গোমতী থেকে বালু-মাটি কাটা থামছে না

আপডেট : ১৮ জুন ২০১৯, ২১:৩৯

হুমকির মুখে প্রতিরক্ষা বাঁধ

মো. লুত্ফুর রহমান, কুমিল্লা প্রতিনিধি

কুমিল্লার ঐতিহ্যের গোমতী নদীর কমপক্ষে দেড়শ পয়েন্ট দিয়ে বালু উত্তোলনসহ মাটি কাটা চলছেই। বালু ও মাটি দস্যুরা বেপরোয়াভাবে ড্রেজার লাগিয়ে দিনে-রাতে অবৈধভাবে বালু ও মাটি উত্তোলনের কারণে ভেঙে পড়ছে নদী তীরের মাটি। এতে গোমতীর বুক ক্ষত-বিক্ষত হয়ে হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে প্রতিরক্ষা বাঁধ। কোনোমতেই থামছে না মাটি কাটা ও বালু উত্তোলন। এজন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নির্লিপ্ততাকে দুষছেন নদীপাড়ের বাসিন্দারা। সুষ্ঠু নজরদারির অভাবে প্রভাবশালীরা এ নদীকে পুঁজি করে কম সময়ে অঢেল সম্পদের মালিক হলেও সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। নদীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ও স্থানীয় লোকজনের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, স্থানীয় কতিপয় রাজনৈতিক নেতার ছত্রছায়ায় প্রভাবশালীরা সিন্ডিকেট করে গোমতী নদীর জেলার আদর্শ সদর, বুড়িচং, দেবিদ্বার, মুরাদনগর, তিতাস ও দাউদকান্দি উপজেলার কমপক্ষে দেড়শটি পয়েন্ট দিয়ে ড্রেজার লাগিয়ে ও শ্রমিক দিয়ে মাটি কেটে ট্রাক-ট্রাক্টর ও নৌকাযোগে পুকুর-ডোবা, নিচু জমি, জলাধার ভরাট, ইটের ভাটাসহ নানা স্থানে বিক্রি ও সরবরাহ করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। এভাবে বালু ও মাটিদস্যু চক্রের কবলে পড়ে গোমতী নদীর ওপর নির্মিত বিভিন্ন স্থানের অন্তত ১০টি ব্রিজ এবং নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে। বালু ও মাটি বোঝাই ট্রাক-ট্রাক্টরের বেপরোয়া চলাচলের কারণে প্রতিরক্ষা বাঁধও ক্ষত-বিক্ষত হয়ে পড়ছে। এতে বর্ষা মৌসুমে বাঁধ ভেঙে নদীর দুই পাশের লাখো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন নদীপাড়ের বাসিন্দারা। নদী এলাকার বাসিন্দা শিক্ষক শাহ আলম (৬৫), আবদুল করিম (৬০), ব্যবসায়ী জয়নাল আবেদীন (৬০), কৃষক আবুল মিয়া (৫৫), ময়নাল হোসেন (৫৫), শাহজাহানসহ (৫০) বিভিন্ন পেশার অন্তত ১৬ জনের সঙ্গে কথা হলে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে যোগসাজশে স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক প্রভাবশালী চক্র গোমতী নদীর বিভিন্ন এলাকায় বালু উত্তোলন ও অবৈধভাবে মাটি কেটে বিক্রি করছে।

এদের অনেকে সরকার দলীয় নেতা-কর্মী হওয়ায় কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস করে না, এক্ষেত্রে প্রশাসনও অনেকটা নির্লিপ্ত। তাই নির্বিচারে বালু উত্তোলন ও মাটি কাটা চলছেই। বালুদস্যুরা লুটেপুটে খাচ্ছে এ সম্পদ এবং এতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তারা আরও বলেন, সংঘবদ্ধ চক্র মাটি আনা-নেওয়ার কাজে নম্বরবিহীন ট্রাক্টর ব্যবহার করে থাকে, তাই তারা থেকে যায় ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। এ নিয়ে গত মার্চে ইত্তেফাকে সচিত্র সংবাদ প্রকাশের পর প্রশাসনের তত্পরতায় কয়েকদিন কিছুটা নিষ্ক্রিয় থাকলেও এখন পুরোদমে বালু ও মাটি কাটা চলছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে নদী সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসনের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, রাজনৈতিক পরিচয়ে বালু উত্তোলনসহ মাটি কেটে বিক্রি করছে প্রভাবশালীরা।

তাই অনেক সময় আমাদের পক্ষে সেটা বাধা দেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। বালু উত্তোলন ও মাটি কেটে ভারী যানবাহন দিয়ে সেগুলো পরিবহন করায় বাঁধ নষ্ট হচ্ছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কুমিল্লা শাখার সভাপতি ডা. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, মাটি ও বালুদস্যুদের আগ্রাসনে পড়ে গোমতী নদী নাব্য হারিয়ে দিনে দিনে সরু খালের মতো হয়ে পড়ছে। এতে পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কুমিল্লা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল লতিফ বলেন, নদীর বালু উত্তোলন ও মাটি কেটে নেওয়ার বিষয়টি জেলা প্রশাসককে জানানো হয়েছে। লোকবলের অভাবে সবসময় তদারকি করা যাচ্ছে না বলে তিনি দাবি করেন। কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মো. আবুল ফজল মীর জানান, গোমতী নদী থেকে বালু উত্তোলন ও মাটি কাটা বন্ধে বিভিন্ন সময়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে দণ্ড প্রদান করা হয়েছে এবং এ কার্যক্রম অব্যাহত আছে। এছাড়া জেলার নদী সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসনকে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।