রাজধানী ঢাকার বাতাস ক্রমাগত দূষণের সকল মাত্রা ছাড়িয়েছে। পরিণত হয়েছে খুবই অস্বাস্থ্যকর ও বিপজ্জনক বাতাসের শহরে। গত কয়েক মাসে পৃথিবীর দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় শীর্ষে ওঠা-নামা করছে ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকা। বছরজুড়ে একদিনের জন্যও নির্মল বায়ুতে প্রাণভরে শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না এই ম্যাগাসিটির বাসিন্দারা। ঘনঘোর বর্ষাকালে কিছুটা সহনীয় মাত্রা পায় বাতাস। তবে কুয়াশা-শীতের মৌসুম এলে বায়ুদূষণ ভয়ংকর হয়ে ওঠে। যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে বিবেচিত।
বিভিন্ন এয়ার ভিজ্যুয়ালের এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি মাসে রাজধানীতে বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়েছে দ্বিগুণ। টানা প্রায় এক সপ্তাহ ধরে দূষিত শহরের তালিকায় বিশ্বে শীর্ষে আছে ঢাকা। গত এক মাসে একদিনও সহনীয় বাতাস পায়নি রাজধানীবাসী।
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘আইকিউ এয়ার’ দূষিত বাতাসের শহরের শীর্ষ তালিকায় গত শুক্রবার থেকে প্রথম স্থানে রেখেছে ঢাকাকে। গত শুক্রবার সকাল ৮টায় এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) স্কোর ৩১৭ নিয়ে ঢাকার বাতাসের মান ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ অবস্থায় ছিল। গতকাল বৃহস্পতিবারও প্রথম স্থানে ছিল ঢাকা। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ঢাকার একিউআই স্কোর ৩৭২। বুধবার একই সময়ে ঢাকার একিউআই স্কোর ছিল ৩১৯। গত ১৯ জানুয়ারিও তালিকায় শীর্ষে ছিল। একিউআই স্কোরে গতকাল দ্বিতীয় স্থানে আছে উজবেকিস্তানের তাসখন্দ (২৮৮)। তৃতীয় স্থানে আছে মঙ্গোলিয়ার উলানবাটোর (২৪০)।
দূষিত শহরের তালিকায় চতুর্থ স্থানে আছে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি (২১৮)। এরপরই আছে দেশটির বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাই (২০০)। ষষ্ঠ স্থানে আছে মিয়ানমারের ইয়াংগুন (১৮৩) ও সপ্তম স্থানে আছে পাকিস্তানের লাহোর (১৭৯)। গত আট দিনের (বৃহস্পতিবার থেকে বৃহস্পতিবার) ৭ দিনই দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষে ছিল ঢাকা। সাত দিনের মধ্যে গত মঙ্গলবার অস্বাস্থ্যকর শহরের তালিকায় প্রায় কাছাকাছি স্কোর নিয়ে শীর্ষে ছিল তাসখন্দ।
যেভাবে বায়ুর মান নির্ধারণ হয়
প্রতিদিনের বাতাসের মান নিয়ে তৈরি করা একিউ সূচক একটি নির্দিষ্ট শহরের বাতাস কতটুকু নির্মল বা দূষিত সে সম্পর্কে মানুষকে তথ্য দেয় এবং তাদের জন্য কোনো ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে তা জানায়। বাংলাদেশে একিউআই নির্ধারণ করা হয় দূষণের পাঁচটি ধরনকে ভিত্তি করে- বস্তুকণা (পিএম ১০ ও পিএম২ দশমিক ৫), এনও২, সিও, এসও২ ও ওজন (৩৩)। বস্তুকণা পিএম-২.৫ হলো বাতাসে থাকা সব ধরনের কঠিন এবং তরল কণার সমষ্টি, যার বেশিরভাগই বিপজ্জনক। মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক বিভিন্ন ধরনের রোগ যেমন- প্রাণঘাতী ক্যান্সার এবং হৃদযন্ত্রের সমস্যা তৈরি করে পিএম-২.৫। এছাড়া বায়ু দূষণকারী এনও২ প্রধানত পুরোনো যানবাহন, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, শিল্প স্থাপনা, আবাসিক এলাকায় রান্না, তাপদাহ এবং জ্বালানি পোড়ানোর কারণে তৈরি হয়। ২০২১ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তার বায়ুমান নির্দেশক গাইডলাইন পরিবর্তনের পর জানায়, পিএম-২.৫ নামে পরিচিত ছোট এবং বিপজ্জনক বায়ুকণার গড় বার্ষিক ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে ৫ মাইক্রোগ্রামের বেশি হওয়া উচিত নয়। তবে এরচেয়েও কম ঘনত্ব উল্লেখযোগ্য স্বাস্থ্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
