শনিবার, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২১ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বারংবার নির্বাচনি আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ কি ন্যায়সংগত?

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২৩, ০০:৩০

চলতি বৎসরের শেষে বা জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে আগামী জাতীয় নির্বাচনের ভোটগ্রহণ করিবার পরিকল্পনা গ্রহণ করিয়াছে নির্বাচন কমিশন। ইহাকে কেন্দ্র করিয়া এখন যাবতীয় প্রস্তুতিমূলক কাজ চলিতেছে। এই সময় রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা, প্রয়োজনীয় আইন সংশোধনসহ নির্বাচনের পূর্বে নির্বাচনি এলাকার আসনবিন্যাসও করা হইয়া থাকে। জাতীয় সংসদের নির্বাচনি এলাকার সীমানা আইন, ২০২১-এ বলা হইয়াছে যে, সংবিধানের ৬৫(২) অনুচ্ছেদে উল্লিখিতসংখ্যক সংসদ সদস্য নির্বাচিত করিতে সমগ্র দেশকে উক্তসংখ্যক একক আঞ্চলিক নির্বাচনি এলাকায় ভাগ করা হইবে। এই ক্ষেত্রে ভৌগোলিক অখণ্ডতা বজায় রাখা এবং আদমশুমারির ভিত্তিতে যতদূর সম্ভব বাস্তবভিত্তিক বণ্টনের কথা বলা হইয়াছে। এইখানে ভৌগোলিক অখণ্ডতা বজায় রাখা তথা প্রশাসনিক সীমানাকে অক্ষুণ্ন রাখিবার ব্যাপারে প্রথমেই গুরুত্বারোপ করা হইয়াছে; কিন্তু আমরা অতীতে দেখিয়াছি, নির্বাচনি এলাকার সীমানাবিন্যাসের নামে তৈরি করা হইয়াছে বিশৃঙ্খলা। বিশেষ করিয়া সামরিক শাসনামলে যেইভাবে সংবিধানকে কাটাছিঁড়া করা হইয়াছে, সেই একইভাবে সংসদীয় আসনের সীমানাও ছিন্নভিন্ন করিয়া প্রার্থী ও ভোটারদের বিরাগভাজনের পরিবেশ তৈরি করা হইয়াছে। এমনও দেখা গিয়াছে, এই পরিবর্তন করা হইয়াছে উদ্দেশ্যমূলকভাবে এবং হেভিওয়েট প্রার্থীদের বেলায় একই নীতি অবলম্বন করা হয় নাই। এমন বৈষম্যও যাহাতে কখনো না হয়, সেই দিকেও নির্বাচন কমিশনকে সজাগ ও সতর্ক থাকিতে হইবে।

এইবারের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহল এখন হইতেই নির্বাচন কমিশনের প্রতিটি পদক্ষেপের প্রতি তীক্ষ্ন দৃষ্টি রাখিতেছেন। এই জন্য সীমানা পুনর্বিন্যাসের নামে এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা যাইবে না, যাহা লইয়া দেশে-বিদেশে বিতর্ক তৈরি হয়। বর্তমান নির্বাচন কমিশন এই বৎসরের মে মাসের মধ্যে সীমানা পুনর্নির্ধারণের কাজ শেষ করিয়া তাহার খসড়া ওয়েবসাইটে প্রকাশ করিবার লক্ষ্যকে সম্মুখে রাখিয়া অগ্রসর হইতেছে। সীমানাসংক্রান্ত আবেদনগুলি আমলে লইয়া তাহারা ইতিমধ্যে কাজ শুরু করিয়াছেন। কেননা এইখানে ভোটকেন্দ্র চূড়ান্ত করিবার বিষয়টিও জড়িত; কিন্তু এইখানে একটি সমস্যা হইল, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) নির্বাচন কমিশনকে গত বৎসর অনুষ্ঠিত আদমশুমারির একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রদান করিয়াছে মাত্র। চূড়ান্ত জনশুমারির প্রতিবেদন প্রকাশিত হইতে পারে ২০২৪ সালের জুন নাগাদ। সুতরাং জনশুমারির চূড়ান্ত প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করিয়া বসিয়া থাকিবার কোনো অবকাশ নাই। এইখানে ছোটখাটো পরিবর্তন ব্যতীত বড় ধরনের কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে বলিয়াও প্রতীয়মান হয় না। কেননা নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস পূর্বে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন করা হইলে তাহা প্রার্থীদের প্রতি অবিচার করা হইবে। দেখা গেল, কোনো প্রার্থী কয়েক বৎসর ধরিয়া পূর্বের সীমানাকে হিসাবে লইয়া জনকল্যাণে নিরন্তর কাজ করিয়া চলিয়াছেন। এখন হঠাৎ করিয়া সীমানা পরিবর্তনের কারণে নূতন এলাকার ভোটারগণ কি সেই প্রার্থীকে ঠিকমতো চিনিতে পারিবেন? ইহাতে তাহার জন্য বরং এক বিব্রতকর পরিস্থিতির তৈরি হইবে।

উপর্যুক্ত কারণে আমরা মনে করি, নির্বাচনি এলাকার আসনবিন্যাসের কাজটি পূর্বাহ্নেই করা প্রয়োজন। আরো স্পষ্ট করিয়া বলিলে নির্বাচনের বৎসরে নহে, বরং তাহারও কয়েক বৎসর পূর্বে সম্পন্ন করা দরকার। ইহাতে প্রার্থীরা পুরা মেয়াদকাল তথা পাঁচ বৎসর ধরিয়াই পরিকল্পনামাফিক নিজেদের আসনে জনকল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ হইয়া কাজ করিতে পারিবেন। আবার প্রতিবারই যে সীমানা পরিবর্তন করিতে হইবে তাহাও সঠিক নহে। একটি নির্বাচনি আসনে ভোটারসংখ্যা বাড়িলে সমস্যা কোথায়? বাড়িলে কমবেশি সর্বত্রই বাড়িবে। সংসদীয় আসনের সীমানা বিন্যাসের ক্ষেত্রে জনসংখ্যার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হইল ৫ হইতে ৩০ শতাংশ পার্থক্য। ৩০ শতাংশের অধিক পার্থক্য না হইলে সীমানা পুনর্নির্ধারণে হাত দেওয়ার কোনো আবশ্যকতা আছে বলিয়া মনে হয় না। 

বারংবার নির্বাচনি সীমানা লইয়া টানাহ্যাঁচড়া করা হইলে জনকল্যাণমূলক কাজেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়। আমাদের দুর্ভাগ্য হইল, যাহারা জীবনে কখনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন নাই, তাহাদেরই ইহা লইয়া অধিক উচ্চবাচ্য করিতে দেখা যায়। অসামঞ্জস্য ও বৈষম্যের কারণেও অনেকে ক্ষতির শিকার হন। অতএব, নির্বাচনি আসন পুনর্বিন্যাসের পূর্বে এই বিষয়গুলি লইয়া অবশ্যই চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন