উন্নয়নশীল দেশসমূহে সত্য আজ হারাইয়া গিয়াছে। এই সকল দেশে সর্বত্র মিথ্যার যে বেসাতি চলিতেছে, তাহা দেখিয়া বিস্মিত হইতে হয়। সত্যের সঙ্গে মিথ্যার সংমিশ্রণ আজ একটি আর্ট বা শিল্পে পরিণত হইয়াছে। মিথ্যাচারই যেইখানে স্বাভাবিক নিয়ম হইয়া দাঁড়াইয়াছে, সেইখানে মিথ্যা প্রচারের পরও তাহা লইয়া তেমন একটা প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় না। এই জন্যই এই সকল দেশ অনুন্নত বা উন্নয়নকামী!
পক্ষান্তরে যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশে মিথ্যা বলাটা এত সোজা নহে। বিশেষ করিয়া, যাহারা দেশ পরিচালনার দায়িত্বে রহিয়াছেন, তাহারা একটা মিথ্যা কথা বলিয়া দেখুন তো? সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি হইবে। দেশের নির্বাহী, বিচার ও আইন বিভাগ নড়িয়াচড়িয়া বসিবে। মিথ্যাচারীকে মিডিয়ায় তুলাধুনা করা হইবে। কিন্তু তৃতীয় বিশ্ব এক আজিব বিশ্ব! এই সকল দেশের নেতারা উঠিতে-বসিতে ও চলিতে-ফিরিতে অহরহ মিথ্যার ফুলঝুড়ি ছড়াইলেও তাহাদের তেমন কোনো চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হইতে হয় না। এমনকি এই সকল দেশ মিথ্যা তৈরির কারখানাও বটে। এই সকল দেশে অনেক সময় ঘরে বসিয়া হিসাব কষিয়া পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়। সেই নির্জলা মিথ্যা ছড়াইয়া দেওয়া হয় সর্বত্র। ফলে অনেক ক্ষেত্রে সরকারপ্রধানের নিকটও কোনো বিষয়ে সুস্পষ্ট চিত্র ফুটিয়া উঠে না। তাহার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতে গিয়া দেখা দেয় বিপত্তি। কেননা বাস্তবতার নিরিখে তাহাতে থাকে আসমান-জমিন ফারাক। মাত্রাতিরিক্ত তোষামোদির কারণেও আমলাতন্ত্র দ্বারা সরকার বিভ্রান্ত হইতে পারে। অনেক সময় বিদেশি তথ্য-উপাত্তও থাকে ভুলে ভরা। কেননা তাহা হয় উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভুল তথ্য পরিবেশন বা মিথ্যা বিবৃতির সমাহার। যেইখানে উন্নত দেশে একটা মিথ্যা কথা বলিবার জন্য বিপদে পড়িতে হয়, সেইখানে উন্নয়নশীল দেশে শত মিথ্যা কথা বলিবার পরও সাত খুন মাফ হইয়া যায়। এইখানে দিনরাত্রি পপকর্নের মতো মিথ্যার খই ফুটিতেছে বলিলেও অত্যুক্তি হইবে না। এই জন্য এই সকল দেশে আজ সচরাচর বলা হয়, আপনি যাহা বলিলেন, তাহা প্রমাণ করুন। প্রমাণসাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে ইত্যাদি। সকলের সত্য বলিবার অভ্যাস থাকিলে এই সকল কথা বলিবার কোনো প্রয়োজন হইত না। এই সকল দেশে কি সরকারি-আধাসরকারি-স্বায়ত্তশাসিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে থাকে রিসার্চ সেল বা গবেষণাকেন্দ্র। অনেক সময় সেইখানেও ডাহা মিথ্যা উৎপাদিত হয়। ফলে ‘আমরা সকলেই রাজা আমাদের এই মিথ্যার রাজত্বে’।
উন্নয়নশীল দেশে প্রতিদিন এমনভাবে মিথ্যা কথা বলা হয়, যাহাতে মনে হয় ইহাই সত্য। এমনকি মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে মন্তব্য করিতে গিয়াও অনেক সময় মিথ্যাচার করা হয়। অথচ আমরা জানি, মিথ্যা বলা মহাপাপ। ইহা হইল বৃহত পাপের জননী বা উৎসমূল। একটা মিথ্যার জন্য অনেক সময় শত মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করিতে হয়। ইহা এমন এক সামাজিক ব্যাধি, যাহা সৃষ্টি করে নৈরাজ্য। এই সকল জানিবার পরও আমরা সত্যের উপর অবিচল থাকিতে পারিতেছি না। প্রখ্যাত সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ফয়েজ আহমেদের একটি স্মৃতিচারণামূলক গ্রন্থের নাম ‘সত্যবাবু মারা গেছেন’। ইহা তাহার মধ্যরাতের অশ্বারোহী ট্রিলজি সিরিজের দ্বিতীয় গ্রন্থ। ইহাতে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের মিথ্যা প্রচারে ও প্রকৃত সংবাদ হননের চাপে রিপোর্টাররা কতটা অসহায় বোধ করিতেন, তাহার সুন্দর বিবরণ রহিয়াছে। সেই সময় দুর্ভিক্ষ, মহামারি ও বন্যায় মৃত্যু, এমনকি ঘূর্ণিঝড়ে মৃত্যুর সংখ্যা পর্যন্ত সঠিকভাবে প্রকাশ করা যাইত না। একইভাবে আজও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সরকার অহরহ মিথ্যার আশ্রয় নিতেছে। তাহাদের ভয়ে ও আজ্ঞায় অনেক রূঢ় সত্য
