রোববার, ২৬ মে ২০২৪, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

উন্নয়ন ধারাবাহিকতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০২৩, ০০:২১

বাংলাদেশের রাজনীতিতে শঙ্কা, উদ্বেগ ও আশঙ্কার চিত্র-প্রতিচিত্র বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের জনসাধারণ লক্ষ করেছে। রাজনীতি মূলত জনকল্যাণের জন্য, দেশের মঙ্গলের জন্য। সেখানে রাজনীতির মাধ্যমে সৃষ্ট অস্থিরতার আশঙ্কা দেশের স্বাভাবিক পরিস্থিতিকে করে তোলে আরো অস্থিতিশীল। দেশে রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা ভূলুণ্ঠিত হলে ব্যবসায়ী সমাজসহ অনেকেই যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডও বিঘ্নিত হয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশের জনসাধারণ কখনোই সংঘাতময় রাজনীতি চায় না, তারা চায় সুষ্ঠু রাজনৈতিক চর্চা বাংলাদেশে বজায় থাকুক এবং রাজনীতির মাধ্যমে অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যার সমাধান হোক। বাংলাদেশের জনগণ কখনো জ্বালাও-পোড়াওয়ের রাজনীতি সমর্থন করেনি, ভবিষ্যতেও করবে না। স্থিতিশীল অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজমান থাকা। 

বাংলাদেশের মানুষ আগুনসন্ত্রাসের রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করেছে। এতে হতাহত হয়েছে অসংখ্য মানুষ; বিনষ্ট হয়েছে রাষ্ট্রীয় সম্পদ। বিভিন্ন সময়ে সরকারি দলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিরোধী দল হরতাল, অবরোধের ডাক দিয়েছে, তেপ্রক্ষিতে জিম্মি হয়ে পড়েছে সাধারণ জনতা। এসব পরিস্থিতি কখনোই সাধারণ জনগণের কাছে সুখকর ছিল না, সাধারণ জনগণ বহুকাল আগেই হরতাল-অবরোধ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আহূত হরতাল-অবরোধে সারা দেশ কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে, বন্ধ হয়ে পড়ে বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক কার্যক্রম। একদম জরুরি প্রয়োজনে রাস্তায় বের হওয়া পরিবহনও হরতালকারীদের তোপের মুখে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, হেনস্তা হয়ে থাকে গাড়ির ভেতরে থাকা ড্রাইভারসহ যাত্রীরা। এ ধরনের অস্থির ও শ্বাপদসংকুল পরিস্থিতির মুখোমুখি বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ আর হতে চায় না। এ কারণেই সাধারণ মানুষ হরতাল-অবরোধ সমর্থন করে না। 

রাজনীতির মাঠে মত-দ্বিমত ও মতভেদ-মতপ্রার্থক্য থাকতেই পারে, থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে নিজেদের দাবি দাওয়া আদায়ের জন্য হরতাল-অবরোধ আহবান করবেন। রাজনীতির কঠিন বিষয়াদি রাজনীতির টেবিলেই সমাধান হওয়া উচিত। যে দলই রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকুক না কেন, তথা যে দলই বিরোধী দলে থাকুক না কেন, রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান রাজনীতিবিদদের আলোচনার মাধ্যমেই হওয়া উচিত। ইদানীং রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে বিদেশি বন্ধুদের দ্বারস্থ হওয়ার প্রবণতা আবারও দেখা যাচ্ছে। এটিও কোনোরূপ সমস্যার সমাধান দিতে পারবে না, কারণ সমস্যাগুলো আমাদের অভ্যন্তরীণ। আমাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নিয়ে আমাদেরই সর্বপ্রকারে ভাবতে হবে। ভিয়েনা কনভেনশনের নীতিমালা কূটনীতিকেরা লঙ্ঘন করতে পারেন না।

দেশে সংবিধান রয়েছে, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য আইন-কানুন রয়েছে, দেশ পরিচালনায় সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আইনের মধ্য থেকে বিধিবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় যে কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনার সুযোগ রয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনবোধে আইনের সংযোজন-বিয়োজন কিংবা নতুন অ্যাক্ট প্রণয়নের মাধ্যমে হলেও সমস্যার সমাধান জরুরি। সমস্যা সমাধানের নামে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করার কোনো মানে হয় না। বর্তমান প্রযুক্তির যুগে মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা যেমনভাবে বেড়েছে, ঠিক তেমনিভাবে রাজনৈতিকভাবে ঘোষিত নেতিবাচক কর্মসূচির বিষয়ে সাধারণ জনগণের মধ্যে ভয়ের সংস্কৃতিও তৈরি হয়েছে।  

বর্তমানে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায়, তাই দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থে দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে দায়িত্ব নিতে হবে। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইতিহাসের কারণেই এই দলের প্রতি সাধারণ জনগণের প্রত্যাশাও বেশি। সেজন্যই রাজনীতিতে স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে আওয়ামী লীগকে অগ্রগণী ভূমিকা পালন করতে হবে প্রত্যক্ষভাবে। অন্য দলের দাবিদাওয়ার বিষয়ে আওয়ামী লীগকে দায়িত্ব নিয়ে সমাধানের জন্য চেষ্টা করতে হবে। বাংলাদেশ যেভাবে উন্নয়নের রোল মডেলের খেতাব পেয়েছে, সেটির ধারবাহিকতা ধরে রাখতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা জরুরি। বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকায় সরকার পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, বঙ্গবন্ধু টানেলসহ বিভিন্ন মেগা প্রজেক্টের নির্মাণকাজ সফলতার সঙ্গে শেষ করতে পেরেছে বা শেষ করার পথে রয়েছে। করোনা মহামারির সময় এর মোকাবিলায় সরকার সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে। মহামারি-পরবর্তী সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিশ্ব যখন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে, তখনো বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে। বিষয়গুলো অত্যন্ত ইতিবাচক এবং দেশের রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা থাকায় বাংলাদেশের এই অর্জনগুলো ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে। 

দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের তৃণমূল পর্যায়ে প্রচুর কর্মী-সমর্থক রয়েছেন। তবে ইদানীং বেশ কিছু ভুঁইফোড় রাজনৈতিক দলের উত্থান হয়েছে মিডিয়ার কল্যাণে, যাদের দেশব্যাপী কোনোরূপ সমর্থক নেই, রাজনৈতিক কার্যালয় নেই। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন দিবস ও উৎসবে জনা কয়েক লোক নিয়ে প্রেসক্লাবভিত্তিক কর্মসূচি পালন করে রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়ার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে,  প্রতিটি রাজনৈতিক দলে কিছু নিবেদিতপ্রাণ নেতা-কর্মী ও সমর্থক রয়েছেন, যারা দলের শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশ ও আদেশ প্রতিপালন করে থাকেন সুচারুরূপে। আবার কিছু সমর্থক আছেন, যারা দলের সিদ্ধান্তকে সব সময়ই সঠিক মনে করেন না। যখন সঠিক মনে হয়, তখন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন। ঐ সমর্থকেরা ঘোষিত কর্মসূচি সঠিক মনে না হলে কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকেন। আবার কিছু ভোটার আছেন, যাদের বলা হয় ভাসমান ভোটার, তারা কোনো দলের সমর্থক নন। রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম বিবেচনায় নিয়ে এই শ্রেণির লোক নির্বাচনে ভোট প্রদান করে থাকেন। শেষ পর্যন্ত তারাই ভোটের রাজনীতিতে পালন করেন নিয়ামকের ভূমিকা। তারা আবার কোনো ধরনের সংঘাত, সংঘর্ষ ও হানাহানি পছন্দ করেন না। তাদের বিষয়টি এখানে এ কারণেই উল্লেখ করা হলো, রাজনীতিতে অস্থিতিশীল পরিবেশ কিংবা সংঘাত সৃষ্টিকারীরা কখনোই ভাসমান ভোটারদের ভোট পাবেন না। এমনকি সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টির কারণে ক্ষতিগ্রস্তদের দুঃখ-দুর্দশা দেখে সাধারণ রাজনৈতিক কর্মীও অনেক সময় নিজ দলের প্রার্থীর কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। তাই তাদের মূল্যবান ভোটের হিসাব বিবেচনায় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচি প্রণয়ন করা উচিত। কেননা, তাদের সংখ্যা মোটেও কম নয়। 

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে পুরো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ে। রাস্তাঘাট অচল হয়ে পড়ে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়, শিল্পকারখানা ক্ষয়ক্ষতির ভয়ে বন্ধ রাখে কর্তৃপক্ষ, হকার ও বিক্রেতারা অলস সময় কাটায় বাড়িতে, মুমূর্ষু রোগী চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে কর্মব্যস্ততার বিপরীতে স্থবিরতা পরিলক্ষিত হয়। এক কথায়, গাড়ির চাকা না ঘুরলে পুরো বাংলাদেশ সীমাহীন ক্ষতির মুখে পড়ে। আমদানি-রপ্তানিতে ভাটা পড়ে, পণ্য খালাসে স্থবিরতা নেমে আসে। আর এদিকে দিনমজুরদের জীবনে নেমে আসে অবর্ণনীয় যাতনা। অবরোধের ফলে পর্যটন খাতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, বিদেশি পর্যটকের বাংলাদেশে আসার ক্ষেত্রে অনাগ্রহের সৃষ্টি হয়। বিদেশি ক্রেতাদের সঠিক সময়ে পণ্য সরবরাহে বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিরাট অঙ্কের লোকসানের মুখে পড়েন রপ্তানিপণ্যের মালিকেরা। অনেক অর্ডার বাতিল হয়ে যায়, ফলে বাংলাদেশের বাজার অন্যরা দখল করে নেয়।  

অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে রাজপথে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মুখোমুখি ও পালটাপালটি অবস্থানে বাদানুবাদের সৃষ্টি হয়ে সংঘাতময় পরিস্থিতির অবতারণা ঘটে। দেশব্যাপী সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে থাকে, অর্থাত্ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। ফলে অনেকেই শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আহত ও নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার পুলিশের হস্তক্ষেপ কামনা করে এবং পুলিশ তার দায়িত্ব পালনের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কিছু জায়গায় অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। এ ধরনের সৃষ্ট জটিলতার কারণেই পুলিশের সঙ্গে একটি শ্রেণির মানুষের অঘোষিত দূরত্ব তৈরি হয় এবং এর রেশ থাকে দীর্ঘদিন। এতে প্রশাসন সম্পর্কে মানুষের বিরূপ ধারণা তৈরি হয়। 

অন্যদিকে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সর্বত্র সচল থাকে, দেশের ছোট ও মাঝারি মানের ব্যবসায়ীদের মধ্যে কর্মচাঞ্চল্য পরিলক্ষিত হয়, নিয়মিত অর্থনৈতিক লেনদেন হয়, বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে সময় ও জোগানের ভিত্তিতে এদেশীয় ব্যবসায়ীগণ নিয়মিত পণ্য রফতানি করতে পারেন, সমুদ্রবন্দরগুলো সব সময় সচল থাকে। আবার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিদ্যমান থাকলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সৌহার্দ ও সম্প্রীতির পরিবেশ তৈরি হয়, সরকারি দল বিরোধী দলের যৌক্তিক মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। মোদ্দা কথা হচ্ছে, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পক্ষে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ইতিবাচক কর্মকাণ্ড অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি কল্যাণকর বাংলাদেশ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে। এজন্য রাজনৈতিক দলগুলোর কছে আমাদের আকুল আবেদন, যে কোনো মূল্যে যে কোনো পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশকে সুস্থ ও স্বাভাবিক রাখার প্রয়াসে আপনাদের সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টার প্রয়োজন রয়েছে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের স্বার্থে আপনারা সব সময় রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে শান্তিপূর্ণ রাখবেন। 

লেখক : সভাপতি, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন