রোববার, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২১ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

সর্বক্ষেত্রে মিতভাষের প্রয়োজন

আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২৩, ০০:৩০

কাহলিল জিবরান বলিয়াছিলেন, ‘আমি অতি কথা বলা মানুষের নিকট নীরব থাকা শিখিয়াছি। অসহিষ্ণু মানুষের নিকট সহিষ্ণুতা শিখিয়াছি, নির্দয় মানুষের নিকট হইতে দয়া শিখিয়াছি। আমি তাহাদের কাছে কৃতজ্ঞ।’ কিন্তু কাহলিল জিবরানের মতো সকলে এই শিক্ষা গ্রহণ করে না। বরং অতি কথকের নিকট হইতে আরো অধিক বলা, অসহিষ্ণুকে দেখিয়া আরো অসহিষ্ণু হওয়া এবং নির্দয়ের নিকট হইতে অধিক নির্দয়তা শিখিতে দেখা যায়। সর্বক্ষেত্রে আমরা অভিযোগ পালটা অভিযোগ এবং বাগ্যুদ্ধের যে চিত্র দেখিতে পাই, তাহা এই নেতিবাচক চর্চারই প্রতিফলন। 

কথা সংক্ষেপে এবং যুক্তির সঙ্গে বলাই উত্তম। সংযম ও সহিষ্ণুতা শুধু মুখের কথায় নহে, চর্চাতেও রাখিলে তাবৎ দুনিয়ার বিদ্যমান সমস্যা বহুলাংশে দূর হইয়া যাইতে পারে। প্রতিটি মানুষের মনে রাখা দরকার যে, যাহা করিবেন, যাহা বলিবেন তাহার পিছনে যুক্তি থাকিতে হইবে, তাহা হইলেই কথার বা কাজের ভার তৈরি হইতে পারে। যেই কথার সারমর্ম নাই, যেই কথার কার্যকরণ নাই তাহা শুনিলে মানুষের কেবল হাসির উদ্রেক করে। আমরা সকলেই জানি, ভালো কথা বলা যত সহজ, পালন করা তত সহজ নহে। যাহা কেহ নিজে না করিতে পারে, তাহাও অন্যকে পালন করিতে বলা সমীচীন নহে। ইহা লইয়া প্রাসঙ্গিক ইসলামের একটি ঘটনার কথা অনেকেরই জানা আছে। একবার রসুলে আকরামের নিকট একজন লোক আসিয়া বলিলেন, হুজুর, আমার সন্তান প্রচুর মিষ্টি খাইয়া থাকে। আপনি নিষেধ করিলে সে আর মিষ্টি খাইবে না। নবিয়ে করিম তাহাকে সাত দিন পরে আসিতে বলিলেন। এই সাত দিনে তিনি মিষ্টি না খাওয়ার অভ্যাস রপ্ত করিলেন এবং তাহার পরেই কেবল ছেলেটিকে মিষ্টি খাইতে নিষেধ করিলেন। হইতে পারে বিষয়টি রূপক। কিন্তু এই কাহিনির একটি বিশেষ তাৎপর্য রহিয়াছে, বিশেষ বার্তা রহিয়াছে : তুমি নিজে যাহা করো তাহা অন্য কেহ করিলে তাহাকে নিষেধ করিতে পারো না এবং তুমি নিজে যাহা পারো না তাহাও অন্যের নিকট হইতে আশা করিতে পারো না। ইহা মোনাফেকিরই সমার্থক। আর পবিত্র কোরআনের সুরা নিসার ১৪৫ নম্বর আয়াতে বলা হইয়াছে, ‘নিশ্চয়ই মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্ব নিম্নস্তরে অবস্থান করিবে, আর আপনি তাহাদের সাহায্যকারী হিসাবে কখনো পাইবেন না।’ আবার সুরা তওবার ৭৩ নম্বর আয়াতে বলা হইয়াছে, ‘হে নবি, কাফির ও মুনাফিক উভয়ের বিরুদ্ধে পূর্ণ শক্তিতে জিহাদ করো এবং তাহাদের ব্যাপারে কঠোর নীতি অবলম্বন করো। শেষ পর্যন্ত তাহাদের পরিণতি জাহান্নাম, আর তাহা অত্যন্ত নিকৃষ্ট স্থান।’ 

আমরা ইহাও লক্ষ করি, সকলেই অন্যকে উপদেশ দিলেও নিজে তাহা পালন করেন না। নিজে কোনো কর্তব্য পালন না করিয়া অন্যকে তাহা করিতে উপদেশ দেওয়ার মতো চরম ধৃষ্টতা আর কিছু নাই। দুঃখের বিষয় সমাজের সর্বস্তরেই আমরা ইহা প্রকট আকারে দেখিতেছি। যাহারা উপদেশ দিয়া যাইতেছেন তাহারা যদি নিজেদের বক্তব্য রেকর্ড করিয়া শোনেন, তাহা হইলেই বুঝিতে পারিবেন—তাহা কেমন শুনা যায়। রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরি করিয়াও কেহ কেহ অন্যদের উপদেশ দিয়া থাকেন। আমরা গায়ে পড়িয়াও মিথ্যা কথা বলিতে শুনি, যাহা প্রায়শই অপ্রয়োজনেও বলা হইয়া থাকে। ভালো কথা বলিয়া তাহা নিজের ব্যক্তিগত জীবনে চর্চা না করিলে উহা কি অর্থহীন হইয়া পড়ে না? শুধু অর্থহীনই হয় না, বরং মানুষ ভিতরে ভিতরে হাসে। এই জন্যই আমরা মানুষের মধ্যে দায়িত্বশীলদের প্রতি আস্থাহীনতা দেখিয়া থাকি। এই সকল কারণেই সমাজজীবনে আমরা অসংযম ও অসহিষ্ণুতার সম্মুখীন। এই যে দলে দলে সংঘর্ষ, মানুষ মানুষের প্রতি বৈরী—ইহার কারণও নিহিত রহিয়াছে এই সকল দুর্বলতার মধ্যে।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন