শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়-এর বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল

হল জীবনের গল্প

আপডেট : ১৮ জুন ২০১৯, ১৯:৪১

সন্ধ্যে হলে পাখিরা ফিরে নীড়ে আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ফিরে হলে। হল যেন শিক্ষার্থীদের কাছে আপন নীড়। এক-একটি হল যেন প্রতিটি শিক্ষার্থীর হাজারো মনের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, আবেগ-অনুভূতির নীরব সাক্ষী। রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের কয়েকজন শিক্ষার্থীর হল জীবনের আনন্দ-বেদনা ও প্রত্যাশার কথা জানাচ্ছেন— মো. আবু হানিফ

সুমাইয়া সুলতানা লাবণ্যা

লেভেল- ২, সেমিস্টার- ২

তথাকথিত ভাষ্যমতে, মেয়েদের জীবন যাযাবর সমতুল্য তারা কখনো বাবার হাত ধরে, একটা সময়ে জীবনসঙ্গীর পথে আর শেষবেলায় সন্তানের কাছে। তবে এই বাস্তবতার ভিড়ে মেয়েরা আমরা নিজেকে নিজে খুঁজে পাই বিশ্ববিদ্যালয়ের হল জীবনে। এখানে দুই বছর গণরুমের মতো জায়গাতে থাকতে হয় খেটে খাওয়া বাবার মেয়ে বা আদুরের দুলালীকে। তবে এটিই সেই জায়গা যেখানে কেউ স্বপ্নে বুক বাঁধে আর কেউবা ভেসে যায় জোয়ারে। এখানে দিনে এক বেলা না খেয়ে আর দুই বেলা পানি না পেয়েও মানিয়ে নিচ্ছি, যা  ১০ বছর আগেও কল্পনাও করতে পারতাম না। এখানে কে কেমন, কার বাবা কতটা বিত্তশালী তা না ভেবে যেমন পড়া, গান, আাাড্ডা আর আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল নিয়ে তর্ক করে কাটিয়ে দিতে পারি সারারাত; তেমনি প্রয়োজনে নিজের খাবার, অর্থ এমনকি মূল্যবান সময় হাসিমুখে বিসর্জন দিতে পারি প্রিয় বন্ধুটির জন্য। এখানে দিন শুরু হয় ক্লাস, ল্যাব, পরীক্ষা কিংবা টিউশনি দিয়ে। অনেক মন্দ আর ভালোর মাঝে হারিয়ে যাওয়া নিজেকে ফিরে পাওয়ার স্বাদ শুধুমাত্র হল জীনবনেই সম্ভব।

 

এসিংয়ইং মার্মা

লেভেল- ২, সেমিস্টার- ২

হল লাইফের দুইটি বছর কেটে গেছে। অনেক স্মৃতি আছে এই হলকে ঘিরে। সবচেয়ে আনন্দময়, উপভোগ্য মুহূর্তগুলো কেটে যায় প্রথম বর্ষে। প্রথম বছরে গণরুমে থাকতে হয়। মাঝে মধ্যে মনে হয়, কোনো একটি বস্তিতে আছি। সিঙ্গেল একটা বেডে ডাবলিং করে থাকা লাগত। হলের খাওয়া-দাওয়া ভালো লাগে না। বাড়ির কথা মনে পড়ে, কান্না পায়। এসব কিছুর মধ্যেও মানিয়ে নিতে শিখেছি। ছুটির দিনগুলোতে কেউ কেউ আত্মীয়দের বাসায় যেত। আমরা যারা হলে থাকতাম সবাই মিলে ঘুরতে বের হতাম। রেস্টুরেন্টে যাওয়া, শপিং করা, বান্ধবীদের জন্মদিন পালন করা— কত কাজ ছিল আমাদের। প্রথমদিকে প্রোগ্রামে যাওয়া লাগত। গ্রুপের সবাই একসাথে থাকতাম। গণরুম থেকে অনেক আপুর সাথে পরিচয় হয়ে যায়। শুরুতে আপুদের প্রতি এক আধটু ভয় ছিল। পরে তাদের সাথে আমাদের ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠল। বিপদে-আপদে আমাদের পাশে থাকতেন। আমাদের ভুল ত্রুটি ধরিয়ে দিতেন। হল লাইফে আপুদের কাছে থেকে অনেক কিছু শিখেছি, শিখছি।

 

জান্নাতুল ফেরদৌস জেরীন

লেভেল- ৩, সেমিস্টার- ২

ক্যাম্পাস জীবনের পূর্ণতা আসলে হল জীবনেই। ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পরে যে বিষয়টি সবচেয়ে কষ্ট দিত তা হচ্ছে আব্বু-আম্মু, ভাইকে ছেড়ে কিভাবে হলে থাকব? ভীষণ রকম অন্তর্মুখী আমি সবার সাথে মিশতে পারব তো? গণরুমে এসে আমার এ হলফোবিয়া দূর হলো। সবাই একসাথে মিলেমিশে চলেছি, একজনের সমস্যায় অন্যজন এগিয়ে এসেছি। দিনশেষে রাতের আড্ডায় মেতে ওঠে হল, চলে মাঝরাত পর্যন্ত। সারাদিনের ক্লাস, পরীক্ষার সব যাতনা যেন ফিকে হয়ে যায় এই আড্ডায়। সিনিয়র জুনিয়রের সম্পর্কটা হল লাইফের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সিনিয়র আপুদের সম্মান দেওয়া, সেইসাথে তাদের শাসন মাখানো ভালোবাসাটা যেনো আমার হল লাইফকে বড্ড বেশি মধুর করে তুলেছে। আরো একধাপ এগিয়ে যাচ্ছি হলের আপুদের ক্যারিয়ার গড়ার দিকনির্দেশনা পেয়ে। আপুদের পড়াশোনা, সাফল্য দেখতে দেখতে কখন যেন নিজেও গুছিয়ে উঠেছি। হলে না থাকলে এসব কখনো বুঝতাম না। হলের জীবন আমার কাছে অক্সিজেনের মতো। ক্রমেই অভিজ্ঞতা বাড়ছে।

 

শামা সানজিদা শাওন

লেভেল- ২, সেমিস্টার- ২

জীবন! সে তো পদ্ম পাতার শিশির বিন্দু। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে একটু একটু করে প্রখর হওয়া ভোরের প্রথম আলোকরশ্মি কিংবা শীতের রাতে টিনের চালে শিশিরের টুপটাপ শব্দ। জীবনের একটা অধ্যায়ের নাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হল লাইফ। হলে না থাকলে ক্যাম্পাস জীবনটা আসলেই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এখানে কেউ ভাত খাইয়ে দেয় না, মশা মারার ব্যাট নিয়েও কেউ আসে না। হলে এসে অনেকের সাথে মিলেমিশে চলার সুযোগ পেয়েছি। বিভিন্ন এলাকার বান্ধুবী পেয়েছি, ফলে সব এলাকার সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা পেয়েছি। ৬৪টি জেলায় ৬৪টি বান্ধুবী বানানো কেবল হল জীবনেই সম্ভব। আমার কাছে হল লাইফ মানে সকাল ৮টায় চোখ মুছতে মুছতে ক্লাসে যাওয়া! বান্ধুবীদের জন্মদিনে ঘুম থেকে তুলে কেক মাখিয়ে দেওয়া, পরীক্ষার সময় গ্রুপ স্টাডি করা। সবাই মিলে একসাথে রান্না করা, ইফতার করা। কথায় আছে, ‘জীবন পুষ্পশয্যা নয়’, তাই সমস্যা অবশ্যই থাকবে। আবাসন সমস্যা, পানির সংকট, আরো টুকটাক সমস্যা নিয়ে আমাদের হলের এই অধ্যায়।

 

নাজমুন নাহার

লেভেল- ২, সেমিস্টার- ১

ছোটোবেলা থেকেই বাবা-মা স্বপ্ন দেখাতেন বড় হয়ে একজন ডাক্তার হব। সেই স্বপ্ন বাঁক নিয়ে ভাগ্যের সহযোগিতায় আমাকে নিয়ে আসে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভর্তির দিন হল বরাদ্দের সময় সৌভাগ্যক্রমে আমার বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলে সীট বরাদ্দ হয়। হলে উঠলাম, এরপর শুরু হয় এক নতুন জীবনের। মেনে নিতে পারছিলাম না যে ছোট একটি রুমে এতজনের থাকতে হবে। নতুন পরিবেশে নতুন বন্ধুদের সাথে পথচলা। ছুটি পেয়ে মা-বাবার কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য প্রহর গুণতে থাকা সবচেয়ে বেদনাদায়ক। পরীক্ষার আগের রাতে বৃষ্টির পানিতে বেড ভেসে যাওয়া, ছারপোকার সাথে বন্ধুত্ব করে ঘুমাতে যাওয়া, কত নতুন অভিজ্ঞতা!!  হলের সবাই মিলে আমরা যেন এক যৌথ পরিবার। আমাদের হলের ভিতরে রয়েছে কয়েকটি নাগলিঙ্গম গাছ। এদের ডালপালা যেন আগলে রেখেছে হলটাকে। চারদিকে বাহারি ফুলের সুমিষ্ট সুগন্ধ মন ভরিয়ে দেয় । একদিন হয়তো জীবনের তাগিদে ছেড়ে যাবো প্রিয় হলকে কিন্তু স্মৃতির পাতায় অমলিন থাকবে ভালোবাসার ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল।