শনিবার, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২১ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বৈকালিক চিকিৎসাসেবা প্রসঙ্গ

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২৩, ০১:০১

সরকারি বা বেসরকারি যাহাই হউক না কেন, সকল হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ক্লিনিক ও বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র হইতে কাঙ্ক্ষিত, মানসম্পন্ন ও সুলভ চিকিৎসাসেবা পাওয়া নাগরিকদের মৌলিক অধিকার। নাগরিকদের সুশিক্ষা ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করিবার উপর নির্ভর করিতেছে জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করিবার বিষয়টি। দেশের স্বাস্থ্য খাত লইয়া আমরা বহু লিখিয়াছি। সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই যে কিছু কিছু সমস্যা বিরাজমান তাহা অনস্বীকার্য। বেসরকারি চিকিত্সাব্যবস্থার বিকাশকে আমরা সর্বদা ইতিবাচক অর্থেই বিবেচনা করিয়া থাকি। তবে বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলি যাহাতে চিকিৎসা সরঞ্জামের পাশাপাশি চিকিৎসক ও টেকনিক্যাল জনবলের দিক দিয়াও স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়, সে ব্যাপারে সোচ্চার। কেননা বেসরকারি হাসপাতালগুলি অনেক সময় সরকারি জনবলের উপর নির্ভর করিতে গিয়া সরকারি চিকিত্সাব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। তাহাদের অবহেলা, অমনোযোগিতা ও উদাসীনতা বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করিয়া জেলা-উপজেলার সরকারি হাসপাতালগুলিতে চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ানরা যথারীতি কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন না করিবার মূল কারণ হইল প্রাইভেট প্র্যাকটিসের সমূহ আকর্ষণ; কিন্তু তাহারা জনগণের অর্থ হইতে বেতন-ভাতা লইয়া কেন সেই জনগণকে ফাঁকি দিবেন? এই ব্যাধির চিকিৎসা কীভাবে সম্ভব?

উপর্যুক্ত সমস্যাকে কেন্দ্র করিয়া সরকারি হাসপাতালে বৈকালিক চিকিৎসাসেবা চালু করিবার কথা চিন্তা করা হইতেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলিতেছেন, ইহাতে কম খরচে ভালো সেবা মিলিবে। এই ধরনের উদ্যোগ অবশ্য নূতন নহে। দেশের চিকিত্সাশিক্ষার পাদপীঠ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ২৬টি বিভাগে ইহা চালু রহিয়াছে। এইখানে এই উদ্যোগটি গ্রহণ করা হয় ২০১১ সালে। জানামতে, বর্তমানে বারডেম হাসপাতালেও একই পদ্ধতিতে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হইতেছে। আসলে ইহা একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কেননা বিএসএমএমইউতে সকালবেলা সাধারণ রোগীদের ভিড় লাগিয়াই থাকে। তুলনামূলকভাবে কম মূল্যে চিকিৎসাসেবা পাওয়া যায়, এই জন্য এই সময় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের চাপ সামলানো কঠিন হইয়া পড়ে। তবে বৈকালিক চিকিৎসাসেবা চালু করিবার পর পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হইয়া আসিয়াছে। ইহাতে যাহারা একটু অধিক অর্থ খরচ করিয়া বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখাইতে চান এবং নিরিবিলি এখানকার মানসম্মত চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করিতে চান, তাহারা বিকালেই চিকিৎসাসেবা গ্রহণকে প্রাধান্য দিতেছেন। ইহাতে দুই প্রকার লাভ হইয়াছে। প্রথমত যাহারা নানা ব্যস্ততার কারণে সকালে চিকিৎসাসেবা নিতে পারেন না, তাহারা বিকালে অবলীলায় ও সহজে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করিতে পারিতেছেন। দ্বিতীয়ত সরকারি ডাক্তার-নার্স-টেকনিশয়ানরা বিকালবেলা অন্য কোথাও না বসিয়া যাহারা চাহেন, তাহারা নিজ কর্মস্থলেই বাড়তি সময় দিয়া বাড়তি অর্থ উপার্জন করিতে পারিতেছেন। তাহারা নিজেদের প্রতিষ্ঠানেই নিবেদিতপ্রাণ হইয়া নিবিড়ভাবে রোগী দেখিতেছেন; কিন্তু সমগ্র দেশে এই মডেল সকল সরকারি হাসপাতালে চালু করিতে হইলে যে নীতিমালা থাকা দরকার তাহা এখনো প্রণীত হয় নাই। বিএসএমএমইউয়ের উপাচার্যের নেতৃত্বে এই বিধিমালা তৈরি করা হইতেছে, যাহা শিগিগরই পাওয়া যাইবে বলিয়া আমরা আশা করি। এই ক্ষেত্রে যেই সকল চ্যালেঞ্জ রহিয়াছে, তাহা মোকাবিলার জন্যও প্রস্তুতি গ্রহণ করিতে হইবে।

বলা হইতেছে, আগামী মার্চ মাস হইতে সরকারি চিকিৎসকরা কর্মঘণ্টার পর বিকাল ৩টা হইতে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত নিজ হাসপাতালেই বিশেষ ব্যবস্থাপনায় রোগী দেখিতে পারিবেন। প্রাথমিকভাবে ২০ জেলা ও ৫০ উপজেলার সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি পাঁচটি মেডিক্যাল কলেজে পরীক্ষামূলকভাবে এই কার্যক্রম পরিচালনা করা হইবে। আপাতত সপ্তাহে দুই-এক দিন করিয়া এমন ব্যবস্থার আয়োজন করা যাইতে পারে। জনচাহিদা তৈরি হইলে পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি করা যাইতে পারে ইহার জনবল ও অবকাঠামো। তবে এমনভাবে নীতিমালা তৈরি করিতে হইবে, যাহাতে সকালের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত না হয় এবং পরামর্শ ফি হয় যৌক্তিক ও সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইহা বেসরকারি চিকিত্সাব্যবস্থার বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করুক, ইহাও আমরা চাহি না। দেশের সরকারি-বেসরকারি ৬ হাজার চিকিৎসাকেন্দ্রের প্রতি এই দেশের মানুষের আস্থা যাহাতে আরো বাড়ে এবং বিদেশমুখিতা হ্রাস পায়, এমন যে কোনো উদ্যোগকেই আমরা সাধুবাদ জানাইব।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন