বড়পুকুরিয়া খনিতে স্বেচ্ছাচার, গ্রুপিং

আপডেট : ১৮ জুন ২০১৯, ২২:২৪

দেশের একমাত্র উত্পাদনরত বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি পরিচালনায় স্বেচ্ছাচারিতা এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। সুষ্ঠুভাবে খনি পরিচালনায় গুরুত্ব দেওয়ার পরিবর্তে গ্রুপিং দ্বন্দ্বে লিপ্ত রয়েছেন তারা। এই অনিয়মে জড়িত থাকার এবং নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে খোদ খনি কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে। কোম্পানির প্রফিট বোনাস বিতরণে ৬০ লাখ টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ তদন্তে পেট্রোবাংলা গঠিত কমিটির প্রতিবেদনে এমন তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে কয়লা উত্পাদন ও পরিচালনায় নিয়োজিত রয়েছে বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড (বিসিএমসিএল)। এ খনিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ৫২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ কেন্দ্র। কয়লা উত্তোলন করছে চীনা প্রতিষ্ঠান এক্সএমসি-সিএমসি কনসোর্টিয়াম। কয়লা মজুতের হিসাবে গরমিল ও ঘাটতির কারণে গত বছর ব্যাহত হয় বিদ্যুত্ উত্পাদন। বরখাস্ত হন তখনকার ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এর কিছুদিন পরেই খনির প্রফিট বোনাস বিতরণে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ ওঠে বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুর রহমানের বিরুদ্ধে। স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের থেকে নেওয়া ওই চাঁদার অর্থ আউটসোর্সিং করা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বণ্টন করা হবে বলে দাবি করা হয়। এ নিয়ে আপত্তি তোলেন কর্মকর্তাদের একটি অংশ। কিন্তু আপত্তি জানানো কর্মচারীদের বিভিন্ন সময় সাধারণ কারণে বদলি, কারণ দর্শানো নোটিশ, এসিআর খারাপ দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। দুই পক্ষের দ্বন্দ্বে খনির কয়লা উত্পাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন পেট্রোবাংলার তদন্ত কমিটির সদস্যরা।

এ প্রসঙ্গে পেট্রোবাংলার মহাব্যবস্থাপক ডিএম জোবায়েদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের দপ্তরে বিভাগীয় প্রধানগণ ও ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের উপস্থিতিতে একটি আন-অফিসিয়াল সভায়  সকল স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর ৪০ হাজার টাকা চাঁদা নির্ধারণ করে তা আদায়ের সিদ্ধান্ত হয়। প্রতিষ্ঠান প্রধানের দপ্তরে এ ধরনের অনৈতিক বিষয়ে সভা করা সমীচীন হয়নি বলে কমিটি মনে করে। তবে চাঁদা আদায়ের সিদ্ধান্তটি পরে আর বাস্তবায়িত হয়নি। তদন্তে পরিকল্পনাটির সত্যতা পাওয়া যায়।

এছাড়া এক্সএমসি-সিএমসি কনসোর্টিয়ামের শ্রমিকদের প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে বোনাস প্রদান করায় কোম্পানিতে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে নিয়োজিত ১৫২ জন শ্রমিকেরও বোনাস প্রাপ্য ছিল। বিগত বছরে সিএসআর তহবিল থেকে তাদের বোনাস প্রদান করা হলেও এ বছর বাদ দেওয়া হয়েছে। এটি কোম্পানির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের গাফিলতি এবং অবহেলার ফল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, খনি কোম্পানির দায়িত্ব নিয়েই অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন এমডি। তিনি প্রফিট বোনাস আটকে রেখে ওপর মহলকে দেওয়ার নাম করে কয়লা খনি কোম্পানির স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে মাথাপিছু এক লাখ টাকা করে চাঁদা দাবি করেন। কিন্তু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আপত্তির মুখে টাকার অঙ্ক কমিয়ে মাথাপিছু ৬০ হাজার টাকা ধার্য করেন। এতেও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আপত্তি তুললে ক্ষিপ্ত হন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুর রহমান। তিনি বদলি-শোকজসহ নানা হয়রানির হুমকি দেন। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে প্রত্যেকে ৪০ হাজার টাকা করে চাঁদা দেন। এভাবে প্রায় ৫৮ লাখ টাকা আদায় করা হয়। যদিও প্রথমে দেড় কোটি টাকা চাঁদা আদায়ের চেষ্টা করেছিলন তিনি।

এ প্রসঙ্গে বিসিএমসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুর রহমান বলেন, আউটসোর্সিংকৃত কর্মচারীদের জন্য কিছু টাকা স্থায়ী কর্মকর্তাদের প্রদান করতে বলেছিলাম। কিন্তু এটি অনেকে মেনে নেয়নি। তাই বাস্তবায়িত হয়নি। আর অকারণে কাউকে বদলি বা কারণ দর্শানো হয়নি, এর যৌক্তিকতা ছিল। গ্রুপিং দ্বন্দ্ব সম্পর্কে তিনি বলেন, কারও সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব নেই। তবে তাঁর কর্মকাণ্ডের কারণে একটি গ্রুপ অন্যায় সুবিধা নেওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, তা থেকে ক্ষোভ থাকতে পারে।

তদন্ত কমিটির প্রধান ডিএম জোবায়েদ হোসেন বলেন, বোনাস প্রাপ্তি হতে বাদ পড়া তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে নিয়োজিত শ্রমিকদের বোনাস দেওয়া ভালো উদ্যোগ। এক্ষেত্রে গোপনীয়তা না করে ট্রাস্টি বোর্ডের সম্মতিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া যেত। গোপনীয়তা সন্দেহ-অবিশ্বাস তৈরি করেছে। দুই পক্ষের বিপরীত অবস্থান কোম্পানিতে বিরূপ কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে কোম্পানির বিদ্যমান পরিস্থিতি উল্লেখ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে অনুরোধ করা হয়েছে।