একিউআইয়ের তথ্যানুযায়ী, ০ থেকে ৫০ পর্যন্ত ভালো বায়ু, একিউআই স্কোর ১০১ থেকে ২০০ পর্যন্ত ‘অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচিত হয় বিশেষ করে সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য। একইভাবে একিউআই স্কোর ২০১ থেকে ৩০০ হলে, খুবই অস্বাস্থ্যকর। স্বাস্থ্য সতর্কতাসহ তা জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচিত হয়। এ অবস্থায় শিশু, প্রবীণ ও অসুস্থ রোগীদের বাড়ির ভেতরে এবং অন্যদের বাড়ির বাইরের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। আর বায়ুর মান ৩০০ এর বেশি থাকা মানে ওই স্থানের বায়ু খুবই বিপজ্জনক।
যুক্তরাস্ট্রভিত্তিক দুটি সংস্থা হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট এবং ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশন এক প্রতিবেদনে বলেছে, ঢাকার বায়ুতে প্রতি ঘনমিটারে পার্টিকুলেট ম্যাটার (পিএম-২.৫) বা বস্তুকণা ২.৫-এর বার্ষিক গড় ৭১ দশমিক ৪ মাইক্রোগ্রাম এবং এনও২-এর বার্ষিক গড় প্রতি ঘনমিটারে ২৩ দশমিক ৬ মাইক্রোগ্রাম।
স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুম্ললীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের পরিচালক পরিবেশ বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ঢাকা শহরের দূষণ তো আছেই, ঢাকার আশপাশ থেকেই প্রতিনিয়ত দূষিত বায়ু শহরের ভেতর ঢুকছে। মাতুয়াইল, আমিনবাজারে যেসব জায়গায় ময়লা ফেলা হয় সেখানে আগুন লাগিয়ে পোড়ানো হচ্ছে এটাও বায়ুকে খারাপ করছে। যে মানমাত্রা রয়েছে পরিবেশ অধিদফতর থেকে সেটি হলো ৬৫ মাইক্রো গ্রাম, তার প্রায় তিনগুণের বেশি রয়েছে ঢাকা শহরের বায়ুমানে ধুলা। ঢাকা শহরের এরকম একটি কেন্দ্রে (বেইলি রোড) আমরা এ পরিস্থিতি লক্ষ্য করছি। মূলত যেখানে নির্মাণকাজ এবং ইটের ভাটা রয়েছে সেখানে দূষণের মাত্রা দ্বিগুণ। মূলত চলতি মাসেই রাজধানীতে বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়েছে দ্বিগুণ। এ মৌসুমে বৃষ্টি না থাকায় পুরো সময়টাতেই থাকতে হয় কুয়াশা আর ধুলার মিশেল ধোঁয়াশায়। তিনি বলেন,শীতে আবহাওয়া শুষ্ক থাকার কারণে বাতাসে বেড়েছে ধূলিকণার পরিমাণ। খালি চোখে তাই কুয়াশা মনে হলেও আসলে তা ধুলা আর কুয়াশার মিশ্রণ ধোঁয়াশা। অপরিকল্পিত নির্মাণ আর অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের ধোঁয়াই এর প্রধান কারণ।
নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকার বায়ু দূষণ ধারাবাহিকভাবেই উদ্বেগজনক। কিন্তু শীতকালে এ দূষণ অতি বিপজ্জনক অবস্থায় আছে। নিয়ম মানতে বাধ্য করা গেলেই কমে আসবে দূষণের মাত্রা। বড় বড় মেগাপ্রজেক্ট থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত উদ্যোগে যে ভবনগুলো তৈরি হচ্ছে বা রাস্তায় যে খোঁড়াখুঁড়ি হচ্ছে সব জায়গাতে দেখা যাবে কোথায় কোনো আচ্ছাদন নেই, পুরো কাজ হচ্ছে উন্মুক্তভাবে। সরকারকে অবশ্যই এটা স্বাস্থ্য ঝুঁকি মনে করে ধুলা দূষণটা নিয়ে চিন্তা করতে হবে। দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। আর যারা মনিটরিংয়ে দায়িত্বে আছেন তাদের জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে। সেক্ষেত্রে নগর কর্তৃপক্ষ আর পরিবেশ অধিদফতরকে আরও তৎপর না হলে এই পরিস্থিতির অবসান হবে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধোঁয়াশা দেহের অ্যামাইনো এসিডসমূহের ওপর ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ধোঁয়াশা ও ধূলাশার ফলে ফুসফুস ক্যান্সার, ব্রংকাইটিস, শ্বাসজনিত কষ্ট, চোখ জ্বালা, ঝাপসা দৃষ্টি, হাঁপানি, মাথা ব্যথা, বমি বমি ভাব ইত্যাদি হতে পারে। যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য একটি মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে শিশু এবং বয়স্করা সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, বায়ু দূষণে বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর আনুমানিক ৭০ লাখ মানুষ প্রাণ হারান। মূলত স্ট্রোক, হৃদরোগ, পালমোনারি রোগ, ফুসফুসের ক্যান্সার এবং তীব্র শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ দেখা যায়। ঢাকার বায়ুদূষণের তিনটি প্রধান উৎস হলো- ইটভাটা, যানবাহনের ধোঁয়া ও নির্মাণাধীন স্থাপনার ধুলো। জীবাশ্ম জ্বালানি দহন, বায়োমাস পোড়ানো, চলাচলের অনুপযোগী যানবাহন থেকে নির্গমন, ইটভাটা এবং ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজের ফলে বাংলাদেশের শহরগুলোর দূষিত বায়ুর মান প্রায়ই বৈশ্বিক গণমাধ্যমের শিরোনামে আসে।
উৎস চিহ্নিত হলেও প্রতিকার নেই
এদিকে উৎস চিহ্নিত হলেও সমাধান হচ্ছে না। বায়ুদূষণের এই ভয়াবহ পরিস্থিতির কারণ কি চিহ্নিত হলেও কার্যকরভাবে কোনো প্রতিকার হচ্ছে না। এ বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, ঢাকার বায়ু দূষণের তিনটি কারণ। ইটভাটা, উন্নয়নমুখী কাজ ও জ্বালানির ব্যবহার আমাদের শঙ্কিত করছে। এসব কারণে ঢাকার বায়ুর অবস্থা আসলেই খুব খারাপ। আমরা ঢাকার পরিবেশ দূষণের উৎস চিহ্নিত করেছি। ইনডোর এবং আউটডোরে কী পরিমাণ দূষণ ছড়ায় তা নির্ণয় করা গেছে। তবে আমাদের সমস্যা হলো আইনের। বায়ু দূষণ ঠেকানো বড় চ্যালেঞ্জ হলো নানান ধরনের আইন আছে, বিধি আছে। কিন্তু বাস্তবায়ন করতে পারছি না। পরিবেশ অধিদপ্তরকে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তা তারা কার্যকর করতে পারে না। ইটভাটার সঙ্গে প্রভাবশালীরা জড়িত। তাদের সহযোগিতা যতটুকু দরকার তা পাইনি। তিনি বলেন, আমাদের জিডিপি কমে যাচ্ছে। আয়ু কমে যাচ্ছে। এখন আমরা পরিবেশের একটা ইভালুয়েশন করছি। আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদের অবস্থা কি, আমরা কেনো বিদেশি রিপোর্টের ওপর নির্ভরশীল এটাও এখন আলোচনা হচ্ছে। শব্দ দূষণ এবং বায়ু দূষণ - এ দুটো নিয়েই আমাদের কাজ করা উচিত।
পরিবেশবিদ ড. রেজওয়ানা হাসান বলেন, আমরা আইনের ম্যান্ডেটের অধীনে কাজ করি না। বায়ুদূষণ রোধকল্পে আইন করা হলো, বিধি করা হলো, কিন্তু সে অনুযায়ী দুই বছরেও কাজ শুরু হয়নি। আমাদের যার যেটা কাজ সেটা করছি না। আদালতের রায় বাস্তবায়ন হচ্ছে না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। সরকার স্ট্রাকচারাল কাজে উদ্যোগী। কিন্তু এ ক্ষেত্রে পরিবেশ বিপর্যয়ের বিষয়টি আমলে নেয়া হচ্ছে না। সরকারের বিভিন্ন বিভাগের সমন্বয়হীনতা সংকট আরও বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে।
