রোববার, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২১ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বিরোধীপক্ষের নির্বাচনে আসিবার বাধা কি কাটিল?

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২৩, ০১:০৯

অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হইল—গতকাল সোমবার ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন তথা ইভিএম ক্রয়ের সিদ্ধান্ত বাতিল করিয়াছে সরকার। আগামী জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন (ইসি) গত বৎসরের অক্টোবরে ৮ হাজার ৭১১ কোটি ৪৪ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ২ লক্ষ ইভিএম ক্রয়ের পরিকল্পনা করিয়াছিল। কিন্তু গতকাল ইসি সচিব জানাইয়াছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ২ লক্ষ ইভিএম ক্রয়ের সিদ্ধান্ত বাতিল করিয়াছে সরকার। যদিও বলা হইতেছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ইভিএম ক্রয়ের পরিকল্পনা বাতিল করা হইয়াছে, তবে আগামী নির্বাচনের জন্য ইভিএমকে যদি সরকার অপরিহার্যই মনে করিত—তাহা হইলে নিশ্চয়ই ইভিএম ক্রয়ের সিদ্ধান্তটি হইতে সরিয়া আসিত না। কারণ রাষ্ট্রীয় কাজে রাষ্ট্রের নিকট এই অর্থ খুব বড় কিছু নহে। আমরা স্মরণ করিতে পারি, গত বৎসরের ৭ মে আওয়ামী লীগ সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলিয়াছিলেন, নির্বাচনে ৩০০ আসনে ইভিএম ব্যবহার করা হইবে। পরে নির্বাচন কমিশন সর্বোচ্চ ১৫০ আসনে ইভিএম ব্যবহার করিয়া পরবর্তী নির্বাচন করিবার প্রস্তাব দেয়। সেই অনুযায়ী গত অক্টোবরে ২ লক্ষ ইভিএম ক্রয়ের পরিকল্পনা করা হয়। তাহাই বাতিল হইল।

ইহা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই কারণে যে, ইভিএম লইয়া ব্যাপক ভীতি ও আপত্তি রহিয়াছে বিরোধীপক্ষের। তাহারা ইভিএমকে সরকারের ভোট কারচুপির ‘কলাকৌশল’ ও ‘ফন্দিফিকির’ বলিয়া মনে করেন। বিভিন্ন সময়ে তাহারা বলিয়াছেন যে, এই মেশিনে কারচুপি বা ফল পালটাইয়া দেওয়া সম্ভব। ইতিহাস বলে, ১৯৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম এই পদ্ধতি চালু হয়, যদিও বর্তমানে পৃথিবীর সিংহভাগ দেশে ইভিএম তথা ই-ভোটিং পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয় না। তবে ভারতে ইহার ব্যাপক প্রয়োগ রহিয়াছে। অবশ্য ভারতের ইভিএমের সহিত বাংলাদেশের ইভিএমের পার্থক্য রহিয়াছে। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ব্যবহৃত ইভিএমে ভোটার ভেরিয়েবল পেপার অডিট ট্রেইল বা ভিভিপিএটি নাই। এই ব্যবস্থায় একজন ভোটার ভোট দেওয়ার পর একটা প্রিন্ট করা স্লিপ বাহির হইয়া আসে—যাহাতে দেখা যায় ঐ ভোটার কোন প্রতীকে ভোট দিয়াছেন। কোনো কারণে ভোট পুনর্গণনার প্রয়োজন হইলে উহা সহায়ক ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশে প্রচলিত ইভিএমের মূলত তিনটি অংশ থাকে। ডেটা যাচাই করিবার যন্ত্র বা কন্ট্রোল ইউনিট, ব্যালট যন্ত্র ও মনিটর। ডেটা যাচাই যন্ত্রটি কাজ শুরু করিয়া থাকে দুইটি অ্যাকসেস কার্ডের মাধ্যমে। ইহার একটি থাকে প্রিজাইডিং কর্মকর্তার নিকট, অন্যটি সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তার কাছে। মেশিনটির একটি অংশে ভোটারের আঙুলের ছাপ দেওয়ার জায়গা রহিয়াছে। সেইখানে আঙুলের ছাপ দেওয়া হইলে ভোটারের পরিচয় নিশ্চিত হয়, এবং তিনি নির্দিষ্ট বোতাম টিপিয়া তাহার ভোটটি প্রদান করেন। ইতিপূর্বে যেই সকল কেন্দ্রে ইভিএমে ভোট নেওয়া হইয়াছে, সেইখানে ভোটদানের গতি যথেষ্ট মন্থর ছিল। আরেকটি বড় সমস্যা ছিল বয়স্ক, বিশেষ করিয়া নারী ভোটারদের আঙুলের ছাপ মিলিবার জটিলতা।

সুতরাং ইহা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে—আপাতত ২ লক্ষ ইভিএম ক্রয় বাতিল করা হইয়াছে, অর্থাৎ আগামী সাধারণ নির্বাচনে দেড় শতাধিক আসনে ইভিএমের মাধ্যমে ভোটগ্রহণের বিষয়টি স্থগিত হইয়াছে। যদিও নির্বাচন কমিশনের নিকট বর্তমানে প্রায় দেড় লক্ষ ইভিএম রহিয়াছে—যাহা দিয়া তাহারা সর্বমোট পাঁচ ভাগের এক ভাগ আসনে ভোট গ্রহণ করিতে পারিবে। তবে দুই লক্ষ ইভিএম ক্রয় বাতিল করিতে পারিলে সরকার চাহিলে বাকি আসনেও ইভিএম ব্যবহার ন্যূনতম করিতে পারে। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। আর প্রধান বিরোধীপক্ষের অংশগ্রহণ ব্যতিরেকে নির্বাচন পরিপূর্ণতাও পায় না। যেহেতু ইভিএমকে সরকারের ভোট কারচুপির ‘কলাকৌশল’ ও ‘ফন্দিফিকির’ বলিয়া বিরোধীপক্ষ মনে করেন, সুতরাং ২ লক্ষ ইভিএম ক্রয়াদেশ বাতিল করা হইয়াছে বিধায় বিরোধীপক্ষের দাবিই সরকার মানিয়া লইয়াছে—ইহা বলাই যায়। এই ক্ষেত্রে বিরোধীপক্ষ নির্বাচনে আসিবার পথের জটিলতা বহুলাংশে কাটিল। নির্বাচন ব্যতীত যেহেতু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার গঠনের বা পরিবর্তনের বিকল্প নাই—সুতরাং সকলের উপরে নির্বাচন সত্য। শেষ অর্থে আমাদের নির্বাচনের দিকেই আগাইতে হইবে।

 

 

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন