শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ধনীরা কি ‘মারিয়ানা ট্রেঞ্চ’?

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২৩, ০২:৩০

একটি প্রবাদ আছে, পৃথিবী হইতে অমঙ্গলকে উড়াইয়া দিয়ো না, উহা মঙ্গল-সমেত উড়িয়া যাইবে। অর্থাৎ মঙ্গল ও অমঙ্গল পরস্পরের সহিত একাকার হইয়া মিশিয়া থাকে। সত্তর-আশির দশকের একটি কার্টুন সাধারণ মানুষের মধ্যে খুবই জনপ্রিয় ছিল—ইয়া লম্বা মোটাতাজা এক ধনকুবের তাহার বিশাল বপু লইয়া মুরগির বড় ঠ্যাং গ্রোগ্রাসে খাইতেছেন। তাহার চারিদিকে পড়িয়া রহিয়াছে সদ্য খাওয়া হাড়ের টুকরা। আর ঠিক ঐ ধনকুবেরের পায়ের সন্নিকটে অপুষ্টিতে ভোগা লিলিপুটের ন্যায় ছোট্ট একটি ভুখা-নাঙ্গা গরিব ব্যক্তি হাত পাতিয়া দাঁড়াইয়া রহিয়াছে। আহা! এই হইল ধনী-গরিবের সরলীকরণ চিত্র। ইহার অন্তর্গত পরিপূরক বিষয়টি বিশ্লেষণের পূর্বে আমরা সম্প্রতি প্রকাশিত অক্সফামের একটি সম্পূরক প্রতিবেদনের দিকে দৃষ্টি দিতে পারি।

অক্সফামের ‘সারভাইভ্যাল অব দ্য রিচেস্ট’ প্রতিবেদনের আলোকে গত সোমবার সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে বলা হয়—বিশ্বে চরম ধনী ও দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ইহার পাশাপাশি ক্রমাগত বাড়িতেছে। ১০ বছরে বিশ্বে বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা দ্বিগুণ হইয়াছে। প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, গত দুই বছরে নূতন অর্জিত ৪২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্পদের মধ্যে ২৬ ট্রিলিয়ন (৬৩ শতাংশ) ১ শতাংশ ধনীর হাতে এবং ১৬ ট্রিলিয়ন (৩৭ শতাংশ) অবশিষ্ট ৯৯ শতাংশ জনগোষ্ঠীর হাতে উঠিয়াছে। ইহা ছাড়া কোটিপতিদের আয় প্রতিদিন গড়ে ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার করিয়া বাড়িতেছে। অপর দিকে বিশ্বের জনসংখ্যার নিচের দিকে থাকা ৯৯ শতাংশ মানুষ যাহা পাইয়াছে, ইহার প্রায় দ্বিগুণ সম্পদ ১ শতাংশ ধনীর পকেটে ঢুকিয়াছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, একই সময়ে বিভিন্ন দেশের ১৭০ কোটি শ্রমিক চরম মুদ্রাস্ফীতির শিকার এবং ৮২ কোটি মানুষ অনাহারে দিন কাটাইতেছেন। অক্সফাম জানাইতেছে যে, গড়ে বিশ্বের ৬৩ শতাংশ সম্পদ ১ শতাংশ ধনীর হাতে থাকিলেও ভারতে এই হার ৪১ শতাংশ। যদিও অক্সফাম ইন্ডিয়ার সিইও জানাইয়াছেন, ভারতের দরিদ্র মানুষ আর্থিক বৈষম্যের হার বৃদ্ধি পাইয়াছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে প্রায় ২৫ শতাংশ সম্পদ ১ শতাংশ ধনীর হাতে রহিয়াছে বলিয়া অন্য একটি প্রতিবেদনে উঠিয়া আসিয়াছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বলা হইয়াছে যে, ২০২১ সালে বাংলাদেশের শীর্ষ ১ শতাংশ ধনীর নিট আয় বৃদ্ধি পায় নাই। ২০২০ সালে তাহাদের হাতে থাকা সম্পদের পরিমাণ মোট জাতীয় সম্পদের ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ, ২০২১ সালেও যাহা একই ছিল। এই তথ্য উঠিয়া আসিয়াছিল প্যারিস স্কুল অব ইকোনমিকসের বৈশ্বিক অসমতা প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, গত ২০ বছরে বাংলাদেশের শীর্ষ ধনীদের সম্পদ ও আয়ের অনুপাত কিছুটা কমিয়াছে। আবার একই সময়ে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বৃদ্ধি পাইয়াছে প্রায় সাড়ে সাত গুণ।

ধনী-দরিদ্রের এই বৈষম্যের বিষয়টি বিশ্বের সবচাইতে জটিল সমস্যা। বলা যায়, ইহার জন্য বিশ্ব একসময় ভাগ হইয়া গিয়াছিল সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদে। উহার রেশ এখনো সম্পূর্ণ ফুরায় নাই। এরর অ্যান্ড চেকের মাধ্যমে বিশ্ব ক্রমশ মুক্তবাজার অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হইয়াছে। ইহা সত্য যে, সমগ্র পৃথিবীর তিন ভাগ পানি যদি প্রশান্ত মহাসাগরের সুগভীর খাদ ‘মারিয়ানা ট্রেঞ্চ’-এ আরও প্রশস্ত হইয়া সেইখানে আটকাইয়া থাকিত, তাহা হইলে বাকি পৃথিবীর বৃহৎ অংশ মরুভূমি হইয়া যাইত। অর্থাৎ চরম বৈষম্য বা কনট্রাস্ট কখনো ভালো কিছু নহে; কিন্তু ধনী মাত্রই তো ‘মারিয়ানা ট্রেঞ্চ’ নহে। বরং বিশ্বের অধিকাংশ ধনীরাই বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিপুল কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা করিয়া থাকে। ধনীরা যে চিরকাল মুনাফাই করেন তাহা নহে, তাহাদের চৌকশ কর্মীদের মাধ্যমেই ব্যবসা প্রসারিত করেন, আবার ভুল ব্যবস্থাপনা বা দুর্বল কর্মীদের মাধ্যমে ক্ষতিরও শিকার হন। বলা যায়, তাহারা পরিপূরক। মনে রাখিতে হইবে, মহান সৃষ্টিকর্তা ব্যবসাকে হালাল করিয়াছেন। সুতরাং সকল কিছু সাদা চোখে সরলীকরণ করিলে নেপথ্যের ইতিবাচক সত্যও চাপা পড়িয়া যায়।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন