ব্যক্ত হউক জীবনের জয়

আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০৩:০০

বালক সত্যজিৎ রায় মায়ের হাত ধরিয়া কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সহিত দেখা করিতে গেলে কবি আদর করিয়া সত্যজিতের খাতায় যে কবিতাখানি লিখিয়া দিয়াছিলেন, তাহা আজ শুধু একটি কবিতা নহে, মানবজীবনের এক রূঢ় বাস্তবতার আখ্যান। কবিতায় তিনি বলিয়াছেন, বহু দিন ধরে, বহু ক্রোশ দূরে/ দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা/ দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু।/ দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া/ ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া/ একটি ধানের শিষের উপরে/ একটি শিশির বিন্দু।’ মানবজীবনে আমরা মহাকাশ দেখিতেছি, কোটি কোটি মাইল দূরের গ্রহ-নক্ষত্র মানুষ অবলোকন করিতেছে, কোথাও প্রাণের সন্ধান রহিয়াছে কি না, খুঁজিতে মরিয়া হইয়া উঠিয়াছে। লক্ষ কোটি মাইল দূরের কোথায় একটি নক্ষত্র বিস্ফোরিত হইয়াছে, তাহা কতশত বর্ষ পূর্বে বিস্ফোরিত হইয়াছিল তাহা বাহির করিয়া ফেলিতেছে। অথচ ঘর হইতে বাহির হইয়াই যে শিশিরবিন্দু, তাহা দেখা হইয়া উঠে নাই। অর্থাৎ সৃষ্টির পর হইতে যে প্রশ্নটি মানুষের সম্মুখে রহিয়াছে তাহার কোনো সমাধান মানুষের হাতে নাই। মানুষ কোথা হইতে আসিয়াছে, কোথায় চলিয়া যায় সেই সন্ধান মানুষের নিকট অধরাই রহিয়া গিয়াছে। ইহাই বোধকরি মানবসমাজের এক ট্র্যাজেডি। প্রত্যেক প্রাণীই মরণশীল। ‘জন্মিলে মরিতে হবে অমর কে কোথা কবে!’ তথাপি মানুষ সকল সত্যকে উপেক্ষা করিয়া জীবনকে সর্বোচ্চ উপভোগ করিতে চাহে। ইংরেজিতে বলা হয়, ‘লাইফ ইজ আ বিউটিফুল গিফট।’ যদি গিফটই হইয়া থাকে তাহা হইলে এই গিফটের সর্বাত্মক সদ্ব্যবহার করিতে চেষ্টা করাই উত্তম পথ। আর সেই সর্বাত্মক সদ্ব্যবহারের পথ হইল ইহজগৎ ও পরজগতের কর্তব্যগুলিকে নিষ্ঠার সহিত পালন করা। ইসলামে এই সকল বিষয়ে আরও স্পষ্টভাবে মানুষকে দিকনির্দেশনা দেওয়া হইয়াছে। পবিত্র কোরআনের সুরা মূলকের এক ও দুই নম্বর আয়াতে বলা হইয়াছে, ‘তিনি সকল বস্তুর উপর ক্ষমতাবান। যিনি সৃষ্টি করিয়াছেন মরণ জীবন, যাহাতে পরীক্ষা করিবেন তোমাদের, কে তোমাদের কর্মে উত্তম!’ আবার সুরা বাকারার ২৮ ও ২৯ নম্বর আয়াতে বলা হইয়াছে, ‘তোমরা কীভাবে আল্লাহকে অস্বীকার করো? অথচ তোমরা ছিলে প্রাণহীন। তিনি তোমাদের মৃত্যু ঘটাইবেন, আবার পুনরায় জীবন্ত করিবেন। পরিণামে তাহার দিকেই তোমাদিগকে ফিরাইয়া আনা হইবে। তিনি পৃথিবীর সকল কিছু তোমাদের জন্যই সৃষ্টি করিয়াছেন।’

এই সকল নির্দেশনা অনুসরণের পাশাপাশি মানুষকে জাগতিক কর্ম করিতেও বারংবার নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। কর্তব্য পালন করিতে বলা হইয়াছে। এবং সততার সহিত। মানুষের কর্তব্যের মধ্য দিয়া সাফল্যের কথা বলা হইয়াছে। সুরা তাওবার ১১১ নম্বর আয়াতে বলা হইয়াছে ‘তোমরা যে সওদা করিয়াছ, সেই সওদার জন্য আনন্দিত হও।’ তাই জীবনকে সার্থক করিয়া তুলিবার লক্ষ্য থাকাটাও জরুরি। যদিও প্রত্যেক মানুষই সেই সফলতা অর্জন করিতে পারে না। তাহার জন্য প্রয়োজন হয় নিষ্ঠা, কর্তব্য ও ইমানের জোর। এই নিষ্ঠা যাহার থাকে, তাহাকেই আল্লাহ সফল করিয়া তোলেন। সুতরাং কবিগুরুর সেই চাওয়াই যেন আমাদের জীবনে পাথেয় হইয়া উঠে, ‘ব্যক্ত হোক জীবনের জয়/ ব্যক্ত হোক তোমা মাঝে/ অসীমের চিরবিস্ময়।’

ব্যক্তিজীবন সফল হইয়া উঠিলে সফল হয় পারিবারিক জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবন। সুতরাং নানা প্রতিবন্ধকতা, নানা বাধ্যবাধকতার মধ্য দিয়া, দুর্যোগ মোকাবিলা করিয়া ব্যক্ত হউক জীবনের জয়, ব্যক্ত হউক অসীমের বিস্ময়। 

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন