বৃহস্পতিবার, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৬ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

যুক্তরাজ্যের সঙ্গে উত্তেজনা কি ইরানের পরমাণু চুক্তিতে প্রভাব ফেলবে?

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২৩, ০২:৩১

যুক্তরাজ্য ও ইরানের মধ্যে চরম উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের এমন উত্তেজনা দেখে অভ্যস্ত বিশ্ব। এখন ইরানের পররাষ্ট্রনীতি ও অভ্যন্তরীণ কৌশলের গলদগুলো সামনে আনছে যুক্তরাজ্য।
  
উত্তেজনার কারণ ইরানের সাবেক উপপ্রতিরক্ষা মন্ত্রী আলীরেজা আকবরীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাটি। তার মৃত্যুদণ্ড রদে জোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়েছিল যুক্তরাজ্য। কিন্তু উদ্দেশ্য হাসিল হয়নি। যুক্তরাজ্যে আলীরেজার দ্বৈত নাগরিকত্ব ছিল।
 
ইরানের দাবি, আলীরেজা একজন সুপার স্পাই। যিনি যুক্তরাজ্যের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করতেন, জড়িত ইরানের গোপনীয় তথ্যফাঁসের সঙ্গে। দেশটির খ্যাতনামা একজন পরমাণুবিজ্ঞানী হত্যায় তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন। 

মৃত্যুদণ্ড এমন এক সময়ে কার্যকর  হলো, যখন ইরান দেশের ভেতর মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে ড্রোনসহ অস্ত্র সরবরাহ করছে। এ ব্যাপারে পশ্চিমাদেশগুলোর অবরোধসহ তীব্র সমালোচনার মধ্যে রয়েছে ইরান।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, যুক্তরাজ্যের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার কারণে কি ইরানের সঙ্গে পশ্চিমাদের পরমাণু চুক্তি আলোচনা ব্যাহত হবে? যদি ব্যাহত না-ও হয়, যুক্তরাজ্য কি চুক্তিতে রাখার জন্য ইরানকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়ে যাবে? পরমাণু আলোচনা ফলপ্রসূ করতে যুক্তরাজ্যকে প্রধান ভূমিকা পালন করতে দেখা গিয়েছিল। এর ধারাবাহিকতা থাকবে তো?

আলীরেজা ইস্যুতে যুক্তরাজ্য প্রথমে মনে করেছিল কয়েক দিন হম্বিতম্বি করে, ভয়ভীতি দেখিয়ে একপর্যায়ে তাকে ছেড়ে দেবে ইরান। যুক্তরাজ্যে থাকা আলীরেজার পরিবারসহ দেশের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে তার মুক্তির দাবি জানানো হয়েছিল। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্সসহ পশ্চিমাদেশগুলোর আহ্বান ছিল। কিন্তু ইরান সিদ্ধান্তে ছিল অটল। কারো অনুরোধ শোনেনি। উলটো এমন বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে, আমাদের ঘরের বিষয়, আমাদেরই সামলাতে দাও। নাক গলাতে এসো না এদিকে।

ইরানের কর্মকাণ্ডে দেশটিকে আত্মবিশ্বাসী মনে হচ্ছে। তাদের রহস্যময় পরমাণু কর্মসূচিকে তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করতে দেখা যাচ্ছে। এ কারণে হয়তো যুক্তরাজ্যের অনুরোধ ও হুমকি ধর্তব্যের মধ্যে আনেনি দেশটি। 
 
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি যারা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন তাদের মতে, ইরানে ক্ষমতাসীনদের একটি প্রভাবশালী অংশ পরমাণু চুক্তির ব্যাপারে সবুজ সংকেত দিয়েছে। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বাইডেন প্রশাসনও এ বিষয়টি আর ঝুলিয়ে রাখতে চাইছে না। যে কোনো মূল্যে চুক্তি করে ইরানকে পরমাণু কর্মসূচি থেকে বিরত রাখার চেষ্টা চলছে। এ ক্ষেত্রে ইরানের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাশিয়াকে অস্ত্র সরবরাহ দেওয়ার মতো চরম অভিযোগও প্রয়োজনে এড়িয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। 

পরমাণু আলোচনায় ইরানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যস্থতাকারীর অভিমত হচ্ছে, এই মুহূর্তে ইরানকে পরমাণু কর্মসূচি থেকে বিরত রাখার বিষয়টি, ঐ দুই ইস্যু (মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাশিয়াকে অস্ত্র সরবরাহ) থেকে আলাদা রাখা উচিত। এ সিদ্ধান্ত উভয় সংকটের মধ্যে ফেলেছে পশ্চিমাদের। 

গত সেপ্টেম্বরে মাহ্শা আমিনির মৃত্যুর ঘটনায় ইরান জুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। এর পরপর বেশকিছু পদক্ষেপ নেয় যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব।  নৈতিক পুলিশের কর্মকর্তাসহ অনেকের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়। তাদের কারো কারো সম্পদও জব্দ হয়। নতুন করে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ইরানের বিরোধপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির প্রকাশ্য সমালোচনা করছেন দেশের সাবেক কূটনীতিকরা। কিন্তু এসবে ভ্রুক্ষেপ করছে না ডানপন্থি ইব্রাহিম রাইসি সরকার।

অন্যদিকে আরেকটি বিষয় জাতিসংঘসহ আমেরিকাকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে। তা হলো, পরমাণু বোমা বানানোর সক্ষমতার প্রায় কাছাকাছি চলে যাচ্ছে ইরান। এখনই শিয়া জনসংখ্যা অধ্যুষিত দেশটিকে থামাতে হবে। না হলে মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তনসহ গোটা বিশ্বে এর প্রভাব পড়বে। তাই যেভাবেই হোক, আলোচনার টেবিলে ইরানকে রাখার জোর তৎপরতা দেখা যাচ্ছে।

গত নভেম্বরে জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা নিশ্চিত করেছে, ইরানের ফোরডো প্ল্যান্টে সমৃদ্ধি করা ইউরেনিয়াম ৬০ শতাংশ পর্যন্ত শুদ্ধ। পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে গেলে ইউরেনিয়ামের শুদ্ধতার প্রয়োজন ৯০ শতাংশ। আন্তর্জাতিক পরমাণু কমিশনের প্রধান রাফায়েল গ্রসি সতর্ক করে বলেন, পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর চূড়ান্ত পর্যায় থেকে মাত্র একটি কারিগরি ধাপ পেছনে রয়েছে ইরান। 

দেশটির কাছে উন্নতমানের সর্বমোট ৩ হাজার ৬৭৩ কেজি ৭০০ গ্রাম ইউরেনিয়াম মজুদ আছে। এ হিসাব গত বছরের ২২ অক্টোবর পর্যন্ত। এই সমৃদ্ধিকরণ কর্মসূচি আরো বিস্তারের পরিকল্পনা রয়েছে ইরানের।  

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের কাছে যে পরিমাণ ৬০ শতাংশ গুণমানসম্পন্ন ইউরেনিয়াম রয়েছে, বোমা বানানোর প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু করলে,  তা দিয়ে অন্তত একটি পারমাণবিক বোমা বানানো যাবে। পশ্চিমা বিশ্ব চাইছে, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণ ৩.৬ শতাংশের মধ্যে রাখার জন্য। যা শুধুমাত্র বেসামরিক প্রয়োজনে ব্যবহার করা যাবে। 

পরমাণু চুক্তি কার্যকর হলে আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্বের জারি করা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হবে। ইরান তার বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি রপ্তানি করার অধিকার ফেরত পাবে। এখন দেশটিতে ক্রমাগত মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বিশ শতাংশ কমেছে। প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে পারছেন না নাগরিকরা। মানবাধিকারসহ অন্যান্য ইস্যুতে জনমনে অসন্তোষ বাড়ছে। মনে হচ্ছে, ইরান এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ চাইছে। 

পরমাণু চুক্তি চূড়ান্তে দুই-একটি বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে উভয় পক্ষকে। ইরানের বৈদেশিক সম্পর্ক বিভাগের স্টিয়ারিং কাউন্সিলের প্রধান কামাল খারাজি বলেন, পরমাণু চুক্তির ব্যাপারে ইরান ও পরমাণু শক্তি কমিশনের দূরত্ব যৎসামান্য। ২০১৯ সালে পরিদর্শনের সময় তিনটি কেন্দ্রে পাওয়া পরমাণুর বস্তুকণার উৎস ও এর সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেন, এই বিষয় ছাড়া চুক্তির ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অন্যান্য বিষয় সুরাহা হয়েছে।  

আলীরেজার ঘটনার পর যুক্তরাজ্য, ইরানের সঙ্গে কূটনীতিক সম্পর্ক রাখবে কি না, তা বিবেচনা করছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পরমাণু আলোচনায় সমর্থন দেবে কি না, তাও বিবেচনাধীন। দ্য হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের মার্গারেট থ্যাচার সেন্টার ফর ফ্রিডমের পরিচালক নাইল গার্ডিনার ফক্স নিউজ ডিজিটালকে বলেন, তেহরান এক ব্রিটিশ নাগরিককে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। তাদের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনায় যুক্ত হওয়ার কোনো মানে নেই। আমি মনে করি, আমরা ইরানের ব্যাপারে, যুক্তরাজ্যকে একটি দৃষ্টান্তমূলক কঠিন অবস্থানে দেখতে পাব।

ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এক আলোচনায় বিষয়টি তুলেছেন। যুক্তরাজ্য সম্ভবত পরমাণু আলোচনা থেকে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত দিয়েছে। ইরানের শাসকদের স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ড কোরকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে পারে যুক্তরাজ্য।


তবে যাই হোক না কেন, ইরানকে আলোচনায় রাখতে মরিয়া যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এর বিপরীতে যুক্তরাজ্যের জোর প্রচেষ্টাও অব্যাহত থাকবে বলে মনে হচ্ছে। আর ইরান কি অবরোধের কবল থেকে বেরিয়ে অর্থনৈতিক মুক্তির পথে হাঁটবে? নাকি পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র হওয়ার স্বপ্নে অটল থাকবে, উত্তরের জন্য অপেক্ষা রইল।

 

ইত্তেফাক/ইআ