বৃহস্পতিবার, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৬ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

খন্দকার মাহবুব হোসেনের স্মৃতি 

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২৩, ০০:২০

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেনের নাম সর্বজনবিদিত। তিনি একজন স্বনামখ্যাত আইনজ্ঞ তো বটেই, একই সঙ্গে ছিলেন একজন রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবক। তিনি অর্ধশতাব্দীর অধিককাল ধরে আইন অঙ্গনে বিচরণ করেছেন। আইনজীবী হিসেবে অসংখ্য ফৌজদারি মামলা পরিচালনা করেছেন ও আইনের সুচিন্তিত ব্যাখ্যা দিয়ে বিচারকদের সঠিক রায় দিতে সহায়তা করেছেন।

সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের চার বার সভাপতি এবং বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের দুই বারের নির্বাচিত সহসভাপতি ছিলেন। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে তার জানাজায় বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী যথার্থই বলেছেন—‘আইন অঙ্গনের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র খসে পড়ল’। 

তিনি বরগুনা জেলার বামনা উপজেলায় খন্দকার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার সঙ্গে আমার পরিচয় প্রায় ৪৫ বছর পূর্বে, সেই ১৯৭৮-৭৯ সালে। এই দীর্ঘ সময়ে তার সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি। তখন তার চেম্বার ছিল ঢাকার মতিঝিলের মধুমিতা সিনেমা হলের তিনতলায়। সন্ধ্যার পর তার জুনিয়র আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের ভিড়ে স্থানটি থাকত মুখরিত। ১৯৭৫-১৯৭৬ সালের দিকে ঢাকার ওয়ারীতে প্রতিষ্ঠা করেন বিএনএসবি ঢাকা চক্ষু হাসপাতাল। আমি ১৯৮০ সালে তার প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালে যোগদান করি। এরপর থেকেই তার সঙ্গে সরাসরি কাজ করার এবং কাছ থেকে দেখার ও জানার সৌভাগ্য হয়েছে।    

তিনি সত্তর দশকের প্রথম দিকে দেশের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কল্যাণে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে প্রয়াত আইভি রহমানকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সমিতি—বিএনএসবি। তারপর থেকে (১৯৭৬-১৯৮২ ছাড়া) আমৃত্যু তিনি এর চেয়ারম্যান ছিলেন। আইভি রহমানও আমৃত্যু (২০০৪) এর সাধারণ সম্পাদিকা ছিলেন।

সমিতির অফিসে যখনই আসতেন—দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের দেখলে মাথায় হাত বুলিয়ে জিগ্যেস করতেন—কেমন আছ? তারাও ওনার কণ্ঠ শুনে বলতেন—মাহবুব স্যার? আপনি কেমন আছেন স্যার। 

তার প্রাণপ্রিয় এই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ঢাকার মিরপুরে সমিতির নিজস্ব জমিতে অবস্থিত। অভিজ্ঞ চিকিত্সকমণ্ডলী ও অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে স্বল্পখরচে হাসপাতালটি অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে চক্ষু রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে চলেছে। এই হাসপাতালই ছিল তার ধ্যান-জ্ঞান। প্রতি শনিবার হাসপাতালে আসতেন। সময় পেলে অন্য সময়ও আসতেন। আমাদের দিকনির্দেশনা দিতেন। তাছাড়া সকাল-দুপুর-রাত—যখনই টেলিফোন করতাম ফোন ধরতেন। পেশাগত বা পারিবারিক কাজের চেয়েও হাসপাতালের কাজকে অগ্রাধিকার দিতেন। তার এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ হাসপাতালের নামকরণ করা হয় খন্দকার মাহবুব হোসেন চক্ষু হাসপাতাল।

তিনি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও পঙ্গুদের হাতে-কলমে কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার জন্য প্রতিষ্ঠা করেন ঢাকার মিরপুরে ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার ফর দ্য ব্লাইন্ড—ভিটিসিবি। গাছ খুব ভালোবাসতেন। সময় পেলে ঢাকার বিভিন্ন নার্সারিতে ঘুরে বেড়াতেন। ফুলের চারা কিনে চৌধুরীপাড়ার বা বসুন্ধরার বাসায় অথবা নন্দীপাড়ার বাগানবাড়িতে লাগাতেন বা কোনো ঘনিষ্ঠজনের বাসায় পাঠাতেন। মানুষকে সেবা করাই যেন তার ছিল প্রধান ব্রত। বিভিন্ন জনকে আর্থিক সহায়তা, চাকরি, চিকিৎসার ব্যবস্থা নতুবা সদুপদেশ দিতেন।  

তিনি গ্রামগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অভিজ্ঞ সার্জনসহ মেডিক্যাল টিম নিয়ে ভ্রাম্যমাণ চক্ষুশিবিরের মাধ্যমে দরিদ্র রোগীদের চক্ষু অপারেশনের ব্যবস্থা করেছেন। আমাকে সঙ্গে নিয়ে প্রায়শই বিভিন্ন চক্ষুশিবির উদ্বোধনের জন্য যেতেন। একবার বাংলাদেশ সফররত পশ্চিম জামার্নির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মি. ওয়াইজ সেকারকে নিয়ে মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী চক্ষুশিবির পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। সঙ্গে ছিলেন পশ্চিম জার্মানিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল মীর শওকত আলী ও জার্মানির দাতা সংস্থা আন্ধেরি হিলফি সভাপতি মিস রোজি গোলম্যান। আর একবার তার সঙ্গে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান ও আইভি রহমানসহ ওনাদের বাড়ি কিশোরগঞ্জের ভৈরব এবং কটিয়াদি গিয়েছি। আবার চাঁদপুরের চন্দ্রায় চক্ষুশিবিরে গিয়েছি। সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে গিয়েছিলেন এরশাদ সরকারের মন্ত্রী মেজর জেনারেল শামছুল হক। 

টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে চক্ষুশিবিরে আমাদের সঙ্গে ছিলেন কুমুদিনী হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা আর পি সাহার বড় মেয়ে বিজয়া সাহার স্বামী ব্যারিস্টার শওকত আলী খান। সেখানে চক্ষুশিবির উদ্বোধন করা হয়। সাবেক প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজমের বাড়িতে জামালপুরের মাদারগঞ্জে গিয়েছি। অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকারের উদ্যোগে নারায়ণগঞ্জে, প্রয়াত ডা. জাহেদ সাহেবের ফরিদপুর সদরে এবং আটরশিতে পির সাহেবের বাড়িতে, ঢাকার কেরানীগঞ্জ, ডেমরার ছনপাড়া—সব স্থানেই চক্ষুশিবির শেষে আমাদেরকে অপ্যায়ন করা হয়। স্যারের আদি নিবাস ভাঙ্গা থানার গোয়ালদি, মালিগ্রাম বাজার, মানিকগঞ্জের শিবালয়সহ আরো অনেক স্থানে চক্ষুশিবির উদ্বোধনে গিয়েছি। 

তার সময়-সচেতনতা ছিল অনুকরণীয়। ঢাকার বাইরে বা ভেতরে কোথাও কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে নির্ধারিত সময়ের আগেই পৌঁছে যেতেন। তার দূরদর্শিতাও ছিল উল্লেখ করার মতো। সমিতির সাবেক কোষাধ্যক্ষ অ্যাডভোকেট নাসির উদ্দিন সাহেব অসুস্থ হওয়ার পর কোষাধ্যক্ষ হিসেবে হাসপাতালের কাজ চালাতে অক্ষম হওয়ায় একজন সক্ষম কোষাধ্যক্ষ পাওয়ার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লে চেয়ারম্যান মহোদয় কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দৈনিক ইত্তেফাকের সাংবাদিক আবদুল বাসেত আকনকে বেছে নেন। ১০-১২ বছর থেকে তিনি কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

তার আতিথেয়তা ছিল মুগ্ধ হওয়ার মতো। তিনি অত্যন্ত শৌখিন ছিলেন। রুচিশীল পোশাক পরতেন, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খেতেন। 

সর্বশেষ যেদিন হাসপাতালে এলেন, সঙ্গে ছিলেন তার সহধর্মিণী অধ্যাপিকা ড. ফারহাত হোসেন, যিনি সর্বক্ষণ তার ছায়াসঙ্গী হয়ে ক্লান্তিহীনভাবে সেবা করেছেন। আমাকে পাশে বসিয়ে হাসপাতাল নিয়ে অনেক কথা বললেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে স্বাক্ষর করলেন। বারবার সামনে, ডানে-বাঁয়ে তাকালেন। বহির্বিভাগে কর্মরত বিভিন্ন সেকশনের কর্মীদের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলেন। হাসপাতালের ডাক্তার, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা কাছে এলে তাদের সঙ্গেও কথা বললেন। যাওয়ার সময় উদাসদৃষ্টিতে চারদিকে তাকালেন। এটাই যে ছিল বিএনএসবিতে তার শেষ পদার্পণ এখনো তা ভাবতে কষ্ট হয়।

লেখক : মহাপরিচালক, খন্দকার মাহবুব হোসেন চক্ষু হাসপাতাল, ঢাকা

 

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন