রোববার, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২১ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

আপাতত নাক ভাসাইয়া রাখা গিয়াছে

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২৩, ০২:৫৫

বিশ্বব্যাপী করোনাকালে এবং করোনা-পরবর্তী সময়ে যে অর্থনৈতিক দহন শুরু হইয়াছিল, তাহার গায়ে ঘৃত ঢালিয়া দিয়াছে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ। মুদ্রাস্ফীতি, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানে ব্যাপক অভাব, আমদানি-রপ্তানিতে চরম ঘাটতি বিশ্বব্যাপী এক নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হইয়া দাঁড়াইয়াছে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলিও রীতিমতো বিপাকে পড়িয়াছে। এই সময় বিভিন্ন দেশের সরকার পরিচালনায় দক্ষ ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা সর্বাধিক। সেই হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যাহার পর নাই চেষ্টা করিয়াছেন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য। সবচাইতে বড় কথা, তিনি জানিতেন যে এই সমস্যা রাতারাতি সমাধানের নহে। যেই অর্থনৈতিক ক্ষতি ইতিমধ্যেই হইয়াছে সেই ক্ষত সারিয়া উঠিতে সময় লাগিবে। তবু তাহার প্রচেষ্টায় উন্নয়নশীল অনেকগুলি দেশের তুলনায় বাংলাদেশ অপেক্ষাকৃত ভালো আছে। দেশের অর্থনীতি ডুবিয়া যায় নাই। অন্তত নাক জাগাইয়া রাখিতে পারিয়াছেন তিনি। তাহার প্রধান কারণ, তিনি পূর্বেই সতর্ক হইয়াছেন এবং দেশবাসীকেও বারংবার সতর্ক করিয়াছেন। ইহাই একজন দক্ষ ব্যবস্থাপকের উদাহরণ। ভবিষ্যতে কী হইবে, দেশকে কতটা অর্থনৈতিকভাবে শঙ্কামুক্ত করা যাইবে, বৈশ্বিক অর্থনীতিও বা কোথায় গিয়া দাঁড়াইবে তাহা এখন অনুমান করা খুবই কষ্টকর। কিন্তু এখন পর্যন্ত শত প্রতিবন্ধকতাতেও তিনি খানিকটা স্থির রাখিতে পারিয়াছেন। তাই তাহাকে উদ্দেশ্য করিয়া কবি জসীমউদ্দীনের সেই বিখ্যাত গানের কলি বলিতে হয়, ‘মাঝি বাইয়া যাও রে/ অকুল দরিয়ার মাঝে/ আমার ভাঙা নাও রে।’ যদিও ‘মাঝি’র জন্য কাজটি মোটেই সহজ নহে।

কিন্তু সেই সঙ্গে ইহাও বলিয়া উচিত, তাহাকে আমাদের নিকট একা বলিয়া মনে হয়। কবি শামসুর রাহমানকে ড. হুমায়ুন আজাদ আখ্যায়িত করিয়াছিলেন ‘নিঃসঙ্গ শেরপা’। ইহার ভাবার্থ হইল, যিনি একা পাহাড় বাহিয়া উঠিতেছেন, যাহার কোনো সঙ্গী নাই, সারথি নাই। সেই অর্থে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী একজন নিঃসঙ্গ শেরপা। তাহার নিজের ইমেজ পরিষ্কার হইলেও দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের অনেক কৃতকর্মের কারণে দুর্নামের দায়ভার লইতে হয়। নিশ্চয়ই বিষয়টি সম্পর্কে সরকার আমাদের চাইতে অধিক অবগত আছে। এতত্সত্ত্বেও দলের অভ্যন্তরে এই সকল অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের তাগিদ না থাকায় দল ও প্রশাসন উভয় ক্ষেত্রেই অনুপ্রবেশকারীরা শক্তিশালী অবস্থান হইতে পরাক্রমশালীতে পরিণত হইতেছে। মনে রাখিতে হইবে, যাহারা দলের জন্য দুর্নাম কুড়াইয়া আনিতেছেন তাহারা দলের জন্য অশুভ। প্রশাসনেও একই রকম চিত্র লক্ষ করা যায় রাজনীতির ময়দানের মতোই। ইহা কঠিন এক সত্য যে, প্রশাসন ও দলে সৎ, নিষ্ঠাবান ও আদর্শে বিশ্বাসীগণ হাল ছাড়িয়া দিতেছেন। কারণ চোখের সম্মুখেই তাহারা স্বাধীনতাবিরোধীদের আস্ফাালন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাইতে দেখিতেছেন এবং নিজেদের গুরুত্ব হারাইতে দেখিতেছেন। এমনিতেই পৃথিবী যেই দিকে যাইতেছে, অর্থনীতি ও সার্বিক পরিস্থিতির যে অধোগতি, তাহাতে আগামী দিনগুলিতে যদি কোনো দুর্যোগ ঘনীভূত হইয়া ওঠে, তাহা হইলে আশ্চর্য হইবার কিছু থাকিবে না। তবে ইহা নিশ্চিত করিয়াই বলিয়া দেওয়া যায় যে, এই সকল দলের অভ্যন্তরে থাকা কোনো বিপদ আসিলে আর সেই মোকাবিলা প্রতিরোধের মাঠে থাকিবে না। সন্তর্পণে উধাও হইয়া যাইবে। নূতন খোলস ধারণ করিবে। সুতরাং অপশক্তিগুলি চিহ্নিত করিয়া এখনই এই সকল অপশক্তির গতি রোধ করিতে চেষ্টা করিলে আগামী দিনে খানিকটা হইলেও উপশম হিসাবে তাহা কাজ করিতে পারে।

এই সময় প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ হইয়া প্রধান নির্বাহীর হাতকে শক্তিশালী করিয়া তোলা, দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখিতে ব্যক্তিস্বার্থ ভুলিয়া দেশ ও দলের স্বার্থে কাজ করা। কিন্তু সেই মানুষের অভাব যে প্রধান নির্বাহীর রহিয়াছে তাহাতে সন্দেহ নাই। তাই এখনই সঠিক পথে সংগঠিত করা না গেলে ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতি হুমকির মধ্যে পড়িতে পারে।

 

 

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন