিন বীজ, খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পের কাঁচামাল গম ও অশোধিত পাম তেল। এ ছাড়া রয়েছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, ডিজেল ওফার্নেস অয়েল।

আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ হলো গেল অর্থবছরে পুরোটা সময় ধরে বৈশ্বিক বাজারে পণ্য ও শিল্পের কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি। তবে বৈশ্বিক অর্থনীতি মন্দার দিকে যাওয়ায় দেশে চাহিদা কমছে। আবার অনেক পণ্যের উৎপাদনও বাড়ছে। তাতে গত মে-জুন মাস থেকে বিশ্ববাজারে শিল্পের কাঁচামাল ও পণ্যের দাম কমতে শুরু করেছে। জাহাজভাড়াও কমেছে। এতে ভবিষ্যতে আমদানি ব্যয় কিছুটা কমতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে। 

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ অন্যতম একটি বৃহৎ মার্কেট। কারণ আমাদের দেশের জনসংখ্যা বেশি। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো যাতে বাংলাদেশে তাদের কারখানা স্থাপনে আগ্রহী হয় সে লক্ষ্যে সরকার নানা ধরনের প্রণোদনা দিচ্ছে। এটিকে কাজে লাগিয়ে এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিকল্পিতভাবে রপ্তানিমুখী শিল্পায়নের দিকে নিবিড় দৃষ্টি দিতে হবে। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব উৎপাদন বাড়াতে হবে। তাহলেই বাংলাদেশকে উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

লেখক : ট্রেজারার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক চেয়ারম্যান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন